Tuesday, May 3, 2022

18>||বিবেকানন্দ:--মেরি লুইস বার্ক ।

 18>||" আমেরিকার সুবিখ্যাত বিবেকানন্দ-গবেষক মেরি লুইস বার্ক লিখেছেন , 


' ভারতবর্ষের মানুষ যদি কোনদিন বিবেকানন্দকে ভুলে যায় তাহলে তা হবে তাদের মৃত্যুর সমান। ' 


( ৪ ঠা জুলাই ১৯০২ ) স্বামী বিবেকানন্দের দেহান্ত ঘটেছে , বেলুড় মঠের যেখানে বিবেকানন্দ মন্দির এখন , সেখানে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছে। এরপর চিতায় অগ্নিসংযোগ করা হলো , দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।...( ভগিনী ) নিবেদিতাও একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন।... 


গভীর দুঃখের সঙ্গে নিবেদিতা দেখলেন , চিতার আগুন আস্তে আস্তে গ্রাস করছে স্বামীজীর দেহকে এবং সেই আগুন প্রায় ছুঁতে চলেছে সেই উত্তরীয়টিকেও। নিবেদিতা ভাবছেন -- ' হায় ! ঐ উত্তরীয়টিও পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ! ওটি যদি স্বামীজীর স্মৃতি হিসাবে রাখতে পারতাম ! ' 


লেলিহান অগ্নিশিখা তখন চাদরটিকেও ছুঁয়ে ফেলেছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া উঠল গঙ্গা থেকে। ঐ চাদরটির একটি অংশ উড়িয়ে নিয়ে ফেলল নিবেদিতার সামনে। নিবেদিতা চাদরটিকে সাগ্রহে নিয়ে মাথায় ছোঁয়ালেন। পরে আমেরিকায় মিস ম্যাকলাউডকে লিখছেন : 


' আমি চেয়েছিলাম ঐ চাদরটিকে তোমার জন্য রাখতে , কিন্তু আগুন ধরে গিয়েছিল তাতে। ভাবলাম , সেটিও শেষ হয়ে যাবে ? আমার জন্য , তোমার জন্য স্বামীজীর শেষ দিনের স্মৃতি আর কিছু থাকল না ? জো , তখনি গঙ্গার হাওয়া ওটিকে তুলে আমার সামনে ফেলে দিল। আমি ওটি রেখে দিয়েছি তোমার জন্য। আর জান , যখন চাদরটির টকরো আমার কাছে এসে পড়ল , আমার কী মনে হলো ? তখন আমার মনে হলো , গুরুদেব যেন পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন , যেন একটি চিঠি। তা-ই আমার ধারনা। প্রিয় য়ুম ( ম্যাকলাউড ) , আমাদের স্বামীজী মারা যাননি -- তিনি মৃত নন। তিনি জীবিত চিরজীবিত ! ' 


ঠিক তা-ই। স্বামী বিবেকানন্দ যুগ-যুগান্তরে একইভাবে জীবিত থাকবেন।...( স্বামীজী) বলছেন : 


' এমনও হতে পারে যে , আমি হয়তো বুঝব -- এই দেহের বাইরে চলে যাওয়া , এই দেহকে জীর্ন পোশাকের মতো ফেলে দেওয়াই আমার পক্ষে হিতকর। কিন্তু আমি কোনদিন কর্ম হতে ক্ষান্ত হব না। যতদিন না সমগ্র জগৎ ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব ( #Oneness ) অনুভব করছে , ততদিন আমি সর্বত্র মানুষের মনে প্রেরনা জাগাতে থাকব। ' 


নিবেদিতার মতো জোসেফিনও বিশ্বাস করতেন , স্বামীজী চিরজীবিত। তাঁর মৃত্যু নেই। একবার বেলুড় মঠে একজন সন্ন্যাসী তাঁর কাছে বলেছিলেন : ' Swamiji was... ' তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধা জোসেফিন জ্বলন্ত চোখে বললেন : 


' What ? Swamiji was ? No , Swamiji is , my boy , Swamiji is ! ' 


সেই মৃত্যুঞ্জয়ী বিবেকানন্দই আসল বিবেকানন্দ। জগতের মানুষ কি তাঁকে চিনেছে ? যিনি তাঁর ললাটে মৃত্যুঞ্জয়ী-ভাগ্যলিখন নিয়ে জন্মেছিলেন , তাঁকে কি আমরা চিনেছি ? জানি না। তবে তিনি স্বয়ং বলেছিলেন : 


