Monday, June 6, 2022

20>|| সুদর্শনে রাধা::----

 20>||সুদর্শনে রাধা::----(Mit-9/13)


শ্রীজগন্নাথদের মন্দির প্রাঙ্গণে কল্পগণেশ বিগ্রহ আছেন। একদিন মহাপ্রভু গৌরসুন্দর ঐ বটবৃক্ষের কাছ দিয়ে যাবার সময়' হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। ঐ স্হানে ভাগবত পাঠ চলছে। ভাগবতের বাণী ওনার কানে প্রবেশ করলে দামোদরকে ডেকে বলরেন-- দেখতো দামোদর যিনি ভাগবত পাঠ করছেন উনি কে?


             "একদিন বটমূলে প্রবেশন কালে।

              স্তম্ভিত হইল বিশ্বম্ভর স্হির হেলে।।

              ভাগবত বাণী প্রভু কলেক শ্রবন।

               কেহ বলে দেখ দামোদর কুহুজন।।"

স্বরূপ দামোদর দেখে এসে বললেন--একজন উড়িয়া ব্রাহ্মণ পান্ডা পাঠ করছেন। তখন প্রভু বললেন, আমি এই কল্পবৃক্ষের শাখাশ্রয়ে বিশ্রাম করতে থাকি,  তুমি ওই পাঠক ব্রাহ্মণকে একটি গুপ্ত বিষয় জিঞ্জাসা কর--- ভাগবতে ' রাধা' নাম নেই  কেন? আরও বললেন পন্ডিত পাঠককে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে জিঞ্জাসা করবে।


       স্বরূপ দামোদর মহাপ্রভুর নির্দেশ মত কার্য করলেন। প্রণিপাত করে গুপ্ত কথাটি জিঞ্জাসা করলেন। ব্রাহ্মণ পাঠকও প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্যে প্রণাম ক'রে বললেন, অতি উওম প্রশ্ন করেছেন, আপনার প্রশ্ন শুনে আমার হৃদয় কেঁপে উঠল।


           " শুনি হাসি বিপ্র জগন্নাথ কলেক প্রণাম।

              উওম প্রশ্ন করিল হিয়া কম্পাইল।।"


পাঠক বিপ্র তখন শ্রীরাধাতও্ব সম্বন্ধে বলতে লাগলেন; কথাগুলো অভিনব ও খুবই সুন্দর। 

মূলকথা এই--রাধা কৃৃষ্ণাত্মিকা, কৃৃষ্ণ রাধাত্মক; কৃৃষ্ণের প্রাণের প্রাণ রাধা, শ্রীরাধা ভাগবতের প্রাণ, প্রাণ শরীরের পরম সত্বা।শরীর দৃশ্য, প্রাণ অদৃশ্য বা বাহ্যতঃ উহ্য। তাই শ্রীভাগবতে রাস-রাসেশ্বরীর নাম- তও্ব উহ্য আছে। হরিই একমাত্র রস, গীতগোবিন্দ বলেছেন-- "হরিমেকরসম্ চিরমপি বিহিত বিলাসম্"। রসের আধার শ্রীরাধা অপ্রকট, অপ্রকাশ্য। প্রভু উওর শুনে হুঙ্কার করলেন ও

' হা কৃৃষ্ণ' বলেই মূর্চ্ছিত হলেন।


              দূরে প্রভু অদ্ভুতে হুঙ্কার করিলে।

               হা কৃৃষ্ণ!  বলিয়া প্রভু মূর্চ্ছিত হেলে।।


মূর্চ্ছা হতে উঠে প্রভু তাঁকে বললেন,-- কে তুমি ব্রাহ্মণ ; মহাভাবের স্বরূপ ব্যক্ত করে আমায় শীতল করে দিলে।

সে অবধি পাঠকের সঙ্গে প্রভুর প্রগাঢ় প্রীতি হ' ল।


এই পাঠকের নাম শ্রীজগন্নাথ দাস। তিনি আরেকদিন প্রভুকে বললেন, শ্রীক্ষেত্রধামে শ্রীরাধার পূজা নাই কেন তার কারণ বলছি। 

তিনি বললেন রাধা কৃৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি,কৃৃষ্ণ থেকে আলাদা নহেন। রাধা অনাহত জ্যোতি,  প্রীতিভাব, কৃৃষ্ণ- প্রীতি, জ্যোতিরূপে চক্র হয়েছেন। জগন্নাথের পার্শ্বে স্বয়ং সুদর্শন চক্র রূপে বিরাজিত আছেন। উহাই রাসমন্ডলের রাধা। রাধাষ্টমীর দিন তাঁহার আরাধনা হয়। তিনি অশ্রু, কম্প, স্বেদ, ও রোমাঞ্চ প্রকাশ করেন। স্তম্ভ অবস্হায় চক্র যে রাধাতও্ব ইহা একটি অভিনব সংবাদ। 


 রসিক ভক্তের ধ্যানের বিষয়--


           " জগন্নাথ বিপ্র বলে শুন গোরা রায়।

              শ্রীক্ষেএে রাধার পূজা নাহিটি নিশ্চয়।।

              রাধা হৃদগত ভাব স্তম্ভর প্রমাণ।

              রাধা অনাহত জ্যোতি প্রীতিভাব জান।।

              রাধা আহ্লাদিনী শক্তি পৃথক নহে সেহি।

              কৃৃষ্ণ - প্রীতি জ্যোতিরূপে চক্রভাব রহি।।

              রাস মন্ডল চক্র স্বয়ং সুদর্শন।

              রাধাষ্টমীর দিন তার হয় আরাধন।।

              অশ্রু কম্প স্বেদ পরে রোমাঞ্চ শরীর।

               স্তম্ভাবস্হার স্বরূপ চক্র নিরন্তর।।"


জয় জয় শ্রীরাধে 🙏🏻 জয় জগদ্বন্ধু 🙏🏻 জয় শ্রীগুরুদেব।

              " সংকলিত"

    <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

============================

Thursday, May 26, 2022

19>||বিবেকানন্দ ও আলোয়ারের সেই বুড়িমা

 

19>||বিবেকানন্দ ও আলোয়ারের সেই বুড়িমা


আলোয়ারের সেই বুড়িমা'কে ভুলতে পারেন নি বিবেকানন্দ। 


সে অনেকদিন আগেকার কথা – ঠাকুরের দেহরক্ষার পর যখন তরুণ পরিব্রাজকরূপে তিনি ছুটে চলেছেন সারা দেশে, তখনই কোনও একটা সময়ে এসে ক'দিন আলোয়ারেও ছিলেন। সেই সময়ে দু'বেলা পেট চলে ভিক্ষার অন্নে। যেদিন কিছুই জোটে না ভিক্ষায়, সেদিন সন্ন্যাসীর জঠরাগ্নির জ্বালা কমায় এলাকার আরেক ভিখারিনি – বুড়িমা। পথের ধারে তাঁর জরাজীর্ণ কুঁড়ে ঘর; দিনশেষে ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত সেই তরুণ এসে বসলে বুড়ি আস্তে আস্তে কিছুটা বজরার আটা বার করে – ভিক্ষারই ধন সে সব। তারপর সে আটা মেখে, হাতের চাপে চ্যাপ্টা করে, আগুনে পুড়িয়ে খানকতক রুটি বানিয়ে সন্ন্যাসীর দিকে এগিয়ে দেয়, "এ নে, খা রে লালা।" ও, বলা হয়নি, সন্ন্যাসীকে বুড়ি ডাকে "মেরে লালা" বলে; আর সন্ন্যাসী তাঁকে ডাকে "মাঈ"। বজরার রুটির সঙ্গে কাঁচালঙ্কা কামড়ে কামড়ে খেয়ে তৃপ্তির হাসি হাসে 'লালা', বুড়ির আদ্ধেক খাওয়া তাতেই হয়ে যায়।


