Wednesday, November 3, 2021

10>গিরিশচন্দ্র ঘোষ।

 10>গিরিশচন্দ্র ঘোষ।

জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই


আমৃত্যু সয়েছেন প্রিয়জনের বিয়োগ-ব্যথা। লাঞ্ছনা, অপমানও। থিয়েটারই ছিল তাঁর জিয়নকাঠি। তিনি গিরিশচন্দ্র ঘোষ। ঠিক এক মাস পর তাঁর জন্মদিন। লিখছেন আবীর মুখোপাধ্যায়


২৮ জানুয়ারি, ২০১৭, ০০:০০:০০
লোকটা আজ বেহেড মাতাল!
শহরের বারাঙ্গনারাও তাঁকে দরজা খুলে দিতে নারাজ!
কত গিলেছে কে জানে! মদ খেয়ে একেবারে টং! লাল চোখ।
ওই দক্ষিণেশ্বরের কথা মনে পড়ল বুঝি। সে জানে সেখানে একজন আছেন, তিনি কখনও দরজা বন্ধ করেন না!


যেমন ভাবা, অমনি জুড়ি গাড়িতে লাফিয়ে উঠল সে। নিজের লেখা পাহাড়ি পিলুতে খেমটা গাইতে গাইতে চলল। গঙ্গাপারের ভিজে হাওয়ায় ওই শোনা যাচ্ছে, ‘ছি ছি ছি ভালবেসে,/ আপন বশে কি রয়েছো।’
ঢের রাত।
মন্দিরের চারপাশে নিকষ অন্ধকার। গাড়ি থামতেই, খোঁয়ারি জড়ানো গলায় লোকটা চিৎকার করল, ‘‘ঠাকুর, ঠাকুর!’’
বেরিয়ে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব! তিনি বুঝি অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, ‘‘কাতর প্রাণে, এমন করে কে ডাকে? গিরিশ না!’’
ঠাকুরের ছোঁয়ায় যেন বিদ্যুৎস্পর্শ। সম্বিৎ ফিরে লজ্জায় নুয়ে পড়ল লোকটা।
পরমহংস বললেন, ‘‘মদ খেয়েছিস তো কি, আমিও মদ খেয়েছি। ‘সুরাপান করি না আমি, সুধা খাই জয়কালী বলে, মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল বলে।’’’ গান গাইতে গাইতে লোকটার হাত ধরে নাচতে লাগলেন ঠাকুর।


মোদো-মাতাল লোকটাই বাংলার রঙ্গমঞ্চ ও নাট্য ইতিহাসে তাঁর কালের শ্রেষ্ঠ নট!


গিরিশচন্দ্র ঘোষ।
গিরিশের জন্ম বাগবাজারে।
বাবা নীলকমল ঘোষ ছিলেন সওদাগরি অফিসের বুক-কিপার। মা রাইমণি। পাঠশালায় একদিন হাফ-আখড়াইয়ের আসরে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবর্ধনা দেখে, গিরিশের ইচ্ছে হল কবি হওয়ার। কিন্তু লেখা-পড়ায় মন কই ছেলের! সারা দিন টো টো।
মাকে হারিয়ে ফেলল গিরিশ!
ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবা নীলকমলবাবু গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণে বের হলেন। হঠাৎ ঝড়। নৌকো ডুবে যায়-যায়! গিরিশ শক্ত করে বাবার হাতটা ধরল। মা নেই, কার হাতই বা ধরবে!


ঝড় থামলে নীলকমল বললেন, ‘‘হাতটা ধরে ছিলিস, নিজের প্রাণ বড় না তোর? নৌকো ডুবলে কি ভাবছিস, তোকে বাঁচাবার চেষ্টা করতুম? যেমন করে পারি নিজেকেই বাঁচাতুম!’’


এ কী শুনল গিরিশ!


সে বুঝল এ পৃথিবীতে বিপদে তার হাত ধরার কেউ নেই আর!


‘মা’ বলে কেঁদে ফেলল সে!


সারাজীবন এ ব্যথার উপশম মেলেনি তাঁর! দুঃখ ছিল নিত্য সহচর। যখন বয়স আট, এক দাদার মৃত্যু হল। চোদ্দো বছর বয়সে হারাল বাবাকে! বোনেদের মৃত্যুও দেখতে হয়!


বাবা মারা যাওয়ার পরে বিয়ে হয়ে গেল গিরিশের! বউ, শ্যামপুকুরের নবীন সরকারের মেয়ে, প্রমোদিনী।
বিয়ের পরে, গিরিশ ফের স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু পরীক্ষাই দিলেন না। চুকে গেল তাঁর স্কুলের সঙ্গে সম্পর্ক।
তাঁর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে ভয় পেয়ে গেলেন শ্বশুরমশাই নবীনচন্দ্র! তিনি জামাইকে ‘অ্যাটকিনশন টিলটন’ কোম্পানিতে শিক্ষানবিশি চাকরি জুটিয়ে দিলেন।
গিরিশ হলেন ‘বুক-কিপার।’ এ বার তার মতি ইংরেজি সাহিত্যে।
কিন্তু স্বস্তির জীবন যে নয় তাঁর!


অফিস গেল উঠে।


১৮৭৪, ডিসেম্বরে মারা গেলেন স্ত্রী। রেখে গেলেন ছেলেমেয়ের পালনভার। গিরিশের সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। দিন কাটে তখন গঙ্গার ধারে। নেশার দিন। কবিতার দিন।
বাগবাজার। কলুটোলা। কখনও ১৪৫ কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটেও!
মৃত্যুর এই শমন একে একে কেড়ে নিয়েছে তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, পুত্র-কন্যাকেও! সব... সব হারিয়েছেন!
মর্মশোকে কেবলই বলতেন, ‘সংসার বৃহৎ রঙ্গালয়। নাট্যরঙ্গালয় তাহারই ক্ষুদ্র অনুকৃতি।’
লাট খেতে খেতে গাইতেন, ‘জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই,/ কোথা হতে আসি, কোথা ভেসে যাই।/ ফিরে ফিরে আসি, কত কাঁদি হাসি,/ কোথা যাই সদা ভাবি গো তাই।’


‘‘এত কষ্ট কেন? আয়, আমরা দু’জনে যেমন পারি, গান বাঁধি!’’
‘‘আমরা!’’
‘হ্যাঁ আমরা, কেন পারব না!’’


গিরিশের কথা শুনে হতবাক সহচর উমেশচন্দ্র চৌধুরী!


দু’জন ফিরছিলেন সে যুগের গীতিকার প্রিয়মাধব বসু মল্লিকের বাড়ি থেকে। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বাগবাজার শখের যাত্রাদল মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ পালা করবে। গান চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু গান দেননি প্রিয়মাধব।


অগত্যা দু’জনেই গান বাঁধলেন।


গিরিশ লিখলেন, ‘আহা! মরি! মরি!/ অনুপমা ছবি, মায়া কি মানবী,/ ছলনা বুঝি করে বনদেবী!’


সেই বয়স থেকেই এমন চট-জলদি লিখে ফেলায় গিরিশ ছিলেন তুখড়।


একবার শনিবার রাতে মিনার্ভা থিয়েটারে ‘প্রফুল্ল’ হচ্ছে। ঠিক হল পরের শনিবার নতুন নাটক নামবে।
গিরিশচন্দ্র ঠিক করলেন সেই রবিবারই তিনি নতুন নাটক লিখবেন!
খবর দিলেন কলমচিকে।
সে দিন ‘প্রফুল্ল’-তে যোগেশ চরিত্রে অভিনয় করেন আর গ্রিনরুমে এসে নতুন নাটকের কাহিনি-সংলাপ বলে যান। সেই রাতে গানও লিখলেন।
ফিরলেন শেষ প্রহরে।
লেখা হয়ে গেল ‘মণিহরণ।’
বলতেন, ‘‘চোখে না দেখে কিছু লিখিনি।’’ যাঁরা তাঁর কলমচি ছিলেন, দেখেছেন, তাঁর সেই ব্যথাকাতর সময়।
একবার তিনি মিনার্ভায়।
স্বভাবমতো ঘুরতে ঘুরতে বলছেন।


দ্রুত লিখে নিচ্ছেন কলমচি অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি পরে তাঁর জীবন লিখবেন। লেখার মাঝে প্রশ্ন করতেই গিরিশচন্দ্র বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন। রাগে কাঁপছেন!
হাঁপানির জন্য কষ্ট হচ্ছে। শ্বাস নিতে কেঁপে কেঁপে উঠছেন!
তবু নাটক লেখা চাই!


হেমন্তকাল এলেই রোগ যেন বেড়ে যায়। সারা শীতকাল জুড়ে ভোগেন। কিন্তু কারও কথা শুনবেন না!
লিখছিলেন, ‘সিরাজদ্দৌল্লা’।
বুকে, গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে বলছিলেন, ‘ওহে হিন্দু-মুসলমান—/ এস করি পরস্পর মার্জ্জনা এখন...।’
‘‘কী বললেন?’’
‘‘আহা! ভাবনার মাঝে প্রশ্ন করে কী ক্ষতি করলে জানো! কত বার বলেছি, তবু মনে রাখতে পারো না! লেখার মাঝে থামালে সব গোলমাল হয়ে যায়!’’


যাত্রার পরে নাটক নিয়ে পড়েন। ঠিক হল, দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’। চতুর্থ অভিনয়ের রাতে হাজির খোদ নাট্যকার।
দীনবন্ধু মিত্র।


জড়িয়ে ধরলেন গিরিশকে!
বাগবাজার ন্যাশনাল থিয়েটার ভেঙে গেলে হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার আর ন্যাশনাল থিয়েটারের জন্ম।
তবে এই সময় গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের পত্তনের ইতিহাস একটু অন্যরকম। সে’ও এক গল্প!
বাগবাজারের তরুণ জমিদার ভুবনমোহন নিয়োগী বেঙ্গল থিয়েটারে গ্রিনরুমে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন।
নিজেই থিয়েটার খুললেন। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার।
গিরিশ বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী’র নাট্যরূপ দিলেন। চাকরিও করছেন। ইন্ডিয়ান লিগের হেড ক্লার্ক।
এক বছর পরে গেলেন পার্কার কোম্পানিতে। তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, স্ত্রী সুরতকুমারী।
হঠাৎ অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনে গোল ছড়াল থিয়েটার পাড়ায়। বন্ধ হল শো!
দেনার দায়ে ডুবে
ভুবনবাবু গিরিশকে অনুরোধ করলেন থিয়েটার লিজে নিতে।
গিরিশ রাজি। তবে ‘গ্রেট’ নয়, নাম দিলেন ‘ন্যাসান্যা‌ল থিয়েটার।’
ঠিক করলেন প্রথম নাটক হবে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য।’
তত দিনে জোড়াসাঁকোর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মঞ্চনাটক ‘সরোজিনী’তে অভিনয় করে বিনোদিনীও গাইছে রবিঠাকুর।
‘জ্বল জ্বল চিতা। দ্বিগুণ, দ্বিগুণ!’
‘‘কী রে বিনোদ এখান হইতে যাইলে তোর মন কেমন করিবে না?’’
বিনোদিনী কী উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
তাঁর ছোটবাবু মানে বেঙ্গল থিয়েটারের শরৎচন্দ্র ঘোষের কথায় তিনি চুপ করে ছিলেন।
কী’ই বা বলবেন!
সামনে দাঁড়িয়ে গিরিশ ঘোষ! তাঁরা তাঁকে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন দলের জন্য।


বিনোদিনী নিজের আত্মজীবনীতে লিখছেন, ‘‘গিরিশবাবুর সহিত থিয়েটার আরম্ভ করিয়া বিডন স্ট্রীটের ‘ষ্টার থিয়েটার’ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁহার সঙ্গে বরাবরের কার্য্য করিয়া আসিয়াছি। কার্য্য ক্ষেত্রে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন এবং আমি তাঁহার প্রথমা ও প্রধানা শিষ্যা ছিলাম।’’


কেমন সম্পর্ক?


বিনোদিনী লেখেন, ‘‘জোর জবরদস্তি, মান অভিমান, রাগ প্রায়ই চলত। তিনি আমায় অত্যধিক আদর দিতেন, প্রশ্রয় দিতেন।’’
‘‘কী হল গিরিশবাবু! বারে, অমন করে তাকিয়ে থাকবেন!’’
‘‘বিনোদ! তোমাকে নিজের হাতে গড়ব। তুমি আমার সজীব প্রতিমা!’’
গিরিশের জীবনে যেন ঝেঁপে এলেন বিনোদিনী! তাঁর বিনি। মেয়ে লেখে, ‘প্রেমডোর দিয়ে তারে বাঁধি অনিবার/ সে মালা কি ভালবাসা প্রাণেশ আমার?’
অমৃতলাল বসু ‘অমৃত মদিরা’য় সেই সব দিনের কথায় লিখছেন, ‘‘গিরিশের পদাবলী রোম্যান্সের মেলা/ কবিতা লিখায়ে তাই বিনি করে খেলা/ হাসির কথায় নিশ হয়ে গেছে ভোর/ তথাপি ওঠে না কেহ ছাড়িয়া আসোর।’’
গিরিশ বিনোদকে খুব বিশ্বাস করতেন। বিনোদও মানুষটার সামনে তাঁর সব গ্রন্থি আলগা করে দেন।
এক দিন বিনোদ চুপটি করে শোনেন হর-পার্বতীর গল্প। রাত বাড়ে। নেশা ভেজানো গলায় গিরিশ শোনান তাঁর নতুন নাটক ‘আগমনী।’


গিরিশের ভাগ্য বিড়ম্বিত!


খরচের বোঝা বইতে বইতে একসময় ন্যাশনাল থিয়েটার বিকিয়ে গেল! কিনলেন প্রতাপচাঁদ মুহুরি। ১০০ টাকায় গিরিশ সেখানে ম্যানেজার!