' কে আমি তা লেখা আছে আমার ললাটে। যদি তার পাঠোদ্ধার করতে পার , ধন্য তুমি। আর যদি না পার , তাহলে দুর্ভাগ্য তোমাদের , আমার নয়। '" 


( সূত্র : ' জাগরনের মহান অগ্রদূত স্বামী বিবেকানন্দ ' -- স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ; ' বিবেকচেতনায় উদ্ভাসিত জগৎ ' ( সংকলন ) ; উদ্বোধন )


================================


               জয় মা


    কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচারের (গোলপার্ক) গ্রন্থবিক্রয়-বিভাগে একদিন বেলা এগারোটা নাগাদ একজন রিক্সাওয়ালা এসে একটি বই কিনতে চাইল।

বইটির নাম সে বলতে পারল না। 

  শুধু বললঃ “এইমাত্র একজন ভদ্রমহিলা আপনাদের এখান থেকেই একটা বই কিনে আমার রিক্সায় উঠেছিলেন। তাঁকে তাঁর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়েই আমি এখানে এসেছি সেই বইখানা কিনতে। বইটির ওপরে একজন মহিলার শুধু মুখখানির বড় ছবি আছে। বইটির নাম কি আমি জানি না!”

গমলোকটিকে ‘শতরূপে সারদা’ বইটি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে এই বইটি খুঁজছে কিনা। বইটি দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ব্যগ্রভাবে বললঃ “হ্যাঁ , বাবু, হ্যাঁ । এই বইটিই আমি কিনতে চাই। এটিই ঐ মহিলার হাতে আমি দেখেছিলাম!

   ” [তখন (১৯৮৫) বইটির দাম ছিল ষাট টাকা।] রিক্সাওয়ালা জানাল, তার কাছে মাত্র দশ টাকা আছে যা সে সেদিন তখন পর্যন্ত উপার্জন করেছে। তার উপার্জনের সম্পূর্ণ অর্থ দিয়েও বইটি কিনতে পারবে না জানতে পেরে সে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়ল। বিষয়টি বিক্রয়-বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সন্ন্যাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তিনি ঐ রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ “আপনি এই বইটি নিয়ে কি করবেন? আপনি কি পড়তে পারেন?”

     রিক্সাওয়ালা বললঃ “ না বাবু, আমি লেখাপড়া জানি না। তবে বাড়িতে আমার ছেলে আছে, সে লেখাপড়া জানে। সে এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে। আমি তাকে বলব, সে আমাকে পড়ে শোনাবে !”

     সন্ন্যাসী বললেনঃ “কিন্তু , আপনি কি জানেন, বইটি কার সম্বন্ধে লেখা-ওপরের ছবিটিই বা কার?” সে বললঃ “না, বাবু, আমি কিছুই জানি না। শুধু যে-ভদ্রমহিলাকে আমি রিক্সা করে নিয়ে যাচ্ছিলাম তাঁর হাতে ঐ বইটি আমি দেখলাম। বইয়ের ওপরের ছবিটা দেখে আমার মনে হলো, ওটি আমার মায়ের ছবি। আমার মাকে আমি খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি। মা আমার কেমন দেখতে ছিল আমি জানি না। আমার মনে হলো, ঐ আমার মা-ওটি আমার নিজের মায়ের ছবি। তাই ভদ্রমহিলাকে নামিয়ে দিয়েই আমি এখানে ছুটে এসেছি বইটি কিনব বলে। কিন্তু বইটির দাম ষাট টাকা, আমার আছে মাত্র দশ টাকা!” বলতে বলতে লোকটি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। সন্ন্যাসী তার কথায় এতই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে, কয়েক মুহূর্ত তিনি কোন কথা বলতে পারলেন না। তারপর তিনি লোকটিকে বললেনঃ “ভাই, আপনাকে টাকা দিতে হবে না। বইটি আপনি এমনিই নিয়ে যান !” তার মিনতিতে সন্ন্যাসী তার ঐ দশটি টাকা নিতে বাধ্য হলেন। সন্ন্যাসী বইটির সঙ্গে তাকে তার ‘মায়ের’ একখানি ছবিও উপহার দিলেন। বই ও ছবি পেয়ে লোকটির মুখে আনন্দ যেন উপচে পড়ল! তার দুই চোখ বেয়ে নেমতে লাগল অবিরল ধারা। এমন যে মা, যাঁর মধ্যে আমাদের মতো মাতৃহারা সন্তানেরা তাঁদের মাকে খুঁজে পাই, শান্তি পাই তাঁর চির স্নেহ ছায়ায়।

No comments:

Post a Comment