তারপর অনেকদিন পেরিয়ে গেছে; বুড়ি জানেও না যে দেশ পেরিয়ে, মহাদেশ পেরিয়ে, সমুদ্র পেরিয়ে 'লালা' আজ স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে আবার ফিরে এসেছেন আলোয়ারে। না, এখন তিনি ভিক্ষাজীবী নন, রাজার অতিথি। সকাল থেকে সন্ধে রাজসভায় হাজার হাজার লোক আসে যায়, স্বামীজীকে দেখে, কথা বলতে চায়, আশীর্বাদ পেতে চায়। দু'পা এদিক ওদিক গেলে সবসময় সঙ্গে থাকে রাজার দেওয়া দুই পাহারাদার – মন হাঁপিয়ে ওঠে এসবে বিবেকানন্দের। মনে পড়ে এখানে এর আগেকার আসা – আধপেটা কিন্তু স্বাধীন পায়ে ঘুরে বেড়ানো। নিমেষে মনে পড়ে যায় 'মাঈ'র কথা। সেই কুঁড়েঘরে বসে গরম গরম বজরার রুটি, বুড়ির মুখের সেই হাসি ... আহা! কেমন আছে সে, কে জানে! আদৌ আছে তো? একবার দেখে এলে হয়। প্রহরীর চোখের আড়ালে, সন্ধের মুখে একাই বেরিয়ে পড়েন বিবেকানন্দ।


জায়গাটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হয় না, এই ক'বছরে আলোয়ার বদলায় নি তেমন একটা। ওই তো বুড়ির কুঁড়েঘর, যেন আরও কিছুটা জীর্ণ। দরজায় একটা নোংরা কাঁথা ঝুলছে। বাইরে থেকেই স্বামীজী হাঁক দিলেন, "মাঈ! ও মাঈ!"

ভিতর থেকে কর্কশ স্বর আসে বুড়ির, "ওহ! বুড়ো মানুষ, দুটো কাজ সারছি, তাতে শান্তি নেই! কে চেল্লাস এই সন্ধে করে?"

"আরে বাইরে এসেই দেখো না, কে!"

হেঁয়ালি সইতে পারে না বুড়ি, ঝাঁঝিয়ে ওঠে, "ওহ, কে আমার রাজপুত্তুর এল রে, বেরিয়ে তাকে দেখতে হবে! কে রে বেটা তুই?"

"আরে, তোর লালা ... মনে নেই মাঈ? তোর লালা এসেছে।"


হাড়-জিরজিরে বুড়িমা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসে, "কই ... সত্যিই তুই লালা? তুই ... ফিরে এসেছিস? কই, কাছে আয় দেখি... দেখতে পাই না তো চোখে ভালো..."

কাঁপা হাতে স্বামীজীর গাল ছুঁয়ে, অনেক কষ্টে নিজের চিবুক উঁচু করে তাকায় বুড়ি, "সত্যিই তো, আমার লালা! কোথায় গেছিলি? কোথায় চলে গেছিলি বাপ, মাঈকে ছেড়ে?"

"সে সব অনেক গল্প রে মাঈ, হবে 'খন। দুটো খেতে দে তো আগে, বড্ড খিদে পেয়েছে!"

"ওই দ্যাখো! তখনও লালার পেটে আগুন জ্বলতো, আর এখনও! বলি এ ক'বছর কিছু খাস নি, নাকি? আমার কাছে কী আছে, যে তোকে খেতে দেবো এই অবেলায়?"

"কেন, তোর সেই বজরার রুটি দিবি না? লঙ্কা দিয়ে?"


কয়েকমুঠো বজরার আটা মেখে, গনগনে আঁচে পোড়ানো রুটি এগিয়ে দেয় মাঈ, তাঁর লালাকে। ছেলের মুখে সেই তৃপ্তির হাসি দেখে ফোকলা মা'ও হেসে ফেলে। নিজের ছেলেই তো তাঁর! বুড়ির পেটের ছেলে জোয়ান বয়সে চলে গিয়েছিল; সেই থেকে এক লালা ছাড়া আর কাউকেই তেমন আপন ভেবে বাঁচেনি বুড়ি। লালাও পালিয়েছিল বছর কয়েক আগে; এবার ফিরে এসেছে যে, আর সহজে যেতে দেবো না – এই ভেবে চোখ মোছে বুড়িমা। 


"আহা, কী স্বাদ রে মাঈ! কোথায় লাগে এসবের পাশে রাজবাড়ির মণ্ডা মেঠাই!"


"আরে ও লালা, শুনেছিস –", কী যেন মনে করে সোজা হয়ে বসে বুড়ি, "শুনেছিস, এখানের রাজবাড়িতে নাকি মস্ত এক সাধু এসেছে! সঙ্গে কত লোকজন, সাহেব মেম, ভক্ত! সে নাকি বিরাট নামডাক করেছে; এ পথ দিয়ে কত লোক রোজ যাচ্ছে তাকে দেখতে, জানিস? তুই যাবি নাকি দেখা করতে, হ্যাঁ?" লালা উত্তর দেওয়ার আগেই বুড়ি আবার বলে, "না না, থাক! তোর গিয়ে কাজ নেই! পেটই ভরলো না তোর ভালো করে, আর কয়েকটা রুটি দিই? তোর ওদিকে গিয়ে কাজ নেই!"


"কেন রে মাঈ? গিয়ে কাজ নেই কেন?"


"ও বাবা, না, ও সাধু বড়লোক, বিরাট লেখাপড়া করা! কী বলতে শেষে কী বলে দেবে, আমার লালার মনে কষ্ট হবে শুধুশুধু..."


মুখে সাঙ্ঘাতিক এক দুষ্টুমির হাসি নিয়ে তাঁর লালা ঝুঁকে পড়ে, বুড়ির কাছে এসে বলে, "এ মাঈ! একটা মজা করবি? চল, তুই-আমি দুজনেই গিয়ে ওই স্বামীজীকে দেখে আসি! চল চল, যাবি?"


"ধুর ক্ষ্যাপা! রাজবাড়িতে আমাকে ঢুকতে দেবে, না তোকে? ধ্যাতানি খেয়ে ফিরে আসতে হবে! কোত্থাও যেতে হবে না তোকে, আমার কাছে বোস তো!"


"মাঈ, শোন...", যেন কিছুটা গাম্ভীর্যের ছলেই বিবেকানন্দ বলেন, "বলছি, সেই সাধু যদি আমিই হই? তবে?..."


একপল নীরব থেকে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ফোকলা বুড়িমা। "কথা শোনো আমার পাগলা বেটা'র! তুই? তুই হবি সেই সাধু? বড় হয়েও মজা করার স্বভাব গেল না তোর, বল? ওরে তুই তো আমার লালা! আমিও গরিব, তুইও গরিব! ও'সব বড় বড় সাধুর বেশি বেশি কথায় কাজ নেই আমাদের!"


আশপাশটা বড় একটা বদলায় নি মাঝের কিছু বছরে। সন্ধেবেলায় চাঁদ উঠেছে, সেই চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে আলোয়ার, তার জনবসতি, পথঘাট। আর সেই পথের ধারের কুঁড়েঘরে বসে এক মাঈ আর তাঁর লালা আগুন-পোড়া বজরার রুটি খেতে খেতে হাসিতে, খুনসুটিতে, আহ্লাদে, আদরে উড়িয়ে দিচ্ছে জীবনের একটা সন্ধে, সেই রাজঅতিথি সন্ন্যাসীর থেকে বহু, বহু দূরে। 


(তথ্যঋণ : 'বন্ধু বিবেকানন্দ' – শঙ্করী প্রসাদ বসু)

Tuesday, May 3, 2022

18>||বিবেকানন্দ:--মেরি লুইস বার্ক ।

 18>||" আমেরিকার সুবিখ্যাত বিবেকানন্দ-গবেষক মেরি লুইস বার্ক লিখেছেন , 


' ভারতবর্ষের মানুষ যদি কোনদিন বিবেকানন্দকে ভুলে যায় তাহলে তা হবে তাদের মৃত্যুর সমান। ' 


( ৪ ঠা জুলাই ১৯০২ ) স্বামী বিবেকানন্দের দেহান্ত ঘটেছে , বেলুড় মঠের যেখানে বিবেকানন্দ মন্দির এখন , সেখানে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছে। এরপর চিতায় অগ্নিসংযোগ করা হলো , দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।...( ভগিনী ) নিবেদিতাও একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন।... 