দিন-রাত নাটক লিখছেন তিনি।
অক্লান্ত!
৮২-তে ৭টি পৌরাণিক নাটক! সঙ্গে চলছে আকণ্ঠ মদ্যপান। অমৃতলাল লিখছেন, ‘আমি আর গুরুদেব (গিরিশ) যুগল ইয়ার/ বিনির (বিনোদিনী) বাড়িতে যাই খাইতে বিয়ার।’ শেষ হলে ফের আনা হয় ‘বি-ফাইভ ব্র্যান্ডি।’
হাঁটুতে মুখ রেখে স্থির হয়ে বসে আছেন বিনোদিনী।
তাঁর চোখ লাল!
খোলা চুল। এলোমেলো শাড়ির কুঁচি-আঁচল। থমথমে ঘর-দুয়ার।
বিনোদ থিয়েটার ছেড়ে দিতে চান!
গিরিশ আর অমৃত তাঁকে বোঝাচ্ছেন। কোনও কথাই যেন বিনোদের কানে ঢুকছে না।
তাঁর কেবল মনে পড়ে যাচ্ছে প্রতাপ জুহুরির কুৎসিত ভাষা, চোখের ইঙ্গিত! বিনির কী দোষ!
পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে কাশী গিয়েছিলেন। ফিরতে দেরি হয়েছে। তাই বলে ছুটির মাইনে দেবেন না!
বিনোদিনীর সঙ্গে গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন গিরিশও। প্রতাপকে বলেছিলেন, ‘‘মাইনে না দিলে বিনোদ কিন্তু কাজ করবে না!’’


‘‘মাহিনা কেয়া?’’


গিরিশ হতবাক প্রতাপের কথা শুনে। ঘেন্নায় গা রি রি করছিল বিনোদের! বটে মাহিনা দেবে না!
রাগে কাঁপতে কাঁপতে চলে এসেছিলেন বিনোদ। কিন্তু সে চলে গেলে এখন যে খুব বিপদ হয় গিরিশের। দলের সবার। গিরিশ বোতল নিঃশেষ করে বিনোদকে আদর করে বোঝাতে গেলেন, তিনি জানেন তাঁর কথা এই মেয়ে ফেলবে না!


গিরিশবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ ব‌লতে গিয়ে ঠোঁট কেঁপে উঠল বিনোদের! পারল না তাঁর বিনি!
অমৃত মিত্র বললেন, ‘‘দেখ বিনোদ, এখন গোল করিস না। একজন মাড়োয়ারির ছেলে নতুন থিয়েটার করতে চায়। যত টাকা লাগে সে খরচ করবে। কিছু দিন চুপ করে থাক। দেখ কী হয়!’’
কিছু দিন পরে ন্যাশনাল ছেড়ে দিলেন গিরিশ। ছাড়লেন বিনোদিনীও।


কলকাতায় তখন নটী বিনোদিনীর ঢলঢলে রূপের বেশ কদর! সব পুরুষই তাঁকে ছুঁতে চায়। ছোঁয়া কী সহজ!


মুগ্ধ মাড়োয়ারি ঘরের ছেলে গুর্মুখ রায়। ৬৮ বিডন স্ট্রিটে লিজের জায়গায় তিনি তৈরি করলেন পাকা মঞ্চ। ঠিক ছিল নাম দেবেন, বিনোদিনীর নামে।
কিন্তু হল কই!
গড়ে উঠল স্টার থিয়েটার।
সকাতরে বিনোদিনী দাসী লিখছেন স্টার-কথা, ‘‘সকলে চলিয়া যাইলে আমি নিজে ঝুড়ি করিয়া মাটী বহিয়া পিট, ব্যাক সিটের স্থান পূর্ণ করিতাম।... আমার সেই সময় আনন্দ দেখে কে?...সকলে আমায় বলেন যে, ‘এই যে থিয়েটার হাউস হইবে, ইহা তোমার নামের সহিত যোগ থাকিবে।’...কিন্তু কার্যকালে উঁহারা সে কথা রাখেন নাই কেন— তাহা জানি না!’’
বিনির মনখারাপ!
সকলে ঠকিয়েছে তাঁকে!
গিরিশ জানেন কী করে দুলালির মন ভাল করতে হয়। বিনোদকে ‘সতী’ চরিত্রে রেখে লিখলেন ‘দক্ষযজ্ঞ’। নিজে সাজলেন ‘দক্ষ।’
কিন্তু বেশি দিন সুখ সইল না।
বিনোদিনীকে সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসাবে দাবি করে স্টারে টাকা ঢেলেছিল যে গুর্মুখ রায়, সেও সরে গেল। ভেঙে গেল ‘স্টার’-এর স্বপ্ন!
এগারো হাজার টাকায় স্টার হস্তান্তরের ব্যবস্থা করলেন দলের কয়েক জনের নামে। কিন্তু নিজে মালিক হলেন না। কেন না, অনুজ অতুলকৃষ্ণকে কথা দিয়েছিলেন, থিয়েটারে যত দিন থাকবেন, কখনও নিজে মালিক হবেন না! মালিকানা বদল হলেও নাটক থেমে রইল না। কিন্তু গিরিশের ভিতরে ভিতরে অস্থিরতা যেন বেড়েই চলেছে।
বুক জুড়ে জ্বালা!
লরোগে, শোকে দহিত তিনি!
মুক্তি মেলে না!
কালীঘাটে ফি সপ্তাহে শনি-মঙ্গলবার হাড়কাঠের কাছে বসে সারারাত্তির জগদম্বাকে ডাকতে থাকেন।
উচ্চারণ করেন মাতৃনাম, ‘কালী করালবদনা।’ পথের লোককে জিজ্ঞেস করেন, ‘‘মুক্তি কীসে গা!’’
গিরিশের দিকে তাকিয়ে হাসছেন ঠাকুর। নাচতে নাচতেই হাসছেন!
ভাব-কোমল নৃত্য!
আর রাম দত্ত খোল বাজাচ্ছেন।
আর পরমহংস নাচছেন।
দু’হাত তুলে ঠাকুর গাইছেনও, ‘নদে টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে।/ নদে টলমল...।’ গাইতে গাইতেই সমাধি নিলেন ঠাকুর।
তিনি চোখ খুলতে গিরিশ ঠাকুরকে ফের জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আমার মনের বাঁক যাবে?’’
ঠাকুর বললেন, ‘‘যাবে।’’
যেন বিশ্বাস হচ্ছে না গিরিশের! তিনি বার বার জিজ্ঞেস করছেন। ঠাকুর হেসে তিন সত্যি করলেন।
এ প্রথম নয়। গিরিশের যখন চল্লিশ, শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সেই প্রথম দেখা তাঁর।
এক সন্ধ্যায় পরমহংসকে বারবার ‘সন্ধে হল, সন্ধে হল’ জিজ্ঞেস করতে দেখে বলেছিলেন, ‘‘ঢং দেখো, সন্ধ্যা হইয়াছে, সম্মুখে সেজ জ্বলিতেছে, তবু উনি বুঝিতে পারিতেছেন না!’’
আরেক বার বলরাম বসুর বাড়িতে দেখে পালিয়ে এসেছিলেন!
ঠাকুরের তাঁর তৃতীয়বার দেখা ১৮৮৪-তে। ‘চৈতন্যলীলা’র অভিনয় দেখতে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব।
স্টার থিয়েটার। ২০ সেপ্টেম্বর। মঞ্চে চৈতন্যের ভূমিকায় বিনোদিনী বৈষ্ণবনৃত্যের পরে যখন ‘কৃষ্ণ কই-কৃষ্ণ কই’ বলে জ্ঞান হারালেন দর্শক বৃন্দাবনী প্রেমে ভাসল!
নাটক শেষ। বিনোদিনীর ‘নিমাই’ দেখে তাঁর মাথায় হাত রেখে পরমহংস বললেন, ‘‘তোর চৈতন্য হোক।’
আর গিরিশের?
দু’জনে বসে আছেন এক দিন দক্ষিণেশ্বরে। মন উচাটন গিরিশের!
পরমহংস গিরিশকে বললেন, ‘‘এখন থেকে এদিক-ওদিক দু’দিক রেখে চল। তারপর যদি এই দিক ভাঙে তখন যা হয় হবে। সকালে-বিকালে স্মরণ-মননটা একটু রাখিস, পারবিনে?’’
গিরিশ চুপ করে থাকেন! ভাবেন এ কেমন বাঁধাবাধি! বলেন, ‘‘যদি কথা রাখিতে না পারি!’’
ঠাকুর বলেন, ‘‘তবে আমায় বকলমা দে। শ্রীভগবানে পাপ-পুণ্যের ভার দিয়ে সম্পূর্ণ আত্ম-সমর্পণ কর।’’
গিরিশ এ বার রাজি হলেন!
ঠাকুরের অপার করুণায় চোখে জল গিরিশের! হাপুস নয়নে কাঁদছেন তিনি!
মেঘ যেন ঘনিয়ে এল ফের!
‘বেল্লিক বাজার’ নাটকের প্রথম রাতের অভিনয়ের পরে থিয়েটার ছেড়ে দিলেন বিনোদিনী!
প্রিয়জনের ‘ছলনার আঘাত’ তিনি ভুলতে পারেননি! অন্য দিকে গোপাললাল শীল নামে এক ব্যক্তি স্টার থিয়েটারের জমি কিনে নিলেন!
গিরিশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যেন! ত্রিশ হাজার টাকায় পুরনো স্টারকে বিক্রি করে এ বার গিরিশ অনুগামীরা চলেন হাতিবাগানে।
যেন পুনর্জন্ম স্টার থিয়েটারের!
সে সময় গোপাললালের ‘এমারেল্ড’-এ গিরিশ মাসিক তিনশো পঞ্চাশ টাকার কাজ করেছে।
সে টাকাও তিনি পাঠাতেন পুরনো দলকে। প্রতিদানে কী পেলেন?
কী-ই’বা পেতেন!
মাসে একশো টাকা মাইনে।
আর দৈনিক চার পয়সার তামাক। জুটল ক্ষত!
প্রিয় শিষ্যদের কাছ থেকে লাঞ্ছনা-অপমান! স্টারে ফিরলে গিরিশ ঘোষকে তাড়িয়ে দিলেন তাঁরই শিষ্যরা। বরখাস্ত হলেন!
মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে অঙ্গীকার করতে বাধ্য হলেন বৃদ্ধ নট, স্টারের শর্তে। গিরিশ কথা দিলেন, মাসে ১০০ টাকা পেনশনের বিনিময়ে আর কোথাও কখনও থিয়েটার করবেন না! কখনও না!
‘মমতা এস না বক্ষে মম/ জ্বল জ্বল রে অনল/ প্রতিহিংসানল জ্বল হৃদে।’
পারলেন না!
তিনি লিখলেন, ‘জনা’। ক্ষত মেটাতে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তার আগেই জন্ম হল মিনার্ভার। অভিনয় হল অনুবাদে ম্যাকবেথ।
স্থির হতে পারছেন না!
উইংসের আড়াল থেকে কে যেন তাঁকে ডাকছে! বিনোদ না! প্রতি মুহূর্তে নিজেরই তৈরি করা চরিত্রেরা বুঝি কথা বলছে ফিসফিস হাওয়ায়। তাদের সংলাপ, হাসি, কান্না ক্যাকফনি হয়ে মিশে যাচ্ছে গিরিশের বুকের জ্বালায়, হাহাকারে! আর্তরবে!
থিয়েটার পাড়ার পথের হাওয়ায় তখন গিরিশকে নিয়ে স্টার থিয়েটারের হ্যান্ডবিল উড়ছে! ধুলোয় লাট খাচ্ছে কাগজগুলো। তাতে লেখা, ‘তোমার শিক্ষিত বিদ্যা দেখাব তোমায়।’
গিরিশ হাসছেন!
পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিনয় জীবন। কখনও লিখবেন না?
হেসে উঠতেন নট। দমকা কাশি সামলে আত্মজীবনী লেখার অনুরোধ ফিরিয়ে দিতেন। বলতেন, ‘‘সে বড় সহজ কথা নয় হে। বেদব্যাসের মতো যেদিন অকপটে আত্মদোষ বলতে পারব, সেদিন লিখব।’’ শেষ কয়েক বছর কাটে ‘মিনার্ভা’, ‘ক্লাসিক’-এ।
‘ক্লাসিক’ থাকতেই একদিন চললেন তারকেশ্বর। মেয়ের জন্য পুজো দিতে। কলকাতায় যখন ফিরলেন, ততক্ষণে সব শেষ! শুনলেন দাহ হয়ে গিয়েছে মেয়ের দেহ! দুমড়ে উঠল বুক। কান্না হাহাকার হয়ে ভিজিয়ে দিল দু’চোখ! দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী চলে যাওয়ার পরে বহু কষ্টে-যত্নে-আদরে মানুষ করেছিলেন সেই শিশুটিও এভাবেই চলে গিয়েছিল! সারদামায়ের স্পর্শও তাকে ফেরাতে পারেনি! আর জীবনের এই অবেলায় চলে গেল মেয়ে! আর কত!
তাঁর শেষ অভিনয় করলেন ১৯১১-তে। নাটক ‘বলিদান’-এ করুণাময়ের চরিত্রে। সেদিন খুব বৃষ্টি। হাঁপের টান নিয়ে বার বার খালি গায়ে স্টেজে আসতে হচ্ছে গিরিশকে। অসুস্থ হলেন। রোগশয্যায় নিবেদিতাকে উৎসর্গ করে লিখলেন শেষ নাটক ‘তপোবল’।
বুকের জ্বালা যেন বেড়েই চলেছে। ঘুম নেই! সারাক্ষণ বসে থাকেন। আর বলেন, ‘‘প্রভু, আর কেন, শান্তি দাও, শান্তি দাও, শান্তি দাও!’’
চলেই গেলেন!
ফেব্রুয়ারি, ১৯১২।
বৃষ্টিতে ছেয়ে রয়েছে আকাশ। তার পেয়ে ফরিদপুর থেকে ফিরলেন ছেলে দানিবাবু। গহন রাত। মহল্লা মাতোয়ারা সংকীর্তনে।
শেষ সময় গিরিশের মৃদু কণ্ঠে শোনা গেল শ্রীরামকৃষ্ণ-নাম!
ঋণ: গিরিশচন্দ্র (অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, সম্পাদনা স্বপন মজুমদার), পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ, (অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত), গিরিশ রচনাবলী (সম্পাদনা রথীন্দ্রনাথ রায় ও দেবীপদ ভট্টাচার্য), বাই-বারাঙ্গনা গাথা (সমন্বয় ও সম্পাদনা দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়), বিনোদিনী রচনাসমগ্র, (সম্পাদনা দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়)
=≠================≠============

9>*স্বামী বিবেকানন্দ ****A +B + ( 1 to 27 ) নিজের লেখা + fb থেকে কিছু





9>*স্বামী বিবেকানন্দ ****A +B + ( 1 to 27 ) নিজের লেখা + fb থেকে কিছু


A>||-বীরেশ্বর বিবেকানন্দ-|
B>||-আজ12 ই জানুয়ারি -||




1-------------------স্বামী বিবেকানন্দ
2--------------------Arise! Awake! And stop not until the goal is reached."
3--------------------স্বামী বিবেকানন্দ নাম ছিল বীরেশ্বর অর্থাত = বীরশ্রেষ্ঠ
5--------------------স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ত্যাগের ২বত্সর পূর্বে
6--------------------Swami Vivekananda said:-Three things
7--------------------स्वयं में बहुत सी कमियों के
8-------------------স্বামী বিবেকানন্দ--12th january 1863
9> ( বিবেকানন্দ )ফিরে এলেন বিবিদিষানন্দ( আনন্দবাজার পত্রিকা )---------------

**************************************************************************

'মৃত্যু বা কালীকে উপাসনা করিতে সাহস পায় কয়জন? এস, আমরা মৃত্যুর উপাসনা করি। আমরা যেন ভীষণকে ভীষণ জানিয়াই আলিঙ্গন করি—তাহাকে যেন কোমলতর হইতে অনুরোধ না করি, আমরা যেন দুঃখের জন্যই দুঃখকে বরণ করি।''
স্বামী বিবেকানন্দ
A>||-বীরেশ্বর বিবেকানন্দ-|
<------আদ্যনাথ ----->(©)

হে বীর বীরেশ্বর বিবেকানন্দ,
জগৎকে দেখাইলে আলো আনন্দ।
গুরুর আজ্ঞা করতে পালন,
প্রতিজ্ঞা বদ্ধ ছিলে আজীবন।

হে বীর মনেপরে সেই 4ঠা জুলাই,
তুমি হাসতে হাসতে নিয়েছো বিদায়।
তোমার বাণী সকল আমাদের প্রেরণা,
এই জীবনে তোমায় ভুলতে পারবনা।

পৃথিবীর যেদেশেই পৌঁছেছি,
সর্বত্রই তোমার ছবি দেখেছি।
দেখেছি তাঁদের,
যাদের কাছে তুমি ঈশ্বর,
যাদের কাছে তুমিই জীবন।
যাদের তুমি করেছিলে আপন।
যাদের তুমি ভাল বেসেছিলে।
যাদের তুমি আলো দেখিয়ে ছিলে।

দেশ বিদেশের কত শত জনকে,
দেখিয়েছে জীবন মুক্তির আলো।
তোমার শ্বাশত বাণী
দিগ্-দিগন্তে জাগিয়েছে প্রাণের আলো।

হে বীর গুরুর আদেশের শক্তি বলে,
সনাতন ধর্ম আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আসনে।
তুমিই শিখায়েছ জীবই শিব সর্বত্র।
জীবের সেবাই শিব সেবার মন্ত্র।

তোমার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতবর্ষ,
আজ জগতের শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন।
শান্তির বাণী বিলায়ে বিশ্ব জয় করিলে,
আর্তজনের সেবায় নিজেরে বিলাইলে।

তুমিইতো শিখাইলে সকল যুব ছাত্র জনে,
স্বাস্থ্য,শিক্ষা,ধ্যান,জীবনের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান।
জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু,গুরু,পিতা,মাতা,
আর্ত দুঃখীরে জেন কভু নাকরি হেলা।

তোমার শিক্ষা ধ্যানের জ্ঞান,
জীবন গড়ার সর্বউৎকৃষ্ট জ্ঞান।
তোমার অপরূপ জ্যোতির্ময় মূর্তি,
সর্বদাই জাগায় অন্তরে অনাবিল ভক্তি।

হে বীর শ্রেষ্ঠ লহো মোর প্রনাম,
প্রভাতের উজ্জ্বল কিরণে নমি তোমারে।
নমি তোমার কর্মচিন্তা সমাজ কল্যানে,
প্ৰণমি তোমারে একান্ত মনে প্রানে।

---------<--©--●অনাথ●--->
--------【--anrc--04/07/2018--】
---------【04:15:10==40 L=】
===========================


B>||-আজ12 ই জানুয়ারি -||
<------©-আদ্যনাথ--->

12 ই জানুয়ারি,
তারে কি ভুলিতে পারি।
সপ্ত ঋষির এক ঋষি,তিনি,
এসেছিলেন ধরা ধামের পরে।
সমগ্র বিশ্ব মনে রেখেছেন যারে।
ভারত বাসি কীকরে ভুলিবে তাঁরে।

ব্রহ্মতেজে সদাই দীপ্ত,
প্রেমে ভাসমান নয়ন যুগল।
পুরুষ সিংহ তিনি বীরেশ্বর,
অমিত তেজা‍ঃ বিবেকানন্দ।
জ্ঞানে গরীয়ান।
তিনি যে মহান,
স্বামী বিবেকানন্দ ভারত শ্রেষ্ঠ,
তাঁকে জানাই প্রণাম নিবিষ্ট।

সেদিন 12 ই জানুয়ারি 1863 সাল,
মহাকাশ হতে এক জ্যোতিষ্ক,
জন্ম নিলেন ভুবনেশ্বরী দেবীর কোলে।
কলিকাতার বিশ্বনাথ দত্ত মহাশয়ের গৃহে,
3নম্বর গৌর মোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটে।
আলোয় উদ্ভাসিত ধরিত্রী,
যেন আনন্দে মাতিল প্রকৃতি ।
পুরুষ সিংহ ব্রহ্মতেজে দীপ্ত,
আভির্ভূত হলেন এক জ্যোতিষ্ক,

কালে সেই ক্ষণজন্মা অমিত বীর্য,
রানি রাসমণির দক্ষিণেশ্বরে,
গুরু শিষ্যের হলো মিলন।
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের শিষ্য হয়ে,
বীরেশ্বর বিবেকানন্দ নাম নিয়ে,
করিলেন বিশ্ব জয়।
হিন্দু ধর্মকে দিলেন শ্রেষ্ঠ আসন।
হিন্দু পুনর্জাগরণের প্রধান সেনাপতি
তিনি দার্শনিক,লেখক, সংগীতজ্ঞ।
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের
প্রতিষ্ঠাতা তিনি।
এহেন পুরোধা ব্যাক্তিত্ব কে
ভুলতে কি পারি।

আমরা ভারত বাসি
কীকরে ভুলি
সেদিনের সেই গৌরব।
যেদিন বিশ্ব ধর্ম মহাসভায়
হিন্দু সনাতন ধর্মকে,
বসাইলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আসনে।

তাঁর মুখবানি
" ওঠো জাগো,
লক্ষ্যে না পৌঁছনো পর্যন্ত থেমোনা"

তিনি বলে ছিলেন
" সম্মুখে তোমার ছাড়ি
কোথা খুঁজিছো ইশ্বর"।

আজ এই শুভ দিনে,মনে প্রাণে,
তাঁরে করি প্রণাম।
হে বিবেকানন্দ তুমি অনন্ত,
শুদ্ধ,পবিত্র,চিন্তায় ও গুনে
তুমি শ্রেষ্ঠ।
তুমি লও মোদের প্রণাম।

বিবেকানন্দ জন্ম 12 ই জানুয়ারি
1863 খ্রিস্টাব্দ।
তিরোধান 4 জুলাই 1902 খ্রিস্টাব্দ।
আজ 156 তম জন্ম দিনে বীর সন্ন্যাসীকে
জানাই আমার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম।

<--©--●অনাথ●--->
【--anrc-12/01/2019--】
【=দুপুর:01:12:22=】
【=তেঘড়িয়া=কোলকাতা -59=】

=============59 L============


1>এবারে একটু
আমার সংগ্রহ করা কিছু লেখা যেটুকু সংগ্রহ করতে পেরেছি সেই টুকুই লিখে দিলাম।

""II আজ সেই চৌঠা জুলাই - এইদিনে স্বামী বিবেকানন্দ ছেড়ে গিয়েছিলেন আমাদের কে ......

ঠিক কী ঘটেছিলো এই দিন.... ৪ঠা জুলাই, ১৯০২
========
ভোরবেলা ঘুম ভাঙল বিবেকানন্দের । তাকালেন ক্যালেন্ডারের দিকে । আজই তো সেই দিন । আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। আর আমার দেহত্যাগের দিন। মা ভুবনেশ্বরী দেবীর মুখটি মনে পড়ল তাঁর। ধ্যান করলেন সেই দয়াময় প্রসন্ন মুখটি। বুকের মধ্যে অনুভব করলেন নিবিড় বেদনা ।
তারপর সেই বিচ্ছেদবেদনার সব ছায়া সরে গেল ।
ভারী উৎফুল্ল বোধ করলেন বিবেকানন্দ। মনে নতুন আনন্দ, শরীরে নতুন শক্তি । তিনি অনুভব করলেন, তাঁর সব অসুখ সেরে গিয়েছে । শরীর ঝরঝর করছে । শরীরে আর কোনো কষ্ট নেই।
মন্দিরে গেলেন স্বামীজি । ধ্যানমগ্ন উপাসনায় কাটালেন অনেকক্ষন । আজ সকাল থেকেই তাঁর মনের মধ্যে গুন গুন করছে গান । অসুস্থতার লক্ষন নেই বলেই ফিরে এসেছে গান, সুর, আনন্দ । তাঁর মনে আর কোনও অশান্তি নেই । শান্ত , স্নিগ্ধ হয়ে আছে তাঁর অন্তর।
উপাসনার পরে গুরুভাইদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করতে করতে সামান্য ফল আর গরম দুধ খেলেন ।
বেলা বাড়ল। সাড়ে আটটা নাগাদ প্রেমানন্দকে ডাকলেন তিনি। বললেন, আমার পুজোর আসন কর ঠাকুরের পূজাগৃহে । সকাল সাড়ে নটায় স্বামী প্রেমানন্দও সেখানে এলেন পূজা করতে ।

বিবেকানন্দ একা হতে চান ।
প্রেমানন্দকে বললেন‚ আমার ধ্যানের আসনটা ঠাকুরের শয়নঘরে পেতে দে ।
এখন আমি সেখানে বসেই ধ্যান করব ।

অন্যদিন বিবেকানন্দ পুজোর ঘরে বসেই ধ্যান করেন ।
আজ ঠাকুরের শয়নঘরে প্রেমানন্দ পেতে দিলেন তাঁর ধ্যানের আসন ।চারদিকের দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিতে বললেন স্বামীজি ।
বেলা এগারোটা পর্যন্ত ধ্যানে মগ্ন রইলেন স্বামীজি । ধ্যান ভাঙলে ঠাকুরের বিছানা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে এলেন তিনি

মা কি আমার কালো,
কালোরূপা এলোকেশী
হৃদিপদ্ম করে আলো ।
তরুন সন্ন্যাসীর রূপের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে গুরুভাইরা ।

বেলা সাড়ে এগারোটার মধ্যেই দুপুরের খাওয়া সারতে বললেন বিবেকানন্দ । আজ নিজে একলা খাচ্ছেন না । খেতে বসলেন সবার সঙ্গে ।

সকালবেলা বেলুড়ঘাটে জেলেদের নৌকো ভিড়েছিল । নৌকোভর্তি গঙ্গার ইলিশ । স্বামীজির কানে খবর আসতেই তিনি মহাউত্‍সাহে ইলিশ কিনিয়েছেন । তাঁরই আদেশে রান্না হয়েছে ইলিশের অনেকরকম পদ ।

গুরুভাইদের সঙ্গে মহানন্দে ইলিশভক্ষনে বসলেন বিবেকানন্দ । তিনি জানেন, আর মাত্র কয়েকঘন্টার পথ তাঁকে পেরোতে হবে । ডাক্তারের উপদেশ মেনে চলার আর প্রয়োজন নেই । জীবনের শেষ দিনটা তো আনন্দেই কাটানো উচিত।

'একাদশী করে খিদেটা খুব বেড়েছে। ঘটিবাটিগুলোও খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে ।' বললেন স্বামীজি ।

পেট ভরে খেলেন ইলিশের ঝোল, ইলিশের অম্বল. ইলিশ ভাজা ।

দুপুরে মিনিট পনেরো বিছানায় গড়িয়ে নিয়ে প্রেমানন্দকে বললেন, সন্ন্যাসীর দিবানিদ্রা পাপ। চল, একটু লেখাপড়া করা যাক ।

বিবেকানন্দ শুদ্ধানন্দকে বললেন‚ লাইব্রেরি থেকে শুক্লযজুর্বেদটি নিয়ে আয় ।
তারপর হঠাৎ বললেন‚ এই বেদের মহীধরকৃতভাষ্য আমার মনে লাগে না |
আমাদের দেহের অভ্যন্তরে মেরুদণ্ডের মধ্যস্থ শিরাগুচ্ছে‚ ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী যে সুষুন্মা নাড়িটি রয়েছে‚ তার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আছে তন্ত্রশাস্ত্রে । আর এই ব্যাখ্যা ও বর্ণনার প্রাথমিক বীজটি নিহিত আছে বৈদিক মন্ত্রের গভীর সংকেতে । মহীধর সেটি ধরতে পারেননি ।
বিবেকানন্দ এইটুকু বলেই থামলেন ।