গভীর দুঃখের সঙ্গে নিবেদিতা দেখলেন , চিতার আগুন আস্তে আস্তে গ্রাস করছে স্বামীজীর দেহকে এবং সেই আগুন প্রায় ছুঁতে চলেছে সেই উত্তরীয়টিকেও। নিবেদিতা ভাবছেন -- ' হায় ! ঐ উত্তরীয়টিও পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ! ওটি যদি স্বামীজীর স্মৃতি হিসাবে রাখতে পারতাম ! ' 


লেলিহান অগ্নিশিখা তখন চাদরটিকেও ছুঁয়ে ফেলেছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া উঠল গঙ্গা থেকে। ঐ চাদরটির একটি অংশ উড়িয়ে নিয়ে ফেলল নিবেদিতার সামনে। নিবেদিতা চাদরটিকে সাগ্রহে নিয়ে মাথায় ছোঁয়ালেন। পরে আমেরিকায় মিস ম্যাকলাউডকে লিখছেন : 


' আমি চেয়েছিলাম ঐ চাদরটিকে তোমার জন্য রাখতে , কিন্তু আগুন ধরে গিয়েছিল তাতে। ভাবলাম , সেটিও শেষ হয়ে যাবে ? আমার জন্য , তোমার জন্য স্বামীজীর শেষ দিনের স্মৃতি আর কিছু থাকল না ? জো , তখনি গঙ্গার হাওয়া ওটিকে তুলে আমার সামনে ফেলে দিল। আমি ওটি রেখে দিয়েছি তোমার জন্য। আর জান , যখন চাদরটির টকরো আমার কাছে এসে পড়ল , আমার কী মনে হলো ? তখন আমার মনে হলো , গুরুদেব যেন পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন , যেন একটি চিঠি। তা-ই আমার ধারনা। প্রিয় য়ুম ( ম্যাকলাউড ) , আমাদের স্বামীজী মারা যাননি -- তিনি মৃত নন। তিনি জীবিত চিরজীবিত ! ' 


ঠিক তা-ই। স্বামী বিবেকানন্দ যুগ-যুগান্তরে একইভাবে জীবিত থাকবেন।...( স্বামীজী) বলছেন : 


' এমনও হতে পারে যে , আমি হয়তো বুঝব -- এই দেহের বাইরে চলে যাওয়া , এই দেহকে জীর্ন পোশাকের মতো ফেলে দেওয়াই আমার পক্ষে হিতকর। কিন্তু আমি কোনদিন কর্ম হতে ক্ষান্ত হব না। যতদিন না সমগ্র জগৎ ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব ( #Oneness ) অনুভব করছে , ততদিন আমি সর্বত্র মানুষের মনে প্রেরনা জাগাতে থাকব। ' 


নিবেদিতার মতো জোসেফিনও বিশ্বাস করতেন , স্বামীজী চিরজীবিত। তাঁর মৃত্যু নেই। একবার বেলুড় মঠে একজন সন্ন্যাসী তাঁর কাছে বলেছিলেন : ' Swamiji was... ' তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধা জোসেফিন জ্বলন্ত চোখে বললেন : 


' What ? Swamiji was ? No , Swamiji is , my boy , Swamiji is ! ' 


সেই মৃত্যুঞ্জয়ী বিবেকানন্দই আসল বিবেকানন্দ। জগতের মানুষ কি তাঁকে চিনেছে ? যিনি তাঁর ললাটে মৃত্যুঞ্জয়ী-ভাগ্যলিখন নিয়ে জন্মেছিলেন , তাঁকে কি আমরা চিনেছি ? জানি না। তবে তিনি স্বয়ং বলেছিলেন : 


' কে আমি তা লেখা আছে আমার ললাটে। যদি তার পাঠোদ্ধার করতে পার , ধন্য তুমি। আর যদি না পার , তাহলে দুর্ভাগ্য তোমাদের , আমার নয়। '" 


( সূত্র : ' জাগরনের মহান অগ্রদূত স্বামী বিবেকানন্দ ' -- স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ; ' বিবেকচেতনায় উদ্ভাসিত জগৎ ' ( সংকলন ) ; উদ্বোধন )


================================


               জয় মা


    কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচারের (গোলপার্ক) গ্রন্থবিক্রয়-বিভাগে একদিন বেলা এগারোটা নাগাদ একজন রিক্সাওয়ালা এসে একটি বই কিনতে চাইল।

বইটির নাম সে বলতে পারল না। 

  শুধু বললঃ “এইমাত্র একজন ভদ্রমহিলা আপনাদের এখান থেকেই একটা বই কিনে আমার রিক্সায় উঠেছিলেন। তাঁকে তাঁর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়েই আমি এখানে এসেছি সেই বইখানা কিনতে। বইটির ওপরে একজন মহিলার শুধু মুখখানির বড় ছবি আছে। বইটির নাম কি আমি জানি না!”

গমলোকটিকে ‘শতরূপে সারদা’ বইটি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে এই বইটি খুঁজছে কিনা। বইটি দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ব্যগ্রভাবে বললঃ “হ্যাঁ , বাবু, হ্যাঁ । এই বইটিই আমি কিনতে চাই। এটিই ঐ মহিলার হাতে আমি দেখেছিলাম!

   ” [তখন (১৯৮৫) বইটির দাম ছিল ষাট টাকা।] রিক্সাওয়ালা জানাল, তার কাছে মাত্র দশ টাকা আছে যা সে সেদিন তখন পর্যন্ত উপার্জন করেছে। তার উপার্জনের সম্পূর্ণ অর্থ দিয়েও বইটি কিনতে পারবে না জানতে পেরে সে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়ল। বিষয়টি বিক্রয়-বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সন্ন্যাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তিনি ঐ রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ “আপনি এই বইটি নিয়ে কি করবেন? আপনি কি পড়তে পারেন?”

     রিক্সাওয়ালা বললঃ “ না বাবু, আমি লেখাপড়া জানি না। তবে বাড়িতে আমার ছেলে আছে, সে লেখাপড়া জানে। সে এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে। আমি তাকে বলব, সে আমাকে পড়ে শোনাবে !”

     সন্ন্যাসী বললেনঃ “কিন্তু , আপনি কি জানেন, বইটি কার সম্বন্ধে লেখা-ওপরের ছবিটিই বা কার?” সে বললঃ “না, বাবু, আমি কিছুই জানি না। শুধু যে-ভদ্রমহিলাকে আমি রিক্সা করে নিয়ে যাচ্ছিলাম তাঁর হাতে ঐ বইটি আমি দেখলাম। বইয়ের ওপরের ছবিটা দেখে আমার মনে হলো, ওটি আমার মায়ের ছবি। আমার মাকে আমি খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি। মা আমার কেমন দেখতে ছিল আমি জানি না। আমার মনে হলো, ঐ আমার মা-ওটি আমার নিজের মায়ের ছবি। তাই ভদ্রমহিলাকে নামিয়ে দিয়েই আমি এখানে ছুটে এসেছি বইটি কিনব বলে। কিন্তু বইটির দাম ষাট টাকা, আমার আছে মাত্র দশ টাকা!” বলতে বলতে লোকটি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। সন্ন্যাসী তার কথায় এতই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে, কয়েক মুহূর্ত তিনি কোন কথা বলতে পারলেন না। তারপর তিনি লোকটিকে বললেনঃ “ভাই, আপনাকে টাকা দিতে হবে না। বইটি আপনি এমনিই নিয়ে যান !” তার মিনতিতে সন্ন্যাসী তার ঐ দশটি টাকা নিতে বাধ্য হলেন। সন্ন্যাসী বইটির সঙ্গে তাকে তার ‘মায়ের’ একখানি ছবিও উপহার দিলেন। বই ও ছবি পেয়ে লোকটির মুখে আনন্দ যেন উপচে পড়ল! তার দুই চোখ বেয়ে নেমতে লাগল অবিরল ধারা। এমন যে মা, যাঁর মধ্যে আমাদের মতো মাতৃহারা সন্তানেরা তাঁদের মাকে খুঁজে পাই, শান্তি পাই তাঁর চির স্নেহ ছায়ায়।