এরপর দুপুর একটা থেকে চারটে পর্যন্ত তিনঘন্টা স্বামীজী লাইব্রেরী ঘরে ব্যাকরণ চর্চা করলেন ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে ।

তিনি পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলি নানারকম মজার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলেন ।
ব্যাকরণশাস্ত্রের ক্লাস হাসির হুল্লোড়ে পরিণত হল ।

ব্যাকরনের ক্লাস শেষ হতেই এক কাপ গরম দুধ খেয়ে প্রেমানন্দকে সঙ্গে নিয়ে বেলুড় বাজার পর্যন্ত প্রায় দু মাইল পথ হাঁটলেন ।
এতটা হাঁটা তাঁর শরীর ইদানিং নিতে পারছে না ।

কিন্তু ১৯০২ এর ৪ ঠা জুলাইয়ের গল্প অন্যরকম । কোনও কষ্টই আজ আর অনুভব করলেন না।
বুকে এতটুকু হাঁফ ধরল না । আজ তিনি অক্লেশে হাঁটলেন ।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ মঠে ফিরলেন বিবেকানন্দ । সেখানে আমগাছের তলায় একটা বেঞ্চি পাতা । গঙ্গার ধারে মনোরম আড্ডার জায়গা । স্বামীজির শরীর ভাল থাকে না বলে এখানে বসেন না । আজ শরীর -মন একেবারে সুস্থ । তামাক খেতে খেতে আড্ডায় বসলেন বিবেকানন্দ ।
আড্ডা দিতে দিতে ঘন্টা দেড়েক কেটে গেল ।

সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা হবে । সন্ন্যাসীরা কজন মিলে চা খাচ্ছেন । স্বামীজি এক কাপ চা চাইলেন ।

সন্ধ্যে ঠিক সাতটা। শুরু হলো সন্ধ্যারতি । স্বামীজি জানেন আর দেরি করা চলবে না । শরীরটাকে জীর্ন বস্ত্রের মতো ত্যাগ করার পরমলগ্ন এগিয়ে আসছে ।

তিনি বাঙাল ব্রজেন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন । ব্রজেন্দ্রকে বললেন , 'আমাকে দুছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর ।

আমি না ডাকলে আসবি না ।'
স্বামীজি হয়তো বুঝতে পারছেন যে এটাই তাঁর শেষ ধ্যান ।

তখন ঠিক সন্ধ্যে সাতটা পঁয়তাল্লিশ । স্বামীজি যা চেয়েছিলেন তা ঘটিয়ে দিয়েছেন ।

ব্রজেন্দ্রকে ডাকলেন তিনি । বললেন , জানলা খুলে দে । গরম লাগছে ।
মেঝেতে বিছানা পাতা । সেখানে শুয়ে পড়লেন স্বামীজি । হাতে তাঁর জপের মালা ।

ব্রজেন্দ্র বাতাস করছেন স্বামীজিকে । স্বামীজি ঘামছেন । বললেন , আর বাতাস করিসনে । একটু পা টিপে দে ।

রাত ন'টা নাগাদ স্বামীজি বাঁপাশে ফিরলেন । তাঁর ডান হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল । কুন্ডলিনীর শেষ ছোবল । বুঝতে পারলেন বিবেকানন্দ । শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন তিনি ।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । গভীর সেই শ্বাস । মাথাটা নড়ে উঠেই বালিশ থেকে পড়ে গেল ।

ঠোঁট আর নাকের কোনে রক্তের ফোঁটা । দিব্যজ্যোতিতে উজ্জ্বল তাঁর মুখ । ঠোঁটা হাসি ।
ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন , 'তুই যেদিন নিজেকে চিনতে পারবি সেদিন তোর এই দেহ আর থাকবে না ।'

স্বামীজি বলেছিলেন , 'তাঁর চল্লিশ পেরোবে না ।'

বয়েস ঠিক উনচল্লিশ বছর পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন ।
পরের দিন ভোরবেলা ।
একটি সুন্দর গালিচার ওপর শায়িত দিব্যভাবদীপ্ত‚ বিভূতি-বিভূষিত‚ বিবেকানন্দ ।

তাঁর মাথায় ফুলের মুকুট ।
তাঁর পরনে নবরঞ্জিত গৈরিক বসন ।
তাঁর প্রসারিত ডান হাতের আঙুলে জড়িয়ে আছে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি ।
তাঁর চোখদুটি যেন ধ্যানমগ্ন শিবের চোখ‚ অর্ধনিমীলিত‚ অন্তর্মুখী‚ অক্ষিতারা ।

নিবেদিতা ভোরবেলাতেই চলে এসেছেন ।
স্বামীজির পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে অনবরত বাতাস করছেন ।
তাঁর দুটি গাল বেয়ে নামছে নীরব অজস্র অশ্রুধারা ।

স্বামীজির মাথা পশ্চিমদিকে ।
পা-দুখানি পুবে‚ গঙ্গার দিকে ।
শায়িত বিবেকানন্দের পাশেই নিবেদিতাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সেই গুরুগতপ্রাণা‚ ত্যাগতিতিক্ষানুরাগিণী বিদেশিনী তপস্বিনীর হৃদয় যেন গলে পড়ছে সহস্রধারে । আজকের ভোরবেলাটি তাঁর কাছে বহন করে এনেছে বিশুদ্ধ বেদনা ।
অসীম ব্যথার পবিত্র পাবকে জ্বলছেন‚ পুড়ছেন তিনি ।
এই বেদনার সমুদ্রে তিনি একা ।

নির্জনবাসিনী নিবেদিতা ।
বিবেকানন্দের দেহ স্থাপন করা হল চন্দন কাঠের চিতায় ।

আর তখুনি সেখানে এসে পৌঁছলেন জননী ভুবনেশ্বরী ।
চিৎকার করে কাঁদতে- কাঁদতে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে ।

কী হল আমার নরেনের ?
হঠাৎ চলে গেল কেন ?
ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয় ।
আমাকে ছেড়ে যাসনি বাবা ।
আমি কী নিয়ে থাকব নরেন ?
ফিরে আয় । ফিরে আয় ।
সন্ন্যাসীরা তাঁকে কী যেন বোঝালেন ।

তারপর তাঁকে তুলে দিলেন নৌকায় ।
জ্বলে উঠল বিবেকানন্দের চিতা ।
মাঝগঙ্গা থেকে তখনো ভেসে আসছে ভুবনেশ্বরীর বুকফাটা কান্না ।

ফিরে আয় নরেন ফিরে আয় ।
ভুবনেশ্বরীর নৌকো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ।
তাঁর কান্না‚ ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয়‚ ভেসে থাকল গঙ্গার বুকে ।

নিবেদিতা মনে মনে ভাবলেন‚ প্রভুর ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ডের এক টুকরো যদি পেতাম !

সন্ধে ছটা ।দাহকার্য সম্পন্ন হল । আর নিবেদিতা অনুভব করলেন‚ কে যেন তাঁর জামার হাতায় টান দিল । তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন‚ অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে‚ ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি‚ সেখানেই উড়ে এসে পড়ল ততটুকু জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড যতটুকু তিনি প্রার্থনা করেছিলেন ।

নিবেদিতার মনে হল‚ মহাসমাধির ওপার থেকে উড়ে-আসা এই বহ্নিমান পবিত্র বস্ত্রখণ্ড তাঁর প্রভুর‚ তাঁর প্রাণসখার শেষ চিঠি ।
--=============================

2>স্বামী বিবেকানন্দ
(12 January 1863----4 th July 1902)
নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রি়য়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য।

তার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে হিন্দুধর্ম তথা ভারতীয় বেদান্ত ও যোগ দর্শনের প্রচারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

অনেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং হিন্দুধর্মকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রচার করার কৃতিত্ব বিবেকানন্দকে দিয়ে থাকেন।

ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।

তার সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল, "আমেরিকার ভাই ও বোনেরা ...," ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা,যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।

শিকাগোয় স্বামী বিবেকানন্দ, সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩। ইংরেজিতে লিখেছেন: "one infinite pure and holy – beyond thought beyond qualities I bow down to thee" অর্থাৎ "প্রণাম করি সেই একক, অনন্ত, শুদ্ধ ও পবিত্র –চিন্তা ও গুণের অগম্য (ঈশ্বরকে)।"

জন্ম:::-
নরেন্দ্রনাথ দত্ত ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩
কলকাতা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
(অধুনা কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র)

মৃত্যু::-৪ জুলাই ১৯০২ (৩৯ বছর)
বেলুড় মঠ, হাওড়া, হাওড়া জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
(অধুনা বেলুড় মঠ, হাওড়া, হাওড়া জেলা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র)

প্রতিষ্ঠাতা;-রামকৃষ্ণ মিশন:-রামকৃষ্ণ মঠ
গুরু::-রামকৃষ্ণ।
দর্শন,অদ্বৈত বেদান্ত, রাজযোগ সাহিত্য কর্ম
রাজযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ, মদীয় আচার্যদেব, ভারতে বিবেকানন্দ
বিশিষ্ট শিষ্য(সমূহ):----
অশোকানন্দ, বিরজানন্দ, পরমানন্দ, আলাসিঙ্গা পেরুমল, অভয়ানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, সদানন্দ
প্রভাবান্বিত::--
সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, বাঘা যতীন, মহাত্মা গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, জওহরলাল নেহরু, বাল গঙ্গাধর তিলক, জামশেদজি টাটা, নিকোলা টেসলা, সারা বার্নহার্ড, এমা কাভ, জগদীশচন্দ্র বসু, অ্যানি বেসান্ত, রম্যা রোলাঁ, নরেন্দ্র মোদী, আন্না হাজারে

উদ্ধৃতি:--
"ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না"

স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার এক উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তিনি আকর্ষিত হতেন। তার গুরু রামকৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ; তাই মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ ভালোভাবে ঘুরে দেখেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে তিনি হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ক্লাস নিয়েছিলেন।

তার রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিকাগো বক্তৃতা, কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত, ভারতে বিবেকানন্দ, ভাববার কথা, পরিব্রাজক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত, বীরবাণী (কবিতা-সংকলন), মদীয় আচার্যদেব ইত্যাদি।

বিবেকানন্দ ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও গায়ক। তাঁর রচিত দুটি বিখ্যাত গান হল "খণ্ডন-ভব-বন্ধন" (শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ভজন) ও "নাহি সূর্য নাহি জ্যোতি"। এছাড়া "নাচুক তাহাতে শ্যামা", "৪ জুলাইয়ের প্রতি", "সন্ন্যাসীর গীতি" ও "সখার প্রতি" তার রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা। "সখার প্রতি" কবিতার অন্তিম দুইটি চরণ– “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" – বিবেকানন্দের সর্বাধিক উদ্ধৃত একটি উক্তি।

ভারতে বিবেকানন্দকে ‘বীর সন্ন্যাসী’ নামে অভিহিত করা হয় এবং তার জন্মদিনটি ভারতে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়।
==============================




3> স্বামী বিবেকানন্দ

In the year 2016 Swami Vivekananda's 153rd birth anniversary:
some inspiring quotes we need in our lives today

The chief disciple of Ramakrishna Paramahamsa . On his 153rd birth anniversary2016, we bring you 6 of Swami Vivekananda's
most inspiring quotes that stand true even today.

Young prēraṇāśrōta viśvavijētā dhermguru and Hindu
Culture in the entire world paracama who raise
The great philosopher and youth model swami
Vivekananda ji jayanti on the birth of his again
Remember quality and quality vandana




युवाओं के प्रेरणाश्रोत विश्वविजेता धर्मगुरु व हिन्दू // संस्कृति का परचम सम्पूर्ण विश्व मे फहराने वाले
महान दार्शनिक व युवाओं के आदर्श स्वामी // विवेकानन्द जी की जन्म जयन्ती पर उनका पुनः
स्मरण एवम् कोटि कोटि वन्दन
====================================================

4>"উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত "

"Arise! Awake! And stop not until the goal is reached."=
Swami Vivekananda.

Swami Vivekananda played an important role in the spiritual enlightenment of the Indian masses. He is also responsible for spreading Vedanta philosophy in the West and establishing the Ramakrishna Mission for service of the poor.
Born and raised in Kolkata, he was originally called Narendra Nath Datta, and acquired the name, Swami Vivekananda, when he became a monk. Born in an affluent family, Swamiji was always intrigued by spirituality and philosophy.
When he reached the threshold of youth, Swamiji passed through a period of spiritual crisis when he was troubled by doubts about the existence of God.
At this time, he met his then guru and mentor Sri Ramakrishna, and straightaway asked him a question that no one had been able to answer for him till then: "Sir, have you seen God?" Without a moment's hesitation, Sri Ramakrishna replied, "Yes, I have. I see Him as clearly as I see you, only in a much intense sense."
After removing several doubts from Swamiji's mind, Sri Ramakrishna won him over and thus began their guru-disciple relationship. After his guru's death, Vivekananda became the chief disciple of Ramakrishna Paramahamsa and became the founder of Ramakrishna Math and Ramakrishna Mission.
Not only this, Swamiji dedicated his life to the country and longed for the progress of the poor, the helpless and the underprivileged. He was the first religious leader in India to understand and openly declare that the real cause of India's downfall was the neglect of the masses.
He showed a beacon of light to a nation that had lost faith in its ability under the British rule and instilled self-confidence among Indians, who he believed were are second to none.

Here are 5 of Swami Vivekananda's most inspiring quotes, that stand true even today.

1> "Who is helping you, don't forget them. Who is loving you, don't hate them. Who is believing you, don't cheat them."
2> "Anything that makes you weak physically, intellectually and spiritually, reject as poison."
3>"Relationships are more important than life, but it is important for those relationships to have life in them."
4>"Like me or hate me, both are in my favor. If you like me I am in your heart, if you hate me I am in your mind."
5>"Fill the brain with high thoughts, highest ideals, place them day and night before you, and out of that will come great work."

---------------------------
5>ALL POWER IS WITHIN YOU,
YOU CAN DO ANYTHING AND EVERYTHING,

Swami Vivekananda.

==============================================
6> স্বামী বিবেকানন্দ নাম ছিল বীরেশ্বর অর্থাত = বীরশ্রেষ্ঠ

আর = নরেন্দ্র =অর্থাত =নর শ্রেষ্ঠ।
================================================
7> ALL POWER IS WITHIN YOU,

YOU CAN DO ANYTHING AND EVERYTHING,
Swami Vivekananda.
=====================================================

8> স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ত্যাগের ২বত্সর পূর্বে

স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ত্যাগের ২বত্সর পূর্বে আমেরিকাতে "ধর্ম সাধনা " নামে একটি অপূর্ব ব্রক্তিতা তে
বলেছিলেন তুমি দুই সহস্র আরোগ্য নিকেতন নির্মান করিয়া থাকিবে ।
কিন্তু তাহাতেকি আসে যায় যদি না তুমি আত্মানুভূতি লাভ করিয়া থাক,মরিবে সামান্য কুকুরের মতো
কুকুরের অনুভুতি লয়ে। কুকুর মৃত্যুকালে চিত্কার করে আর কাঁদে , কারণ সে জানে যে সে জড়বস্তু এবং
সে নিঃশেষ হয়ে যাইতেছে।
সন্তুষ্টি তোমার অন্তর ব্যাতীত অন্য কোথাও নেই। সেখানে অপরিবর্তীত,
অসীম আনন্দ রহিয়াছে। ধ্যানই সেখানে যাইবার দুয়ার। প্রার্থনা ,ক্রিয়াকান্ড, এবং অন্যান্য নানা প্রকার
উপাসনা ধ্যানের প্রাথমিক শিক্ষা মাত্র।ধ্যানের শক্তিতে আমরা আমাদের নিজ শরীর হতে বিছ্ন্নি হই।
তখন আত্মা আপনার সেই জন্মহীন মৃত্যুহীন স্বরুপকে জানতে পারে। তখন আর কোনো দুঃখ্য থাকেনা,
এই পৃথিবীতে আর জন্ম হয়না,ক্রমবিকাশ ও হয়না।
আত্মা তখন জানে যে সে সর্বদা পূর্ণ ও মুক্ত।
=================================================
9>Swami Vivekananda said:-Three things
are necessary to make every man good every nation great:-
1>Conviction of the Powers of goodness.
2>Absence of jealousy and suspicion.
3>Helping all who are trying to be and do good.
===================================================
10> स्वयं में बहुत सी कमियों के // वावजुद यदि मैं //स्वयं से प्रेम कर सकता हूं
तो फिर दूसरों में थोड़ी बहुत कमियों की // वजह से उनसे घ्रृणा कैसे कर सकता हूं। .

उदासीयों की वजह तो बहुत हैं जिंदगी में
पर बे-वजह खुश रहने का मजा ही कुछ और हैं।
=============================================
11>স্বামী বিবেকানন্দ:

স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি, ১৮৬৩ - ৪ জুলাই, ১৯০২) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল, "আমেরিকার ভাই ও বোনেরা ...," ১৮৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা, যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।
স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার এক উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তিনি আকর্ষিত হতেন। তার গুরু রামকৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ; তাই মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ ভালোভাবে ঘুরে দেখেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ১৮৯৩ সালের বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে তিনি হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ক্লাস নিয়েছিলেন।
তিনি নিম্নলিখিতভাবে বেদান্তের শিক্ষাসমূহের সারসংক্ষেপ করেন,
• প্রত্যেক আত্মাই সম্ভাব্যরুপে ঐশ্বরিক/দেবসুলভ।
• লক্ষ্য হচ্ছে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা এ দেবত্বকে সুষ্পষ্টভাবে দেখানো।
• কর্ম, বা পূজা, বা মন নিয়ন্ত্রণ, বা দর্শন - একটির দ্বারা, বা অধিকের দ্বারা, বা এ সকলগুলির দ্বারা এটি কর - এবং মুক্ত হ্‌ও।
• এটি হচ্ছে ধর্মের সমগ্রতা। মতবাদ, বা গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি হচ্ছে গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।
• যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যাই করা হোক না কেন তার সবই অধার্মিক।
• জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না।
• শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ।
• ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ।
• মানুষের সেবা করা হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা।
============================================


12> ( বিবেকানন্দ )ফিরে এলেন বিবিদিষানন্দ( আনন্দবাজার পত্রিকা )


সাত বছর আগে কলকাতা ছেড়ে বেরিয়ে প়়ড়েছিলেন তিনি। ফিরলেন আজকের তারিখেই। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৭। এত দিনে তাঁর চেনা নামটাও বদলে গিয়েছে। এখন তিনি স্বামী বিবেকানন্দ। শুভাশিস ঘটক


১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ০০:০০:০০( আনন্দবাজার পত্রিকা )


স কাল সাড়ে ৭টায় লোকাল ট্রেন শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছল। স্টেশন তখন প্রায় ২০ হাজার লোকের ভিড়ে ঠাসা। ভিড় জানে, ওই ট্রেনেই সঙ্গীদের নিয়ে স্পেশাল কম্পার্টমেন্টে রয়েছেন তিনি।

তিনি, গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী বিবিদিষানন্দ। এই শহর তাঁকে শেষ দেখেছে সাত বছর আগে, ১৮৯০ সালে। তখন তিনি ও তাঁর সতীর্থ কয়েক জন তরুণ বরাহনগরের এক পোড়ো বাড়িতে থাকেন, সেই বাড়ির এক ঘরে প্রয়াত গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের ছবির সামনে পুজোপাঠ ও শাস্ত্র আলোচনা করেন, মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শোন। গুরুর মৃত্যুর পর বিরজা হোম করে সন্ন্যাস নিয়েছেন তাঁরা, মাঝে মাঝেই বারাণসী, গাজীপুর, হিমালয়ে একাকী তীর্থদর্শনে বেরিয়ে যান। এক সতীর্থ অখণ্ডানন্দ তো তিব্বতেও চলে গিয়েছিলেন।

বিবিদিষানন্দ অবশ্য তিব্বত যাননি। হরিদ্বার, হৃষীকেশ, আলমোড়া হয়ে সটান চলে গিয়েছিলেন রাজস্থান। সেখানে খেতড়ির রাজা তাঁকে বিবেকানন্দ উপাধি দেন, শিকাগো ধর্মমহাসভায় যাওয়ার জন্য ‘ওরিয়েন্ট’ জাহাজে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে দেন। আমেরিকা, লন্ডন ঘুরে বিশ্বজয়ী সেই সন্ন্যাসী এই ট্রেনে চেপেই পা রাখবেন তাঁর চেনা শহরের চেনা স্টেশনে। সাত বছর আগে অচেনা তরুণ বিবিদিষানন্দের প্রস্থান কলকাতার মনে দাগ কাটেনি। সেই শহর আজ নতুন বেশে বিবেকানন্দকে দেখতে উদ্বেল।

দিনটা শুক্রবার। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৭। ঠিক ১২০ বছর আগের ঘটনা। কয়লার ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেনটা আসছে বজবজ থেকে। চটকলের শিল্পশহর, তেলবাহী জাহাজের বন্দর বজবজে ট্রেন যোগাযোগও তৈরি হয়েছে ঠিক সাত বছর আগে। বিবিদিষানন্দ যখন কলকাতা ছাড়ছেন, সেই ১৮৯০ সালে।

সাত বছরে পরিবর্তন অনেক। তৎকালীন মাদ্রাজ, অধুনা চেন্নাই থেকে ‘এস এস মোম্বাসা’ জাহাজে এ বার বিদেশি শিষ্যদের নিয়ে ফিরছেন বিবেকানন্দ। সঙ্গে তাঁর বক্তৃতার অনুলেখক গুডউইন, ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ও তাঁর স্ত্রী, আরও অনেকে। বিলেত থেকে ফেরার পথে প্রথমে কলম্বো, সেখান থেকে কান্ডি, জাফনায় এসেছিলেন তাঁরা। তার পর রামনাদের ভারত ভূখণ্ডে। সেখান থেকে মাদুরাই, তিরুচিরাপল্লি হয়ে ট্রেনে মাদ্রাজ।

জায়গায় জায়গায় তাঁকে দেখতে ভিড়, তিরুচিরাপল্লিতে রাত চারটেতে তাঁর ট্রেন থামার কথা। তখনও ফুল, মালা নিয়ে স্টেশনে কয়েক হাজার মানুষ। মাদ্রাজের আগে এক ছোট্ট স্টেশন, সেখানে ট্রেন থামার কথা নয়। কিন্তু বিবেকানন্দ আসছেন জেনে লাইনের ওপর শুয়ে পড়েছে কয়েকশো মানুষ। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্লান্ত শরীরে জায়গায় জায়গায় বক্তৃতা দিতে হয়েছে। বিশ্রাম নিতে নিতে চেনা শহরে ফিরবেন বলে ট্রেনে আর উঠলেন না। ১৫ ফেব্রুয়ারি সওয়ার হলেন কলকাতাগামী মোম্বাসা জাহাজে।

ফেরার পথে হুগলি নদীর চড়ায় অনেক ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। ১৮ তারিখ সন্ধ্যায় বজবজে নোঙর ফেলল জাহাজ, কিন্তু তখনকার আইনে সূর্যাস্তের পর জাহাজ থেকে নামা নিষেধ। বিবেকানন্দ ও তাঁর সঙ্গীরা তাই নামলেন ১৯ তারিখ সকালে, সেখান থেকে বজবজ স্টেশন। মাদ্রাজে তাঁকে দেখতে ভিড় করেছেল হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু বজবজ স্টেশন আজ নির্জন, নীরব।

আসলে, অভ্যর্থনা কমিটি তখন শিয়ালদহে। রাজধানী কলকাতার বাইরে বজবজের কথা কেউ ভাবেনি। বাঙালির পরিকল্পনায় এ ভাবেই সে দিন ফাঁক থেকে গিয়েছিল।

ভোরবেলা স্টেশনে পৌঁছেও অপেক্ষা করতে হল বেশ কিছু ক্ষণ। নেটিভ সন্ন্যাসীর জন্য নেই কোনও স্পেশাল ট্রেন। স্টেশন মাস্টার অবশ্য তাঁর ঘরের একটি চেয়ারে সন্ন্যাসীকে বসতে দিলেন, সেই চেয়ার এখন ফেয়ারলি প্লেসের রেল মিউজিয়ামে।

ভোরের লোকাল ট্রেন সাড়ে সাতটায় শিয়ালদহে থেমেছে, স্টেশন তত ক্ষণে মুখরিত ‘জয় পরমহংস রামকৃষ্ণ কি জয়,’ ‘জয় স্বামী বিবেকানন্দ কি জয়’ আওয়াজে। কসমোপলিটান রাজধানী সে দিন হিন্দি ভাষাতেই জয়ধ্বনি তুলেছিল। ভিড় ঠেলে অভ্যর্থনা কমিটির সেক্রেটারি, ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকার সম্পাদক নরেন্দ্রনাথ সেন কোনও ক্রমে এগিয়ে গেলেন, বিবেকানন্দকে বসিয়ে দিলেন স্টেশনের বাইরে অপেক্ষারত ল্যান্ডো গাড়িতে।

বিবেকানন্দ সেভিয়ার দম্পতিকে নিয়ে সেই গাড়িতে বসতেই এক দল ছাত্র এগিয়ে এসে ঘোড়া দুটোকে লাগাম থেকে খুলে নিজেরাই গাড়ি টানতে শুরু করল। সামনে ব্যান্ড পার্টি, মাঝে গাড়ি আর পিছনে খোল-করতাল সহ কীর্তনের দল। সেলেব্রিটি বরণের এই রকম ইভেন্ট আগে কখনও দেখেনি কলকাতা।
রাস্তার দু’ধারে ফুল নিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ। সার্কুলার রোডে ‘জয় স্বামীজি’ লেখা তোরণ, ওপরে নহবতখানা। হ্যারিসন রোডের মোড়ে আর একটা, রিপন (সুরেন্দ্রনাথ) কলেজের গেটে লেখা ‘স্বাগত’।

কলকাতা এ দিন একটা ব্যবস্থা করেছিল। রাস্তায় কোনও সভা নয়, শুধু শোভাযাত্রা। ঠিক হয়েছিল, তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে সভা হবে ৯ দিন পরে, ২৮ ফেব্রুয়ারি। শোভাবাজার রাজবাড়িতে। বিস্ত়ৃত প্রাঙ্গণ, অনেকেই সন্ন্যাসীর বক্তৃতা শুনতে পারবে।

বিবেকানন্দের গাড়ি দুপুরবেলায় পৌঁছল বাগবাজারে পশুপতিনাথ বসুর বাড়িতে। এ দিন এখানেই তাঁদের দুপুরের খাওয়ার বন্দোবস্ত। অতঃপর বরাহনগরে গোপাললাল শীলের বাগানবাড়ি। বিদেশি শিষ্যদের সেখানে রেখে তিনি চললেন আলমবাজার।

সাত বছর আগে, যে দিন বিবিদিষানন্দ বেরিয়েছিলেন, মঠ ছিল বরাহনগরের এক পোড়ো বাড়িতে। পরে ১৮৯২ সালে তরুণ সন্ন্যাসীরা চলে আসেন আলমবাজারের এই বাড়িতে। বিবেকানন্দ তখন খেতড়িতে। খবরটা পান চিঠিতে। এই ১৯ ফেব্রুয়ারি আলমবাজার মঠে তাঁর প্রথম পদার্পণ।

প্রবেশদ্বারে কলাগাছ, আম্রপল্লবসহ জলভরা কলসি সাজিয়ে রেখেছেন সতীর্থ অখণ্ডানন্দ ও রামকৃষ্ণানন্দ। অন্যরা কলকাতা গেলেও এই দুই গুরুভাই সারা দিন থেকে গিয়েছেন মঠে, তৈরি হয়েছে ছোটখাটো এক তোরণও।

কলকাতায় ফিরে বিবেকানন্দ দিনের বেলায় বিদেশি শিষ্যদের কাছে, গোপাল লাল শীলের বাগানবাড়িতে থাকেন। রাতে আলমবাজার। কখনও শাস্ত্রচর্চা, কখনও বা জানলায় হ্যামক টাঙিয়ে বই পড়েন। মাঝে মাঝে গুনগুন করেন গীতগোবিন্দের গান।

ফেরার তিন-চার দিন পর বাগবাজারে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ। সেখানেই চাঁদা নিতে হাজির গোরক্ষিণী সভার এক প্রচারক। ঘটনাটা আজও বিখ্যাত। বিবেকানন্দ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মধ্যভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় আট লাখ লোক মারা গিয়েছে। আপনারা তাঁদের জন্য কিছু করছেন না?’ ভদ্রলোকের উত্তর, ‘না, ওটা ওঁদের কর্মফল।’ বিবেকানন্দের সটান জবাব, ‘তা হলে গরুরাও নিজেদের কর্মফলে কসাইখানায় যাচ্ছে। আমাদের কিছু করার নেই।’ নাছোড়বান্দা ভদ্রলোক বললেন, ‘কিন্তু শাস্ত্র বলে, গরু আমাদের মা।’ বিবেকানন্দের উত্তর, ‘দেখেই বুঝেছি। তা না হলে এমন কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবেন?’