Sunday, April 3, 2022

17>শ্রীশ্রীমা

17> #শ্রীশ্রীমা


   মঠে যখন আসবে, যাতে মনে অহংকার না আসে সেরকম সাধারণ পোশাক পরে আসবে। 

তোমরা সংসারে আছ, মঠে এসে আর সংসারের কথা আলাপ করবে না। বাড়িতে পূজার্চনার কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করবে। 

সংসারের কাজ বেশি করতে হলে রাগ করবে না। 

রাগ করে কাজ করলে নিজের ক্ষতি হয়। শ্রীশ্রীমার চিন্তা করবে। এখানে তো তোমরা সৎশিক্ষা আর উপদেশ শোনার জন্যই আস। 

মঠের সঙ্গে এই যোগাযোগ সর্বদা রাখবে আর সবসময় শ্রীশ্রীমার স্মরণ-মনন করবে। 

মার উপদেশ যখন যেমন তখন তেমন---সেভাবে থাকার অভ‍্যাস করবে। 

শ্রীশ্রীঠাকুর, শ্রীশ্রীমা ও স্বামীজীর জন্মদিনে মঠে অবশ্যই আসবে। গুরুপূর্ণিমাতে ও উলটোরথের দিন ও আসবে। 

শ্রীশ্রীমা তোমাদের সবসময় দেখছেন, তোমাদের মঙ্গল করছেন ও করবেন। 


(প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণাজী)

******************

 

তথ্যসূত্র-( ভারতীপ্রাণা স্মৃতিকথা)                    পৃষ্ঠা--২০০

       ( সংগ্রহীত)

    <--আদ্যনাথ-->

Saturday, March 26, 2022

16>ঠাকুরের কিছু শিক্ষা +ব্রহ্মানন্দ লীলাকথা)

 16>আজ ঠাকুরের কিছু গল্প কথা পড়ছিলাম।

একটি কথা ভীষণ ভালো লাগলো সেই কারণে সকলকে জানাতে লিখে পাঠালাম।


গল্পটি লিখছেনঃ #মলয়_কুমার_ঘোষ

(পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবাংলা)

    ( তথ্যসূত্রঃ কাছের ঠাকুর)



  শ্রীশ্রীঠাকুরের এক মুসলমান শিষ্য তাঁর কাছে এসে নিজের দুঃখ দুর্দশার কথা বলছেন। ঠাকুর সবই শুনলেন, কিন্তু কোনো সমাধান দিলেন না। শুধু বললেন-  'তুই কি আমাকে সীতাশাল চাল খাওয়াতে পারিস?' ওই মুসলমান ব্যক্তি তো অবাক। অসহায় ভাবে বলল, ঠাকুর সীতাশাল ধানের চাষ সে তো অনেক খরচ! তাছাড়া প্রচুর জলের প্রয়োজন, ধান পাকার আগে পর্যন্ত জমি ভিজে থাকতে হয়। অনেক অসুবিধা ঠাকুর। 

     এই বলে সে তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ মামলা মোকদ্দমা, দুঃখ দুর্দশার কথা ফের বলতে লাগলো। কিন্তু ঠাকুর আবারো বললেন 'ও মণি, আমারে সীতাশাল চাল খাওয়াতে পারবি নে তুই?' ওই ব্যক্তি যখন তার অসুবিধের কথা বলল; তখন ঠাকুর সকৌতুকে বললেন- তোর ক্ষেতের কাছে তো একটা খাল আছে। সেখান থেকে নালা কেটে জল আনতে পারবি না জমিতে? চাষীটি বলল তা কি করে সম্ভব ঠাকুর; অন্যের ক্ষেতের ওপর দিয়ে নাল কাটলে ওরা কি ছেড়ে দেবে? তাছাড়া ওদের সাথে তো আমার এখন বিবাদ চলছে। ঠাকুর মৃদু হেসে বললেন- ওদের বুঝিয়ে বলিস তুই পারবি। ও মণি, আমার জন্য তুই এটুকু করিস! আমার যে খুব সাধ হচ্ছে রে সীতাশাল চাল খেতে!


◾এই ঘটনার বছর খানেক বাদে সেই মুসলমান চাষীটি গরুর গাড়ি বােঝাই সীতাশাল চালের বস্তা নিয়ে হাজির আশ্রমে। তার পরনে তখন নতুন লুঙ্গি, গায়ে নতুন চাদর, ঠাকুর কে দেখামাত্র-ই মুখে এক গাল হাসি। ঠাকুর এই আপনার সীতাশাল চাল।

-আরে এতো জব্বর ব্যপার। ঠাকুর আনন্দের সহিত বললেন যা বড়বৌকে দিয়ে আয়। তা তুই কেমন আছিস! আজ্ঞে ঠাকুর, খুব ভালো আছি আপনার দয়াতে।

      এখন ওই মুসলমান চাষী আর গরিব নেই। ঠাকুর চাল চেয়েছেন, তাঁকে খাওয়াতে হবে! শুধু, এই অনুরাগের টানে যার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিবাদে জড়ানো নিত্যদিনের কাজ ছিল, সে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাব করেছে। খাল কেটে জল এনেছে, তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে এখন সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। আর স্বাভাবিক ভাবেই এর ফলে মামলা-মোকাদ্দমাও সব মিটে গেছে। অন্যদিকে সীতাশাল চাল, বাজারে সহজলভ্য নয় বলে তুলনামূলকভাবে অনেক দামে সে বিক্রি করতে পেরেছে। একারণে আর্থিকভাবেও সে লাভবান হয়েছে, দূর হয়েছে তার দারিদ্র্য-ব্যাধি।


◾এর মধ্যে কোন অলৌকিক কিছু নেই বটে, কিন্তু আছে গভীর বাস্তববােধ ও মনুষ্যচরিত্র গঠনের সুকৌশল কায়দা। পূজনীয় বাবাই'দা বলেন- আমি সেই ভগবানের কাছে মাথা নত করব না! যিনি আমাকে তথাস্তু বলবেন আর সব কিছু হয়ে যাবে। আমি সেই ভগবানের কাছেই যাব যিনি আমাকে পাওয়ার পথটা দেখিয়ে দেবেন, যিনি না করে, আমাকে করিয়ে নেবেন। 'আমি সেই ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করব যিনি কুরুক্ষেত্রের ময়দানে দাঁড়িয়ে বলবেন- হে অর্জুন ভেঙে পড়োনা, দুর্বলতা ত্যাগ কর, ধনুর তোল আর যুদ্ধ করো।'


    "সংগ্রহীত"

     আদ্যনাথ রায় চৌধুরী।

          26 মার্চ 2022

    

পীযুষ রায় চৌধুরী কে পাঠালাম।


=======================


 ব্রহ্মানন্দ  লীলাকথা::----


আজ আমার এক বন্ধু দিল্লি থেকে লিখে পাঠিয়েছে ::-------

খুব ভালো লাগলো তাই পুনরায় লিখে

পাঠালাম।


গঙ্গার পশ্চিমকুলে বালীতে কল্যাণেশ্বর নামে স্বয়ম্ভুলিঙ্গ শিব বিরাজমান। ঠাকুর একদিন তাঁহার রাখালকে সঙ্গে নিয়া সেখানে যান ও শিব দর্শন করিয়া ভাবাবিষ্ট হন। এই ঘটনার বহু কাল পরে [রাজা] মহারাজ একদিন বেলুড় মঠ হইতে যাইয়া কল্যাণেশ্বরকে পূজা করিয়া আসেন। ব্রজেশ্বরানন্দ প্রভৃতি অনেকে তাঁহার সঙ্গে গিয়াছিলেন। তদবধি প্রতি সোমবার মঠ হইতে কল্যাণেশ্বরের পূজার ব্যবস্থা হইয়াছে। একবৎসর চৈত্রমাসে দারুণ গরম পড়িয়াছে, বৃষ্টির নামগন্ধও নাই। ব্রজেশ্বরানন্দকে ডাকিয়া মহারাজ কহিলেন, দেবেন, তুই যদি বারাে কলসী গঙ্গাজল দিয়ে কল্যাণেশ্বরকে স্নান করাতে পারিস তো আজই বৃষ্টি হবে। আদিষ্ট ব্যক্তি কলসী নিয়া ছুটিলেন। একে একে দ্বাদশ কলসী জলের মহাস্নান পূর্ণ হইতে না হইতে দেখা গেল কালাে মেঘে আকাশ ছাইয়া গিয়াছে। এরূপ অজস্র বারিপাত হইল যে, ব্রজেশ্বরানন্দ মঠে ফিরিয়া দেখেন জমিতে এক হাঁটু জল দাঁড়াইয়া গিয়াছে ! 

                    - (ব্রহ্মানন্দ  লীলাকথা)


       "সংগ্রহীত"

আদ্যনাথ রায় চৌধুরী।

          26 মার্চ 2022

   ====================    


   

Thursday, January 27, 2022

15>পঞ্চদীপের শিখায় স্বামী বিবেকানন্দ।।

 

15>পঞ্চদীপের শিখায় স্বামী বিবেকানন্দ।।


(১) স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজের দৃষ্টিতে - (শরৎ চন্দ্র চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ) : একদিন দ্বিপ্রহরে মঠে রয়েছি, স্বামীজী আহারের পর আমাকে ডেকে বললেন, "দেখ বাঙাল! (স্বামীজী আমাকে 'বাঙাল' বলে ডাকতেন) আজ তুই আমাকে একটু massage করে দে তো।" স্বামীজীর কাছ থেকে তৎপূর্বে আমার দীক্ষা হয়েছে, গুরুসেবা করার সুযোগ পেলাম বলে আনন্দে তাকে massage করতে লাগলাম। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই স্বামীজী বললেন, "না, এ তোর কাজ না, তুই রাজা (ব্রহ্মানন্দজী মহারাজ) কে ডেকে দে।" তখন মহারাজ আহার করে শুয়ে পড়েছেন। ধীরে ধীরে তাঁর ঘরের কাছে গিয়ে তাঁর দরজায় টোকা মারলাম। মহারাজ জেগে ছিলেন, "কে?" বলে দরজা খুলে দিলেন এবং আমার টোকা দেবার কারণ কি জিজ্ঞাসা করলেন। স্বামীজী massage করবার জন্য তাঁকে ডাকছেন, সসঙ্কোচে তা বললাম। মহারাজ কিন্তু তৎক্ষণাৎ ফতুয়াটি গায়ে দিয়ে কাপড় মালকোঁচা করে পরে স্বামীজীর ঘরে প্রবেশ করলেন। স্বামীজী বললেন, "দেখ রাজা, আজ শরীরটা খারাপ বোধ করছি। তাই এই বাঙালটাকে massage করতে বলেছিলাম, কিন্তু ও কিছুই করতে পারল না, তাই তোকে ডেকেছি।" মহারাজ আর দ্বিরুক্তি না ক'রে তখনই স্বামীজীকে দলাই-মলাই করতে লাগলেন এবং পুরো দু-ঘন্টা ঐরূপ করে ঘর্মাক্ত শরীরে বাইরে এলেন এবং তাঁর নিজের ঘরে গেলেন। আমি ঘরের বাইরে ছিলাম। কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে পুনরায় ধীরে ধীরে তাঁর দরজায় টোকা দিলাম। মহারাজ আমাকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুনরায় ঘা দেবার কারণ কি, জিজ্ঞাসা করলেন। তখন অতিশয় সঙ্কোচের সঙ্গে তাঁকে বললাম, "মহারাজ আজ আমার মনে বড় একটা সংশয় উঠেছে, তা দূর করার জন্য আপনার কাছে আবার এই সময় এসে বিরক্ত করছি।" মহারাজ অভয় দিয়ে বললেন, "কি বল্ !" তদুত্তরে বললাম, "মহারাজ, শুনেছি---আপনি শ্রীশ্রীঠাকুরের মানসপুত্র, স্বামীজীর গুরুভাই, স্বামীজীও আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করেন অনেক সময় দেখেছি। কিন্তু আজ আপনাকে ডেকে এইরূপ massage করালেন কেন বুঝতে পারছি না।" শুনেই শ্রীশ্রীমহারাজ জিভ কেটে বললেন, "বলিস কি রে! সাক্ষাৎ শিব! তুই কি জানিস নে?"


(২) স্বামী তুরীয়ানন্দ‌‍‍‌‌: লাটু মহারাজ যখন তখন ঘুমিয়ে পড়তেন বলে ঠাকুর একবার খুব রেগে যান। তাঁকে তাড়িয়ে দিতে চাইলেন। শেষে স্বামীজী ধরে পড়ে সব গোল কাটিয়ে দিলেন। লাটু মহারাজ তাই বলতেন, "যদি গুরুভাই হয় তবে বিবেকানন্দ"। সারদা (স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ) মঠ ছেড়ে বাড়ি যেতে চাইলে, মহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ) তাকে বোঝাচ্ছেন, "কেন যাবি? নরেনকে ছেড়ে কোথায় যাবি? এত ভালবাসা আর কোথায় পেয়েছিস? আমিও তো ইচ্ছা করলে বাড়ি গিয়ে থাকতে পারি। আমি তবে কেন পড়ে রয়েছি? ঐ এক নরেনের ভালবাসার জন্য।" আমি একবার স্বামীজীকে ঠাকুরের সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উত্তরে আমায় বললেন, "ঠাকুরের কথা আর কি বলি? তিনি LOVE personified।"


(৩) স্বামী সারদানন্দ: স্বামীজী কাউকে তাচ্ছিল্য করতেন না। আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলতেও ঘৃণা বোধ করতাম, তিনি দু-ঘণ্টা বসে তাদের সঙ্গে আলাপ করতেন।

আমরা সবাই ঠাকুরের ঘরে বসে আছি, স্বামীজী ঘরে ঢুকতেই তাঁর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে ঠাকুর চেঁচিয়ে বললেন, "হাঁ, এঁর মতো কেউ নেই। দ্যাখ্। তোকে এখন কেউ বুঝতে পারবে না। তুই ঠিক থাক।" দেহত্যাগের কিছুদিন আগে স্বামীজী একদিন আমাকে বলেছিলেন, "ওরে আর সে মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি না। বেটি আমার হাত ছেড়ে দিলে।" আমি তখন তাঁকে বলি, "সেকি ভাই, তা কখনো হতে পারে? মা তোমার হাত সর্বদাই ধরে আছেন।" সেইদিন থেকে আমি বুঝলাম, স্বামীজীর শরীর দিয়ে মার যা করবার ছিল তা সাঙ্গ হয়েছে।


(৪) স্বামী অখণ্ডানন্দ: বেলুড়ে একদিন তখনো রাত আছে, উঠে পড়েছি। উঠেই স্বামীজীকে দেখতে ইচ্ছা হলো। স্বামীজীর ঘরের দরজায় গিয়ে আস্তে আস্তে টোকা দিচ্ছি, ভেবেছি স্বামীজী ঘুমুচ্ছেন। উত্তর না আসলে আর জাগাব না। স্বামীজী কিন্তু জেগে আছেন ... ঐটুকু টোকাতেই উত্তর আসছে গানের সুরে...

"Knocking knocking who is there?