২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় শোভাবাজার রাজবাড়ির সভা। দালান উপচে পড়ছে মানুষের ভিড়ে। সেখানেই বললেন, ‘আজ সন্ন্যাসী ভাবে আসিনি, ধর্মপ্রচারক হিসেবেও নয়। এসেছি সেই কলকাতাবাসী বালক রূপে।…’

একটার পর একটা বক্তৃতা। শোভাবাজার, স্টার থিয়েটার। ৭ মার্চ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি, এত বছর বাদে এলেন দক্ষিণেশ্বর। তবু তাঁকে দেখতে ভিড়ে ভিড়াক্কার। শরীর দিচ্ছে না, কিন্তু মাথায় অনেক পরিকল্পনা। তৈরি করতে হবে শ্রীরামকৃষ্ণের নামে মঠ ও মিশন। জন্মতিথির পর দিনই শরীর সারাতে দার্জিলিঙের উদ্দেশে রওনা হলেন তিনি। সাত বছর পর কলকাতায় এসে বিবেকানন্দ থাকলেন মাত্র ১৬ দিন। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ।

শরীরের কথা কবে আর খেয়াল রাখলেন তিনি? শোভাবাজারে সভার তিন দিন আগেও মার্কিন শিষ্যা ওলি বুলকে লিখছেন, ‘এত ক্লান্ত, জানি না আর ছ’মাসও নিজেকে টানতে পারব কি না। তবে, কলকাতা আর মাদ্রাজে দুটো সেবাকেন্দ্র তৈরি করতে হবে। মাদ্রাজের লোকেরা বেশ আন্তরিক। কলকাতার বড়লোকেরা স্রেফ দেশপ্রেমের কারণে এ বিষয়ে উৎসাহী, উৎসাহ কাজে পরিণত হবে বলে মনে হয় না।’ বিবেকানন্দ জানতেন, শুধু দেশপ্রেমের বুকনিতে চিঁড়ে ভেজে না।

এই কথাগুলি মনে রাখাতেই ১২০ বছর আগের সেই দিনটার সার্থকতা। আজও বজবজের ‘গুডস ক্যারেজ ইউনিট’-এ পুরনো রেল স্টেশনের অতিথিশালা সাজানো হবে ফুল আর মালায়, বজবজ-শিয়ালদহ লোকালের একটা কামরা ফুল দিয়ে সাজিয়ে সেখানে রাখা হবে ফাইবার গ্লাসে তৈরি বিবেকানন্দের মূর্তি। সেই ট্রেন শিয়ালদহে পৌঁছবে, তার পর আলমবাজার মঠ অবধি পদযাত্রা। দিগ্বিজয়ীর প্রত্যাবর্তন শহর আর কী ভাবেই বা মনে রাখত?
============================================





13>“প্রলয় বা গভীর সমাধি
বাগেশ্রী—আড়া (ঝাঁপতাল)

-----------------------------------------------

নাহি সূর্য, নাহি জ্যোতিঃ, নাহি শশাঙ্ক সুন্দর,
ভাসে ব্যোমে ছায়াসম ছবি বিশ্ব চরাচর ।।
অস্ফুট মন-আকাশে, জগতসংসার ভাসে,
ওঠে ভাসে ডোবে পুনঃ অহং-স্রোতে নিরন্তর ।।
ধীরে ধীরে ছায়াদল, মহালয়ে প্রবেশিল,
বহে মাত্র 'আমি' 'আমি'-এই ধারা অনুক্ষণ ।।
সে ধারাও বদ্ধ হ'ল, শুন্যে শুণ্য মিলাইল,
'অবাঙ‍্মনসোগোচরম্', বোঝে—প্রাণ বোঝে যার ।।

- স্বামী বিবেকানন্দ।
===============================

14>স্বামীজির শিবোপাসনা-

**********************
“যখন তোমরা শুধু তাঁহাকে শিবলিঙ্গ নয়, সর্বত্র দেখিবেতখনই তোমাদের শিব ভক্তি এবং তোমাদের শিবদর্শন সম্পূর্ণ হইবে। তিনিই যথার্থ সাধু তিনিই যথার্থ হরিভক্ত, যিনি সেই হরিকে সর্বজীবে ও সর্বভুতে দেখিয়া থাকেন। যদি তুমি শিবের যথার্থ ভক্ত হও, তবে তুমি তাঁহাকে সর্বজীবে ও সর্বভূতে দেখিবে। যে নামে, যে রূপে তাঁহাকে উপাসনা করা হউক না কেন, তোমাকে বুঝিতে হইবে যে, সব তাঁহারই উপাসনা।“ (কলম্বো বক্তৃতা)

“সকল উপাসনার সার – শুদ্ধচিত্ত হওয়া ও অপরের কল্যাণ সাধন করা। দরিদ্র, দুর্বল, রোগী—সকলেরই মধ্যে যিনি শিব দর্শন করেন, তিনিই যর্থার্থ শিবের উপাসনা করেন। আর যে—ব্যক্তি কেবল প্রতিমার মধ্যে শিব উপাসনা করে, সে প্রবর্তকমাত্র। যে—ব্যক্তি কেবল শিব দর্শন করে, তাহার অপেক্ষা যে—ব্যক্তি জাতি— ধর্মনির্বিশেষে একটি দরিদ্রকেও শিববোধে সেবা করে, তাহার প্রতি শিব অধিকতর প্রসন্ন হন।

কোন ধনী ব্যক্তির একটি বাগান ছিল এবং দুইটি মালী ছিল। তাহাদের মধ্যে একজন খুব অলস, সে কোন কাজ করিত না;কিন্তু প্রভু আসিবামাত্র করজোড়ে ‘প্রভুর কিবা রূপ, কি বা গুণ!’ বলিয়া তাঁহার সম্মুখে নৃত্য করিত। অপর মালীটি বেশী কথা জানিত না—সে খুব পরিশ্রম করিয়া প্রভুর বাগানে সকল প্রকার ফল ও শাকসব্জি উৎপন্ন করিত ও সেইগুলি মাথায় করিয়া অনেক দুরে প্রভুর বাটিতে লইয়া যাইত। বলো দেখি, এই দুইজন মালীর মধ্যে প্রভু কাহাকে অধিকতর ভালবাসিতেন ? এইরূপে শিব আমাদের সকলের প্রভু, জগৎ তাঁহার উদ্যানস্বরূপ, আর এখানে দুই প্রকার মালী আছে। এক প্রকার মালী অলস কপট, কিছুই করিবে না, কেবল শিবের রূপের —তাঁহার চোখ নাক ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বর্ণনা করিবে; আর এক প্রকার মালী আছেন, যাঁহারা শিবের দরিদ্র দুর্বল সন্তান গণের জন্য, তাঁহার সৃষ্ট সকল প্রাণীর কল্যাণের জন্য চেষ্টা করেন। এই দ্বিবিধপ্রকৃতি বিশিষ্ট ভক্তের মধ্যে কেশিবের প্রিয়তর হইবে? নিশ্চয়ই যিনি শিবের সন্তান গণের সেবা করেন। যিনি পিতার সেবা করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাকে আগে তাঁহার সন্তান গণের সেবা করিতে হইবে। যিনি শিবের সেবা করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাকে তাঁহার সন্তান গণের সেবা সর্বাগ্রে করিতে হইবে—জগতের জীবগণের সেবা আগে করিতে হইবে।“ (রামেশ্বরম বক্তৃতা)
-----------------------------------------------------------------স্বর্গ আমাদের বাসনাসৃষ্ট কুসংস্কার - মাত্র, আর বাসনা চিরকালেই বন্ধন — অবনতির দ্বারস্বরূপ। ব্রহ্মদৃষ্টি ছাড়া আর কোন ভাবে কোন বস্তুকে দেখো না। তা যদি কর, তা হ’লে অন্যায় বা মন্দ দেখবে; কারণ আমরা যে বস্তু দেখতে পাই, তার উপর একটা ভ্রমাত্মক আবরণ প্রক্ষেপ করি, তাই মন্দ দেখতে পাই। এই-সব ভ্রম থেকে মুক্ত হও এবং পরমানন্দ উপভোগ কর। সব রকম ভ্রম থেকে মুক্ত হওয়াই মুক্তি।

এক হিসাবে সকল মানুষই ব্রহ্মকে জানে; কারণ সে জানে, ‘আমি আছি’; কিন্তু মানুষ নিজের যথার্থ স্বরূপ জানে না। আমরা সকলেই জানি যে, আমরা আছি, কিন্তু কি ক’রে আছি, তা জানি না। অদ্বৈতবাদ ছাড়া জগতের অন্যান্য নিম্নতর ব্যাখ্যা আংশিক সত্যমাত্র। কিন্তু বেদের তত্ত্ব এই যে, আমাদের প্রত্যকের ভিতর যে আত্মা রয়েছে, তা ব্রহ্মস্বরূপ। জগৎপ্রপঞ্চের মধ্যে যা কিছু সব — জন্ম, মৃত্যু, বৃদ্ধি, উৎপত্তি স্থিতি ও প্রলয় দ্বারা সীমাবদ্ধ। আমাদের অপরোক্ষানুভূতি বেদেরও অতীত; কারণ বেদেরও প্রামাণ্য ঐ অপরোক্ষানুভূতির উপর নির্ভর করে। সর্বোচ্চ বেদান্ত হচ্ছে — প্রপঞ্চাতীত সত্তার তত্ত্বজ্ঞান।
‘সৃষ্টির আদি আছে’ বললে সর্বপ্রকার দার্শনিক বিচারের মূলে কুঠারাঘাত করা হয়।
জগৎপ্রপঞ্চের অন্তর্গত অব্যক্ত ও ব্যক্ত শক্তিকে ‘মায়া’ বলে। যতক্ষণ সেই মাতৃরূপিণী মহামায়া আমাদের ছেড়ে না দিচ্ছেন, ততক্ষণ আমরা মুক্ত হ’তে পারি না।
জগৎটা আমাদের উপভোগের জন্য পড়ে রয়েছে; কিন্তু কখনও অভাববোধ ক’রে কিছু চেও না। অভাববোধে করাটা দুর্বলতা, অভাববোধেই আমাদের ভিক্ষুক ক’রে ফেলে। আমরা ভিক্ষুক নয়, আমরা রাজপুত্র!”

- স্বামী বিবেকানন্দ
....................................