Waiting waiting, oh brother dear!

Once for all-oh, brother receive me!

Once for all-oh, sinner believe me!

Unto me Cross thy burden fall;

Once for all-oh, once for all!"


স্বামীজীর কথা কি বলব? তাঁর কাছে আমি এতটুকু। মঠে এমন দিনও গেছে যে আলোচনা করতে করতে রাত দুটো বেজে গেছে স্বামীজী বিছানায় শোননি, চেয়ারে বসেই বাকি রাতটা কাটিয়েছেন।


(৫) স্বামী অভেদানন্দ: স্বামীজী আমাদের নাম দিয়েছিলেন। আমার নাম দিলেন অভেদানন্দ। গুরুর পাদুকা সামনে রেখে হোম হয়েছিল। আমরা তখন ছোট। তিনি (বিবেকানন্দ) আমাদের মধ্যে বড় ছিলেন। আমরা তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো জানতাম, তাঁকেই আমাদের নেতা বলে মানতাম।

গুরুভাইদের প্রতি স্বামীজীর কী ভালবাসা এবং বিশ্বাসই না ছিল। তিনিই তো ঠাকুরের অবর্তমানে তাঁর ভালবাসা ও বিশ্বাস দিয়ে গুরুভাইদের সকলকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছিলেন। তিনি কি তিনিই জানেন। বিবেকানন্দ, কি আমি বা আমরা যা-কিছু করেছি বা করছি সেসব তাঁরই শক্তি। অশরীরী হয়ে তাঁরই ভাব আমাদের মধ্যে খেলছে।


          ( সংগৃহিত )

  <--আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->

==========================

Wednesday, January 12, 2022

14>বিবেকানন্দ ও তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি।

 


14>বিবেকানন্দ ও তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি।

Swami Vivekananda:  

স্বামী বিবেকানন্দের বুদ্ধিমত্তা এবং উপস্থিত বুদ্ধি এক ঝলক।

১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি উৎসবের দিন উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে ৩ নম্বর গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

 ছোট বেলা থেকেই প্রখর উপস্থিত বুদ্ধি ও

মেধাবী ছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দ ছোটবেলার নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত।

   নরেন্দ্রনাথ  ছোটবেলা থেকেই খুব বুদ্ধিমান ছিলেন। বলা হয়, মায়ের আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং পিতার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে স্বামীজি জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার গুণ পেয়েছিলেন।


স্বামীজির বাবা বিশ্বনাথ দত্ত কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ছিলেন। তাঁর পিতামহ দুর্গাচরণ দত্ত সংস্কৃত এবং ফারসি ভাষার একজন পণ্ডিত ছিলেন এবং ২৫ বছর বয়সে সন্ন্যাসী হন। পারিবারিক পরিবেশ তাঁর চিন্তাভাবনাকে গঠন করতে সাহায্য করেছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলো খুব ভালোবাসতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবহারিক জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আরও গভীর হয়। 

তার বুদ্ধিমত্তা এবং উপস্থিত বুদ্ধি

 সারা বিশ্বকে অবাক করেছিলেন। এসব ঘটনায় মানুষ শুধু অবাকই হননি, তার ব্যক্তিত্বের প্রতি মানুষের আকর্ষণও বেড়েছিল বহুগুণ।


স্বামীজী একজন বিদেশিকে উপযুক্ত জবাব দিয়েছিলেন।


স্বামীজী সন্ন্যাসীর মতো পোশাক পরিধান করতেন। তিনি একজন তপস্বীর জীবনযাপন করেছিলেন যিনি সারা বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন লোকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। একবার স্বামীজী যখন বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর পোশাক লোকেদের নজর কেড়েছিল। শুধু তাই নয়, একজন বিদেশি ব্যক্তি তার পাগড়িও টেনে নিয়ে যান। স্বামীজী তাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আমার পাগড়ি টানলে কেন? প্রথমে স্বামীজির ইংরেজি শুনে অবাক হয়ে যান ওই ব্যক্তি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কি ইংরেজিতে কথা বলো? তুমি কি শিক্ষিত? স্বামীজী বললেন, হ্যাঁ আমি সুশিক্ষিত এবং ভদ্রলোক। এতে ওই বিদেশি বললেন, তোমার জামা-কাপড় দেখে মনে হয় না তুমি ভদ্রলোক। স্বামীজী তাকে উপযুক্ত জবাব দিয়ে বললেন, তোমার দেশে একজন দর্জি তোমাকে ভদ্রলোক বানায়, যেখানে আমার দেশে আমার চরিত্র আমাকে ভদ্রলোক করে।


আলওয়ারের মহারাজাকে শেখানো পাঠ


এটি রাজা এবং স্বামীজির মধ্যে একটি আকর্ষণীয় উপাখ্যান। একবার স্বামীজি আলওয়ারের মহারাজা মঙ্গল সিংয়ের দরবারে পৌঁছলেন। রাজা তাকে ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করলেন, 'স্বামীজী, আমি শুনেছি আপনি একজন বড় পণ্ডিত। আপনি যখন সহজে জীবনযাপন করতে পারেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করতে পারেন তখন আপনি ভিক্ষুকের মতো জীবনযাপন করেন কেন? এর উত্তরে বিবেকানন্দ খুব শান্তভাবে বললেন, 'মহারাজ, বলুন কেন আপনি রাজকীয় দায়িত্ব অবহেলা করে বিদেশি লোকদের সঙ্গে আপনার সময় কাটান এবং ভ্রমণে যান? দরবারে উপস্থিত সকলেই স্বামীজীর এই উত্তরে চমকে উঠলেন। যাইহোক, রাজাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বলেছিলেন যে আমি এটি পছন্দ করি এবং আমি এটি উপভোগ করি। তখন স্বামীজী বিষয়টি এখানেই শেষ করেন।


মহারাজ এর পর স্বামীজীকে তাঁর শিকার করা জীব-জন্তুর ছবি দেখান। স্বামীজী বললেন, 'একটি প্রাণী অন্য প্রাণীকে অকারণে হত্যা করে না, তাহলে শুধু মজা করার জন্য কেন হত্যা কর? আমি এটা অর্থহীন মনে করি।' মঙ্গল সিং হাসিমুখে উত্তর দেন, 'তোমরা যে মূর্তি পূজা কর সেগুলো মাটি, পাথর বা ধাতুর টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার কাছে এই মূর্তি-পূজা অর্থহীন মনে হয়।' হিন্দু ধর্মের উপর সরাসরি আক্রমণ দেখে, স্বামীজি রাজাকে বুঝিয়েছিলেন যে হিন্দুরা শুধুমাত্র ঈশ্বরের উপাসনা করে, তারা মূর্তিটিকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করে।


বিবেকানন্দ রাজার প্রাসাদে বাবার ছবি দেখেছিলেন। স্বামীজী এই ছবির কাছে পৌঁছে দরবারের দেওয়ানকে থুথু দিতে বললেন। এটা দেখে রাজা রেগে গেলেন। সে বলল, তুমি তাকে আমার বাবার গায়ে থুথু ফেলতে কি করে বললে? রাগান্বিত রাজাকে দেখে স্বামীজী কেবল হেসে উত্তর দিলেন, 'এ তোমার বাবা কোথায়? এটা শুধু একটা পেইন্টিং - কাগজের টুকরো, তোমার বাবার নয়।' এটা শুনে রাজা আশ্চর্য হলেন কারণ এটা ছিল মূর্তি পূজার বিষয়ে রাজার প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর। স্বামীজি আরও ব্যাখ্যা করলেন, 'দেখুন মহারাজ, এটি আপনার বাবার ছবি, কিন্তু আপনি যখন এটি দেখেন, এটি আপনাকে তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়, এখানে এই ছবিটি একটি 'প্রতীক'। এবার রাজা তার মূর্খতা বুঝতে পারলেন এবং স্বামীজির কাছে তার আচরণের জন্য ক্ষমা চাইলেন।


একজন বর্ণবাদী অধ্যাপকের পাঠ


পিটার নামে একজন শ্বেতাঙ্গ অধ্যাপক স্বামী বিবেকানন্দকে ঘৃণা করতেন। স্বামী বিবেকানন্দ তখনও তপস্বী হননি। 

তখন তিনি নরেন্দ্রনাথ নামেই পরিচিত।


একদিন নরেন্দ্রনাথ ডাইনিং রুমে খাবার নিয়ে অধ্যাপকের পাশে বসলেন। ছাত্রের গায়ের রং দেখে বিরক্ত হয়ে অধ্যাপক বললেন, 'শুয়োর আর পাখি একসঙ্গে খেতে বসে না।'  নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, 'চিন্তা করবেন না প্রফেসর, আমি উড়ে যাব' এই বলে তিনি অন্য টেবিলে বসতে গেলেন। পিটার রাগে লাল হয়ে যান।


যখন বুদ্ধিমত্তার জায়গায় অর্থ বেছে নেওয়া হয়েছিল।


অধ্যাপক তার অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরের দিন ক্লাসে তিনি নরেন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করলেন, 'মিস্টার দত্ত, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় যদি পথে দুটি প্যাকেট পান, একটি জ্ঞানের ব্যাগ এবং অন্যটি টাকা, তাহলে আপনি কোনটি নেবেন? নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, 'অবশ্যই আমি টাকার প্যাকেটটি নেব।' মিস্টার পিটার ব্যঙ্গাত্মক হেসে বললেন, 'আমি, তোমার জায়গায় থাকলে জ্ঞানের প্যাকেটটা নিয়ে যেতাম।  

নরেন্দ্রনাথ মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন, 'যার যা নেই সেটাই সবাই নেন।'


বারবার অপমান করায় প্রফেসরের রাগের সীমা রইল না। তিনি আবারও প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষার সময় স্বামীজির হাতে পরীক্ষার কাগজ তুলে দিলে তিনি তাতে 'ইডিয়ট' লিখে তাঁকে দেন। কয়েক মিনিট পরে,নরেন্দ্রনাথ

উঠে গেলেন, অধ্যাপকের কাছে গেলেন এবং তাকে শ্রদ্ধার সুরে বললেন, 'মিস্টার পিটার, আপনি এই কাগজে স্বাক্ষর করেছেন, কিন্তু আমাকে গ্রেড দেননি।'

              ( সংকলিত )

   <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

             SV2----6/2A

==========================

 



 

Monday, January 3, 2022

13>|| ত্রৈলঙ্গস্বামী এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ||

    13>|| ত্রৈলঙ্গস্বামী এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ||


ত্রৈলঙ্গ স্বামীজি এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দুই মহাসাধকই তখন কাশীতে। ত্রৈলঙ্গ স্বামীজি তখন তাঁর ভক্ত মঙ্গল ভট্টজির গৃহে অবস্থান করছেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের খুব ইচ্ছা তিনি একবার স্বচক্ষে কাশীর সচল বিশ্বনাথ ত্রৈলঙ্গ স্বামীজিকে দর্শন করবেন। তিনি তাঁর মনের কথা মথুরবাবুকে জানালেন। 


মথুরবাবু বললেন, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। স্বামীজি এখন কোথায় আছেন তাঁর খোঁজ আমি নিয়ে নিচ্ছি। তারপর আপনাকে নিয়ে যাব। ঠাকুর একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁগো ! তাই হবে।’ 


রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ত্রৈলঙ্গ স্বামীজিকে দর্শন করতে যান। ত্রৈলঙ্গ স্বামীজির মানষকন্যা ও শিষ্যা শঙ্করী মাতাজি তখন দীর্ঘ সাধনা ও সিদ্ধি লাভের পর সদ্য হিমালয় থেকে কাশী ফিরে এসেছেন। শঙ্করী মাতাজি তখন ত্রৈলঙ্গ স্বামীজির বেদির নীচে গুহাকৃত সাধনকক্ষে বসবাস করতেন। শ্রীশ্রী শঙ্করী মাতাজি সেই ক্ষণটির খুব সুন্দর বর্ণনা আমাদের জন্য রেখে গেছেন।


'ঠাকুর ত্রৈলঙ্গ স্বামীজির সন্মূখে। তাঁকে দেখেই মঙ্গলভট্টকে ইশারায় মাতাজিকে ডেকে দিতে বললেন। মঙ্গল ভট্টজি মাতাজির ঘরে প্রবেশ করে বললেন, একজন বাঙ্গালী সাধু এসেছেন, বাবা তাই আপনাকে ডাকছেন। গুরুর আদেশ তাই তিনি তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এলেন। তিনি দেখলেন, একজন শুভ্রকান্ত উজ্জ্বলদ্যুতি বিশিষ্ট বাঙ্গালি পরমহংস বাবা ত্রৈলঙ্গ স্বামীজির সঙ্গে আলাপ করিতেছেন। তাঁহার সহিত অপর একজন বাঙ্গালি ভদ্রলোক ‘শামলা’ পরিহিত ছিলেন, পরে জানিতে পারিয়াছিলেন তিনিই দক্ষিণেশ্বরের মালিক রাণী রাসমণির জামাতা মথুরবাবু।’  


ঠাকুরের সঙ্গে ত্রৈলঙ্গ স্বামীজির সমস্ত কথাবার্তা শঙ্করী মাতাজির সামনেই হয়েছিল। তবে পুরোটাই আকারে ইঙ্গিতে। 


ঠাকুর- ভগবান এক না দুই ? 

স্বামীজি- যখন সাধকের মন আত্মাতে বিলীন হয়ে যায়- সমাধি মগ্ন হয়- তখন ‘এক’ দুই আর থাকে না, তাকেই অদ্বৈতবাদ বলা হয়। আবার মন যখন ভগবানের অন্বেষণে সাধনায় নিয়োজিত হয় তখন ‘দুই’ অর্থাৎ (১) ভক্ত ও (২) ভগবান। ইহাকেই দ্বৈতবাদ বলা হয়। তাই বলতে পারা যায় ভগবান এক ও দুই। তবে বস্তুত ভগবান এক। দুইটি দানা-যুক্ত সম্পর্ণ ছোলা হল এর প্রকৃত দৃষ্টান্ত।


ঠাকুর- ধর্ম কী ? 

স্বামীজি- সত্য। 


ঠাকুর- জীবের কর্ম কী ? 

স্বামীজি- জীব সেবা। 


ঠাকুর- প্রেম কী ? 

স্বামীজি- ভগবানের নামে তম্ময় হওয়ার পর যখন চোখে জল আসে, সেই অবস্থার নাম প্রেম।


শঙ্করী মাতাজি পরবর্তীকালে বলেছেন, ‘এইসকল মর্মস্পর্শী কথা শুনে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ‘ভাবসমাধি’ হয়ে গেল। তাঁর দুই চোখ দিয়ে অবিরল প্রেমাংশু পড়তে লাগল। তিনি আরও লিখেছেন, ‘তাঁর চক্ষুর বর্হিপ্রান্ত ভাগ দিয়া মুক্তধারাবৎ গণ্ডস্থল প্লাবিত করিয়া চিবুকে পতিত হইতে লাগিল। ভাবে বিহ্বল ঠাকুরকে দেখে স্বামীজিও আপ্লুত। তিনি ইঙ্গিতে মাতাজিকে রামকৃষ্ণেদেবের মাথায় পাখার বাতাস করার নির্দেশ দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে ঠাকুরের সমাধি ভঙ্গ হল। তিনি স্বামীজির আসন-বেদি প্রদক্ষিণ করে দুই হাত তুলে নাচতে লাগলেন। পরে তিনি মথুরবাবুকে দিয়ে আধামন ক্ষীর আনিয়ে নিজের হাতে স্বামীজিকে খাইয়ে দিয়েছিলেন।' 