[ বাণী ও রচনা ৪র্থ খন্ড ২২৮ পৃঃ ]

============================================

15>“যতদিন না ভক্তিতে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত হচ্ছ, ততদিন শাস্ত্রবিধি মেনে চলতে হবে।

যতদিন না তোমরা চিত্তের এতদূর দৃঢ়তা হচ্ছে যে, শাস্ত্রবিধি প্রতিপালন না করলেও তোমার হৃদয়ের যথার্থ ভক্তিভাব নষ্ট হয় না, ততদিন ঐগুলি মেনে চল, কিন্তু তারপর তুমি শাস্ত্রের পারে চলে যাও। শাস্ত্রের বিধিনিষেধ মেনে চলাই জীবনের চরম উদ্দেশ্য নয়। আধ্যাত্মিক সত্যের একমাত্র প্রমাণ প্রত্যক্ষ করা। প্রত্যককে নিজে নিজে পরীক্ষা ক’রে দেখতে হবে। যদি কোন ধর্মাচার্য বলেন, আমি এই সত্য দর্শন করেছি, কিন্তু তোমরা কোন কালে পারবে না, তাঁর কথায় বিশ্বাস ক’রো না; কিন্তু যিনি বলেন, তোমরাও চেষ্টা করলে দর্শন করতে পারো, কেবল তাঁর কথায় বিশ্বাস করবে। জগতের সকল যুগের সকল দেশের সকল শাস্ত্র সকল সত্যই বেদ। কারণ এই-সব সত্য প্রত্যক্ষ করতে হয়, আর যে কোন মানুষেই ঐ-সব সত্য আবিষ্কার করতে পারে।
যখন ভক্তিসূর্যের কিরণে দিগন্ত প্রথম উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তখন আমরা সকল কর্ম, ঈশ্বরে সমর্পণ করতে চাই এবং এক মুহূর্তে তাঁকে বিস্মৃত হ’লে অত্যন্ত দুঃখ অনুভব করি।
ঈশ্বর ও তাঁর প্রতি তোমায় ভক্তি—এ দুয়ের মাঝখানে যেন আর কিছু বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে ভক্তি কর, তাঁর প্রতি অনুরাগী হও, তাঁকে ভালোবাসো, জগতের লোক যে যাক বলে বলুক, গ্রাহ্য ক’রো না। প্রেমভক্তি তিন প্রকার—প্রথম প্রকারে দাবির ভাব, নিজে কিছু দেয় না; দ্বিতীয় প্রকারে বিনিময়ের ভাব থাকে; তৃতীয় প্রকারে প্রতিদানের কোন চিন্তা নেই। যেন আলোর প্রতি পতঙ্গের ভালবাসা—পুড়ে মরবে, তবু ভালবাসতে ছাড়বে না।”
- স্বামী বিবেকানন্দ
---------------------
(দেববাণী)
====================================

16>“যেমন কূর্ম তাহার পা ও মাথা খোলার ভেতরে গুটাইয়া রাখে-তাহাকে মারিয়া ফেলিতে পারো, খন্ড খন্ড করিয়া ফেলিতে পারো, তথাপি পা ও মাথা বাহিরে আসিবে না, তেমনি যে ব্যক্তির ইন্দ্রিয় ও প্রবৃত্তিগুলি সংযত হইয়াছে, তাহার চরিত্রও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। সে তাহার অন্তরিন্দ্রিয়গুলি সংযত করিয়াছে, তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছুই সেগুলিকে বহির্মুখী করিতে পারে না। এরূপ নিরন্তর সচ্চিন্তার প্রতিক্রিয়া দ্বারা শুভ সংস্কারগুলি তাহার মনের উপরিভাগে সর্বদা আবর্তিত হওয়ায় সৎকর্ম করিবার প্রবণতা প্রবল হয়; তাহার ফল এই হয় যে, আমরা ইন্দ্রিয়গুলি (জ্ঞানেন্দিয়ের যন্ত্র ও স্নায়ুকেন্দ্র) জয় করিতে সমর্থ হই। এভাবেই চরিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই মানুষ সত্য লাভ করিতে পারে। এরূপ লোকই চিরকালের জন্য নিরাপদ; তাহার দ্বারা কোন অন্যায় অশুভ কার্য সম্ভব হয় না। তাহাকে যেরূপ সঙ্গেই রাখো না কেন, তাহার কোন বিপদের সম্ভাবনা নাই। এই সৎপ্রবৃত্তি-সম্পন্ন হওয়া অপেক্ষা আরও এক উচ্চতর অবস্থা আছে-মুমুক্ষুত্ব। তোমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, সকল যোগের লক্ষ্য-আত্মার মুক্তি এবং প্রত্যেক যোগই সমভাবে একই লক্ষ্যে লইয়া যায়। বুদ্ধ প্রধানতঃ ধ্যানের দ্বারা, খ্রীষ্ট প্রার্থনা দ্বারা যে অবস্থা লাভ করিয়াছিলেন, মানুষ কেবল কর্মের দ্বারাই সেই অবস্থা লাভ করিতে পারে। বুদ্ধ ছিলেন কর্মপরায়ণ জ্ঞানী, আর খ্রীষ্ট ছিলেন ভক্ত; কিন্তু উভয়ে একই লক্ষ্যে উপনীত হইয়াছিলেন। এটুকুই বুঝা কঠিন। মুক্তির অর্থ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-যেমন অশুভ বন্ধন হইতে, তেমনি শুভ বন্ধন হইতেও মুক্তি। সোনার শিকলও শিকল, লোহার শিকলও শিকল। আমার আঙুলে একটি কাঁটা ফুটিয়াছে, আর একটি কাঁটা দ্বারা ঐ কাঁটাটি তুলিয়া ফেলিলাম, তোলা হইয়া গেলে দুটি কাঁটাই ফেলিয়া দিলাম। দ্বিতীয় কাঁটাটি রাখিবার দরকার নাই, কারণ দুটিই তো কাঁটা! এইরূপ অশুভ সংস্কারগুলি শুভ সংস্কার দ্বারা ব্যাহত করিতে হইবে। মনের মন্দ সংস্কারগুলি দূরীভূত করিয়া সেখানে ভাল সংস্কারের তরঙ্গ প্রবাহিত করিতে হইবে-যতদিন না যাহা কিছু মন্দ, তাহা প্রায় অন্তর্হিত হয়, অথবা নিয়ন্ত্রিত হইয়া মনের এক কোণে বশীভূত ভাবে থাকে; কিন্তু তারপর শুভ সংস্কারগুলিও জয় করিতে হইবে। এরূপে ‘আসক্ত’ মন ক্রমে ‘অনাসক্ত’ হইয়া যায়। কর্ম কর, কিন্তু ঐ কর্ম বা চিন্তা যেন মনের উপর কোন গভীর সংস্কার উৎপন্ন না করে। ছোট ছোট তরঙ্গ আসুক, পেশী ও মস্তিষ্ক হইতে বড় বড় কর্মতরঙ্গ উৎপন্ন হউক, কিন্তু তাহারা যেন আত্মার উপর গভীর সংস্কার উৎপন্ন না করে।”
- স্বামী বিবেকানন্দ।
========================================

17>১৮৯৩ সালের, ১১ই সেপ্টেম্বর চিকাগো ধর্ম-মহাসভার প্রথম দিবসে স্বামী বিবেকানন্দের কালজয়ী বক্তৃতা :

অভ্যর্থনার উত্তর

“হে আমেরিকাবাসী ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ, আজ আপনারা আমাদিগকে যে আন্তরিক ও সাদর অভ্যর্থনা করিয়াছেন, তাহার উত্তর দিবার জন্য উঠিতে গিয়া আমার হৃদয় অনিবর্চনীয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে। পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসি-সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি। সর্বধর্মের যিনি প্রসূতি-স্বরূপ, তাঁহার নামে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্গত কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর হইয়া আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিতেছি।

এই সভামঞ্চে সেই কয়েকজন বক্তাকেও আমি ধন্যবাদ জানাই, যাঁহারা প্রাচ্যদেশীয় প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিলেন যে, অতি দূরদেশবাসী জাতিসমূহের মধ্য হইতে যাঁহারা এখানে সমাগত হইয়াছেন, তাঁহারাও বিভিন্ন দেশে পরধর্মসহিষ্ণুতার ভাব প্রচারের গৌরব দাবি করিতে পারেন। যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করিনা, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভাষায় ইংরেজী ‘এক্সক্লুশন’ (ভবার্থঃ বহিষ্হকরণ, পরিবর্জন) শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া গর্ব অনুভব করি। যে জাতি পৃথিবীর সকল ধর্মের ও সকল জাতির নিপীড়িত ও আশ্রয়প্রার্থী জনগণকে চিরকাল আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি সেই জাতির অর্ন্তভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি আপনাদের এ-কথা বলিতে গর্ব অনুভব করিতেছি যে, আমরাই ইহুদীদের খাঁটি বংশধরগণের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাখিয়াছি; যে বৎসর রোমানদের ভয়ংঙ্কর উৎপীড়নে তাহাদের পবিত্র মন্দির বিধ্বস্ত হয়, সেই বৎসরই তাহারা দক্ষিণভারতে আমাদের মধ্যে আশ্রয়লাভের জন্য আসিয়াছিল। জরথুষ্ট্রের অনুগামী মহান্ পারসীক জাতির অবশিষ্টাংশকে যে ধর্মাবলম্বিগণ আশ্রয় দান করিয়াছিল এবং আজ পর্যন্ত যাহারা তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করিতেছে, আমি তাঁহাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কোটি কোটি নরনারী যে-স্তোত্রটি প্রতিদিন পাঠ করেন, যে স্তবটি আমি শৈশব হইতে আবৃত্তি করিয়া আসিতেছি, তাহারই কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করিয়া আমি আপনাদের নিকট বলিতেছিঃ ‘রুচীনাং বৈচিত্র্যাদৃজুকুটিলনানাপথজুষাং। নৃণামেকো গম্যস্ত্বমসি পয়সামর্ণব ইব।।‘

–বিভিন্ন নদীর উৎস বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু তাহারা সকলে যেমন এক সমুদ্রে তাহাদের জলরাশি ঢালিয়া মিলাইয়া দেয়, তেমনি হে ভগবান্, নিজ নিজ রুচির বৈচিত্র্যবশতঃ সরল ও কুটিল নানা পথে যাহারা চলিয়াছে, তুমিই তাহাদের সকলের একমাত্র লক্ষ্য।

পৃথিবীতে এযাবৎ অনুষ্ঠিত সন্মেলনগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাসন্মেলন এই ধর্ম-মহাসভা গীতা-প্রচারিত সেই অপূর্ব মতেরেই সত্যতা প্রতিপন্ন করিতেছি, সেই বাণীই ঘোষণা করিতেছিঃ ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।'–যে যে-ভাব আশ্রয় করিয়া আসুক না কেন, আমি তাহাকে সেই ভাবেই অনুগ্রহ করিয়া থাকি। হে অর্জুন মনুষ্যগণ সর্বতোভাবে আমার পথেই চলিয়া থাকে।

সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বারবার ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে। এই-সকল ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানবসমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত। তবে ইহাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত; এবং আমি সর্বতোভাবে আশা করি, এই ধর্ম-মহাসমিতির সন্মানার্থ আজ যে ঘন্টাধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে, তাহাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লিখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।”

- স্বামী বিবেকানন্দ।
=====================================


18>হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রীক ভাষার অধ্যাপক ডক্টর রাইট-এর সঙ্গে স্বামীজীর মাত্র তিন ঘন্টার আলাপে রাইট এত মুগ্ধ হন যে স্বামীজী পরিচয়পত্রের অভাবে ধর্মমহাসভায় যোগ দিতে পারছেন না শুনে বলেছিলেন,

“ধর্মমহাসভায় বক্তৃতা দিবার অধিকারের জন্য আপনাকে পরিচয় পত্র দেখাইতে হলে সূর্যকেও যে আলো দিবার অধিকারের জন্য পরিচয় পত্র দেখাইতে হইবে। ”

ডক্টর রাইট তাঁর এক বন্ধু ডক্টর জে. এইচ. ব্যারোজ কে একটি পত্রে লিখেছিলেন-

“এই ব্যক্তির (স্বামী বিবেকানন্দ) পাণ্ডিত্য আমাদের দেশের সমস্ত শিক্ষিত ব্যক্তির সমবেত পাণ্ডিত্যের চেয়েও বেশি।”
===================================

18>“সাহায্য এই শব্দটি তোমরা মন হইতে মুছিয়া ফেল। সাহায্য তুমি করিতে পার না। এরূপ বলা ঈশ্বরের নিন্দা করা। তাঁহার কৃপাতেই তোমার অস্তিত্ব—তুমি কি মনে কর, তুমি তাঁহাকে সাহায্য করিতেছে? তুমি তাঁহার উপাসনা করিতেছ।

সকল উপাসনার সার—শুদ্ধচিত্ত হওয়া এবং অপরের কল্যাণ সাধন করা। দরিদ্র, দুর্বল, রোগী—সকলেরই মধ্যে যিনি শিব দর্শন করেন, তিনিই যথার্থ শিবের উপাসনা করেন। যে-ব্যক্তি কেবল প্রতিমার মধ্যে শিব উপাসনা করে, সে প্রবর্তকমাত্র। যে-ব্যক্তি কেবল মন্দিরেই শিব দর্শন করে, তাহার অপেক্ষা যে-ব্যক্তি জাতি-ধর্মনির্বিশেষে একটি দরিদ্রকেও শিববোধে সেবা করে, তাহার প্রতি শিব অধিকতর প্রসন্ন হন।”

- স্বামী বিবেকানন্দ।

=======================================

20>“কতকগুলি কার্য আছে, সেগুলি যেন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মের সমষ্টি। যদি আমরা সমুদ্রতটে দন্ডায়মান হইয়া শৈলখন্ডের উপর তরঙ্গভঙ্গের ধ্বনি শুনিতে থাকি, তখন উহাকে কি ভয়ানক শব্দ বলিয়া বোধ হয়! কিন্তু তবু আমরা জানি, একটি তরঙ্গ প্রকৃতপক্ষে লক্ষ লক্ষ অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গের সমষ্টি। উহাদের প্রত্যেকটি হইতেই শব্দ হইতেছে, কিন্তু তাহা আমরা শুনিতে পাই না। যখন উহারা একত্র হইয়া প্রবল হয়, তখন আমরা শুনিতে পাই। এইরূপে হৃদয়ের প্রত্যেক কম্পনেই কার্য হইতেছে। কতকগুলি কার্য আমরা বুঝিতে পারি, তাহার আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হইয়া ধরা দেয়, তাহারা কিন্তু কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মের সমষ্টি। যদি তুমি কোন ব্যক্তির চরিত্র যথার্থ বিচার করিতে চাও, তবে তাহার বড় বড় কার্যের দিকেই দৃষ্টি দিও না। অবস্থাবিশেষে নিতান্ত নির্বোধও বীরের মতো কার্য করিতে পারে। যখন কেহ অতি ছোট ছোট সাধারণ কার্য করিতেছে, তখন দেখ-সে কি ভাবে করিতেছে; এই ভাবেই মহৎ লোকের প্রকৃত চরিত্র জানিতে পারিবে। বড় বড় ঘটনা উপলক্ষ্যে অতি সামান্য লোকও মহত্ত্বে উন্নীত হয়। কিন্তু যাঁহার চরিত্র সর্বদা মহৎ, প্রকৃতপক্ষে তিনিই মহৎ। সর্বত্র সর্বাবস্থায় তিনি একই প্রকার।”