শঙ্করী মাতাজি লিখেছেন, ‘উভয়েই প্রেমানন্দরূপে সচ্চিদানন্দ সাগরে ভাসিতে লাগিলেন। তাঁহাদের পরষ্পরের মধ্যে একই আত্মরাজ্যে আবস্থিতিজনিত অন্তর্নিহিত ভাষায় আরও আনেক কথাবার্ত্তাদি হইয়াছিল কিন্তু তাহার প্রকৃত মর্ম উপস্থিত অন্যান্য লোকে ধারণা করিতে ও বুঝিতে পারিলেন না।'


রামকৃষ্ণ‌ পরমহংসদেবকে ত্রৈলঙ্গ স্বামীজি উপহার হিসাবে একটি নস্যির কৌটা দেন। উক্ত কৌটাটি স্বামীজি স্বপ্রণোদিত হয়ে ভোজনান্তে দক্ষিণা হিসাবে রাজ প্রাসাদ থেকে এনেছিলেন। ঠাকুর কৌটাটি পেয়ে ঠিক করেন এতে মায়ের সিঁদুর রাখা যাবে।

           ( সংগ্রহীত)

          <---আদ্যনাথ--->

============================

Sunday, January 2, 2022

12>মহাপুরুষ মহারাজের বাণী*

 12>*মহাপুরুষ মহারাজের বাণী* 


 *সাধন ভজন প্রসঙ্গে:* 

জপের কোন কালাকাল নেই যখনই সময় পাবে তখনই তাঁর নাম করবে। চলতে-ফিরতেও  তাঁর নাম স্মরণ করবে। তখন করে জপ বা মালা জপ সম্ভব নয়, কারণ তাহলে যে লোকে দেখতে পাবে। ভগবানের নাম খুব গোপনে করতে হয়, যেন লোকে  টেরও না পায়। আর তাঁর স্মরণ মনন করবে সর্বক্ষণ। একটা অভ্যাস জমিয়ে নিতে হয়। চলতে-ফিরতে খেতে-শুতে এমনকি সব কাজকর্মের মধ্যেও নিরন্তর তাঁর স্মরণ মনন করবে যেন--- একটা undercurrent ( অন্তঃস্রোত) চলছে। এইভাবে কিছুদিন অভ্যাস করলে দেখবে যে তোমার অজ্ঞাতসারে, এমনকি ঘুমের ভিতরও জপ চলেছে-- স্মরণ মনন ভিতরে ভিতরে চলেছে।


 *ঠাকুর স্বামীজী প্রসঙ্গে:* 


এ কি কম যুগ! এ মহাপুণ্য সময় এ যুগে যেই রামকৃষ্ণ নাম নেবে, তার জীবনকে আদর্শ করে ভগবান লাভের রাস্তায় এগুবে, তার পক্ষেই সব সহজ হয়ে যাবে। এখন রামকৃষ্ণের জীবনাদর্শে যদি কেউ নিজ নিজ জীবন গড়ে তোলে, তাঁর জীবনছাঁচে যদি নিজেদের জীবন ঢালাই করে নেয়, তবে তো তারপর পক্ষে ভগবান লাভ করা অতি সোজা। 

            ****   ***    ***

আমরা (রামকৃষ্ণ সংঘের সাধুরা) নিজেদের আদর্শ অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। আর ওই আদর্শ রেখে গেছেন সেই দূরদর্শী ঋষি স্বামীজি নিজে। খালি ভারতের নয় সমগ্র জগতের সহস্র বৎসরের ছবি ফুটে উঠেছিল তাঁর দিব্য দৃষ্টির সামনে এবং তিনি সব ষ্পষ্ট দেখে, জেনে শুনে তবে একটা ধারা নির্ণয় করে গেছেন। তাঁর তো আর অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া নয়! তিনি সুদূর ভবিষ্যতে দৃশ্য সব পরিষ্কার দেখতে পেতেন। আর এই যুগে শ্রীরামকৃষ্ণরূপে যে ভগবৎশক্তির আবির্ভাব হয়েছে, তেমনটি শত শত বৎসরের মধ্যে আর হয়নি। এই আধ্যাত্বিক তরঙ্গ দীর্ঘকাল অবাধে সমগ্র জগতে চলবে। এই তো সবে সূচনা, সবে আরম্ভ। যে আধ্যাত্বিক সূর্য ভারতগগনে উদিত হয়েছে তার বিমল কিরণে সমগ্র জগৎ উদ্ভাসিত হবে । তাইতো স্বামীজী বলেছেন, "এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ।" ভারতকে কেন্দ্র করেই সেই আধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ হবে।ওই ঐশী শক্তির গতিরোধ করে কার সাধ্য। ভারতের জাগরণ অতি নিশ্চিত। শিক্ষা,দীক্ষা, শক্তি,সামর্থ্য, বিদ্যা,বুদ্ধি--- সব বিষয়ে ভারতের এত উন্নতি হবে যে সমগ্র জগৎ দেখে অবাক হয়ে যাবে। ভারতের ভবিষ্যৎ এত মহিমান্বিত যে তা অতীতের গৌরবকে ম্লান করে দেবে। তখন বুঝবে যে ঠাকুর-স্বামীজী কেন এসেছিলেন, এবং ভারতের জন্য তাঁরা কি করে গেছেন। ক্ষুদ্রবুদ্ধি মানব তাঁদের কার্যকলাপ কি বুঝবে? তাঁরা যে ভারতের জাতীয় কুণ্ডলিনী-শক্তিকে জাগ্রত করে দিয়ে গেছেন, তাও কি দেখতে পাচ্ছো না?

[মহাপুরুষজীর ১৫০ তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বারাসত শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের শ্রদ্ধার্ঘ্য "মহাপুরুষ মহারাজ" পুস্তিকা থেকে। পৃষ্ঠা ৭৭ ও ৮০ । দ্বিতীয় মুদ্রণ।জানুয়ারি ২০০৫ ]

              (সংগ্রহীত)

       <---আদ্যনাথ--->

===============

11>মা সারদা খাওয়ার ব্যাপারে

 11>খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে শ্রী মা সারদা দেবী বলেছেন;;---


খাওয়া-দাওয়ার কিরকম নিয়ম পালন করা উচিত--শ্যামবাজারের ডাক্তার ললিতবাবুর এই প্রশ্নে মা বলছেন--"আদ্যশ্রাদ্ধের অন্ন খেতে নেই,ভক্তির বড় হানি হয়।বরং অন্য শ্রাদ্ধের অন্ন খাবে,তবু আদ্যশ্রাদ্ধের নয়,ঠাকুর নিষেধ করতেন।আর যা কিছু খাবে,ভগবান কে দিয়ে খাবে,অপ্রসাদী অন্ন খেতে নেই।যেমন অন্ন খাবে তেমন রক্ত হবে।শুদ্ধ অন্ন খেলে শুদ্ধ রক্ত হয়, শুদ্ধ মন হয়, বল হয়।শুদ্ধ মনে শুদ্ধাভক্তি হয়, প্রেম হয়"----------গৃহী-মানুষ কে আত্মীয় স্বজনের শ্রাদ্ধে যেতেই হয়, সেখানে কি করণীয়?ললিতবাবুর এই প্রশ্নের উত্তরে মা বলছেন--"শ্রাদ্ধে গিয়ে কাজকর্ম দেখবে,খাটবে,যেন তারা কিছু মনে না করতে পারে।কিন্তু সে দিনটা কোনরকম করে খাওয়াটা এড়াতে চেষ্টা করবে।নেহাত্ না পারলে শ্রাদ্ধে বিষ্ণু বা দেবতাদিগকে যা নিবেদন হয়, তাই গ্রহণ করবে।প্রসাদী হলে আদ্যশ্রাদ্ধের অন্নও ভক্তেরা খেতে পারে".......  শ্রী মা সারদা দেবী,শ্রীমাভাষিত,18 নং পৃষ্ঠা 

                 (সংগ্রহীত)

               <---আদ্যনাথ--->

====================