- স্বামী বিবেকানন্দ (কর্ম-চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব-১ম খণ্ড)
=========================================

21>"অতএব, আত্মবিশ্বাসী হও। ইংরেজজাতির সাথে তোমাদের এত প্রভেদ কিসে? তাহারা তাহাদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রবল কর্তব্যজ্ঞান ইত্যাদির কথা যাহাই বলুক না কেন, আমি জানিয়াছি, উভয় জাতির মধ্যে প্রভেদ কোথায়। প্রভেদ এই- ইংরেজ নিজের উপর বিশ্বাসী, তোমরা বিশ্বাসী নও। ইংরেজ বিশ্বাস করে- সে যখন ইংরেজ, তখন সে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারে। এই বিশ্বাসবলে তাহার অন্তর্নিহিত ব্রহ্ম জাগিয়া উঠেন, সে তখন যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারে। তোমাদিগকে লোকে বলিয়া আসিতেছে ও শিক্ষা দিতেছে যে, তোমাদের কিছু করিবার ক্ষমতা নাই- কাজেই তোমরা অকর্মণ্য হইয়া পড়িয়াছ। অতএব, আত্মবিশ্বাসী হও।"

-স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, 'আমার সমরনীতি'
=========================================

22>"কপট, হিংসুক, দাসভাবাপন্ন, কাপুরুষ, যারা কেবল জড়ে বিশ্বাসী, তারা কখনও কিছু করতে পারে না। ঈর্ষাই আমাদের দাসসুলভ জাতীয় চরিত্রের কলঙ্কস্বরূপ। ঈর্ষা থাকলে সর্বশক্তিমান ভগবানও কিছু করে উঠতে পারেন না।"

স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, 'পত্রাবলী'
======================================

23>আত্মবিশ্বাসরূপ আদর্শই মানব-জাতির সর্বাধিক কল্যাণ সাধন করিতে পারে। যদি এই আত্মবিশ্বাস আরও বিস্তারিতভাবে প্রচারিত ও কার্যে পরিণত করা হইত, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জগতে যত দুঃখ-কষ্ট রহিয়াছে, সেগুলির বেশির ভাগ দূরীভূত হইত। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে মহাপ্রাণ নরনারীর মধ্যে যদি কোন প্রেরণা অধিকতর শক্তি সঞ্চার করিয়া থাকে, তাহা আত্মবিশ্বাস।

- স্বামী বিবেকানন্দ
=================================

24>কখনও ভাবিও না, আত্মার পক্ষে কিছু অসম্ভব। এরূপ বলা ভয়ানক নাস্তিকতা। যদি পাপ বলিয়া কিছু থাকে, তবে 'আমি দুর্বল' বা 'ওরা দুর্বল'—এরূপ বলাই একমাত্র পাপ।

তুমি যাহা চিন্তা করিবে, তাহাই হইয়া যাইবে। যদি তুমি নিজেকে দুর্বল ভাব, তবে দুর্বল হইবে। তেজস্বী ভাবিলে তেজস্বী হইবে।

- স্বামী বিবেকানন্দ।
==================================
25>শরীরগত অভাব পূরণ করিয়া অপরকে সাহায্য করা মহৎ কর্ম বটে, কিন্তু অভাব যত অধিক এবং সাহায্য যত সুদূরপ্রসারী, উপকারও তত মহত্তর। যদি এক ঘন্টার জন্য কোন ব্যক্তির অভাব দূর করিতে পারা যায়, অবশ্যই তাহার উপকার করা হইল; যদি এক বৎসরের জন্য তাহার অভাব দূর করিতে পারা যায়, তবে তাহা অধিকতর উপকার; আর যদি চিরকালের জন্য অভাব দূর করিতে পারা যায়, তবে তাহাই মানুষের শ্রেষ্ঠ উপকার। একমাত্র অধ্যাত্মজ্ঞানই আমাদের সমুদয় দুঃখ চিরকালের জন্য দূর করিতে পারে; অন্যান্য জ্ঞান অতি অল্প সময়ের জন্য অভাব পূরণ করে মাত্র। কেবল আত্মবি়ষয়ক জ্ঞান দ্বারাই অভাব-বৃত্তি চিরতরে বিনষ্ট হইতে পারে; অতএব আধ্যাত্মিক সাহায্য করাই মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্য করা। মানুষকে যিনি পরমার্থ-জ্ঞান প্রদান করিতে পারেন, তিনিই মানুষের শ্রেষ্ঠ উপকারক। আমরা দেখিতেও পাই, মানুষের আধ্যাত্মিক অভাব পূরণ করিবার জন্য যাঁহারা সাহায্য করিয়াছেন, তাঁহারাই সর্বাপেক্ষা শক্তিমান্ পুরুষ; কারণ আধ্যাত্মিকতাই আমাদের জীবনে সকল কর্মপ্রচেষ্টার প্রকৃত ভিত্তি। আধ্যাত্মিক দিক দিয়া যিনি সুস্থ ও সবল, ইচ্ছা করিলে তিনি অন্যান্য বিষয়েও দক্ষ হইতে পারেন। ভিতরে আধ্যাত্মিক শক্তি না জাগা পর্যন্ত মানুষের শারীরিক অভাবগুলিও ঠিক ঠিক পূর্ণ হয় না। আধ্যাত্মিক উপকারের পরই হইতেছে বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি-বিষয়ে সাহায্য। অন্ন-বস্ত্রদান অপেক্ষা জ্ঞানদান উচ্চতর-প্রাণদান অপেক্ষাও উহা মহৎ, কারণ জ্ঞানই মানুষের প্রকৃত জীবন। অজ্ঞান মৃত্যুতুল্য, জ্ঞানই জীবন। জীবন যদি অন্ধকারে কাটাইতে হয়-অজ্ঞান ও দুঃখের মধ্য দিয়া চলাই যদি জীবন হয়, তবে জীবনের কোন মূল্যই নাই। ইহার পর অবশ্য শারীরিক অভাব পূরণে সাহায্য করার স্থান। অতএব অপরকে স্যহায্য করার বিষয় বিচার করিবার সময় আমরা যেন এই ভ্রমে পতিত না হই যে, শারীরিক সাহায্যই একমাত্র সাহায্য। শারীরিক সাহায্যের স্থান শুধু সর্বশেষে নয়-সর্বনিম্নও, কারণ ইহা স্থায়ী তৃপ্তি দিতে পারে না। ক্ষুধার্ত হইলে যে কষ্ট পাই, খাইলেই তাহা চলিয়া যায়; কিন্তু ক্ষুধা আবার ফিরিয়া আসে। দুঃখ তখনই নিবৃত্ত হইবে, যখন আমার সর্ববিধ অভাব দূর হইবে। তখন ক্ষুধা আমাকে কষ্ট দিতে পারিবে না, কোনরূপ দুঃখ বা যন্ত্রণা আমাকে বিচলিত করিতে পারিবে না। অতএব যাহা আমাদিগকে আধ্যাত্মিক-বলসম্পন্ন করে, তাহাই সর্বশ্রেষ্ঠ উপকার; তার পর মানসিক উপকার, তার পর শারীরিক।”

- স্বামী বিবেকানন্দ

(১ম খণ্ড)
=====================================

26>“যতই শক্তিপ্রয়োগ, যতই শাসনপ্রণালীর পরিবর্তন, যতই আইনের কড়াকড়ি কর না কেন-কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করিতে পারিবে না। একমাত্র অধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষাই অসৎ প্রবৃত্তি পরিবর্তিত করিয়া জাতিকে সৎপথে চালিত করিতে পারে।”
- স্বামী বিবেকানন্দ ।
=======================================

27>হে আমেরিকাবাসী ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ, আজ আপনারা আমাদিগকে যে আন্তরিক ও সাদর অভ্যর্থনা করিয়াছেন, তাহার উত্তর দিবার জন্য উঠিতে গিয়া আমর হৃদয় অনিবর্চনীয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে। পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসি-সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি। সর্বধর্মের যিনি প্রসূতি-স্বরূপ, তাঁহার নামে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্গত কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর হইয়া আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিতেছি।

এই সভামঞ্চে সেই কয়েকজন বক্তাকেও আমি ধন্যবাদ জানাই, যাঁহারা প্রাচ্যদেশীয় প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিলেন যে, অতি দূরদেশবাসী জাতিসমূহের মধ্য হইতে যাঁহারা এখানে সমাগত হইয়াছেন, তাঁহারাও বিভিন্ন দেশে পরধর্মসহিষ্ণুতার ভাব প্রচারের গৌরব দাবি করিতে পারেন। যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করিনা, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভষায় ইংরেজী ‘এক্সক্লুশন’ (ভবার্থঃ বহিষ্হকরণ, পরিবর্জন) শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, অমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া গর্ব অনুভব করি। যে জাতি পৃথিবীর সকল ধর্মের ও সকল জাতির নিপীড়িত ও আশ্রয়প্রার্থী জনগণকে চিরকাল আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি সেই জাতির অর্ন্তভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি আপনাদের এ-কথা বলিতে গর্ব অনুভব করিতেছি যে, আমরাই ইহুদীদের খাঁটি বংশধরগণের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাখিয়াছি; যে বৎসর রোমানদের ভয়ংঙ্কর উৎপীড়নে তাহদের পবিত্র মন্দির বিধ্বস্ত হয়, সেই বৎসরই তাহারা দক্ষিণভারতে আমাদের মধ্যে আশ্রয়লাভের জন্য আসিয়াছিল। জরথুষ্ট্রের অনুগামী মহান্ পারসীক জাতির অবশিষ্টাংশকে যে ধর্মাবলম্বিগণ আশ্রয় দান করিয়াছিল এবং আজ পর্যন্ত যাহারা তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করিতেছে, আমি তাঁহাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কোটি কোটি নরনারী যে-স্তোত্রটি প্রতিদিন পাঠ করেন, যে স্তবটি আমি শৈশব হইতে আবৃত্তি করিয়া আসিতেছি, তাহারই কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করিয়া আমি আপনাদের নিকট বলিতেছিঃ ‘রুচীনাং বৈচিত্র্যাদৃজুকুটিলনানাপথজুষাং। নৃণামেকো গম্যস্ত্বমসি পয়সামর্ণব ইব।।

–বিভিন্ন নদীর উৎস বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু তাহারা সকলে যেমন এক সমুদ্রে তাহাদের জলরাশি ঢালিয়া মিলাইয়া দেয়, তেমনি হে ভগবান্, নিজ নিজ রুচির বৈচিত্র্যবশতঃ সরল ও কুটিল নানা পথে যাহারা চলিয়াছে, তুমিই তাহাদের সকলের একমাত্র লক্ষ্য।

পৃথিবীতে এযাবৎ অনুষ্ঠিত সন্মেলনগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাসন্মেলন এই ধর্ম-মহাসভা গীতা-প্রচারিত সেই অপূর্ব মতেরেই সত্যতা প্রতিপন্ন করিতেছি, সেই বাণীই ঘোষণা করিতেছিঃ ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।'–যে যে-ভাব আশ্রয় করিয়া আসুক না কেন, আমি তাহাকে সেই ভাবেই অনুগ্রহ করিয়া থাকি। হে অর্জুন মনুষ্যগণ সর্বতোভাবে আমার পথেই চলিয়া থাকে।

সাম্পদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বারবার ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে। এই-সকল ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানবসমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত। তবে ইহাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত; এবং আমি সর্বতোভাবে আশা করি, এই ধর্ম-মহাসমিতির সন্মানার্থ আজ যে ঘন্টাধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে, তাহাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লিখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।

- স্বামী বিবেকানন্দ

অভ্যর্থনার উত্তর

(১৮৯৩ সালের, ১১ই সেপ্টেম্বর চিকাগো ধর্ম-মহাসভায়)

===========================================

Some Q of VIVEKANANDA

Hope you like it.

As I, A. N. Roy Choudhuri collected and like best.

Some inspritional thought of SWAMI VIVEKANANDA.


1 .Who is Loving you, Don’t Hate them .

Who is Believing you, Don’t Cheat them.

. ...... Swami-Vivekananda.

2. Anything that makes you weak physically, intellectually and spiritually, reject as poison. Swami Vivekananda Motivational quote.

......... Swami-Vivekananda.

3. Talk to yourself at least once in a Day.. Otherwise you may miss a meeting with an EXCELLENT person in this World…

........ Swami-Vivekananda.

4. Relationships are more important than life , but it is important for those relationships to have life in them…. ~

....... Swami-Vivekananda.

5. You have to grow from the inside out. None can teach you, none can make you spiritual. There is no other teacher but your own soul.

....... Swami-Vivekananda.

6. Like me or Hate me,

both are in my favor,

If you like me I am in your Heart,

If you hate me I am in your mind. –

....... Swami-Vivekananda.

7. By the study of different religions we find that in essence they are one. –

....... Swami-Vivekananda.

8. Where can we go to find God if we cannot see Him in our own hearts and in every living being.~

....... Swami-Vivekananda.

9..Fill the brain with high thoughts, highest ideals place them day and night before you and out of that will come great work.

....... Swami-Vivekananda.

10. Where can we go to find God if we cannot see Him in our own hearts and in every living being.~

....... Swami-Vivekananda.

11. We are what our thoughts have made us; so take care about what you think. Words are secondary. Thoughts live; they travel far.

....... Swami-Vivekananda.

12. You cannot believe in God until you believe in yourself.

....... Swami-Vivekananda.

13. Arise! Awake! and stop not until the goal is reached.

....... Swami-Vivekananda.


14. The world is the great gymnasium where we come to make ourselves strong.

....... Swami-Vivekananda.

15. All the powers in the universe are already ours. It is we who have put our hands before our eyes and cry that it is dark.

....... Swami-Vivekananda.

16. When an idea exclusively occupies the mind, it is transformed into an actual physical or mental state.

....... Swami-Vivekananda.

||-----ANRC----------09/12/2017:::-------||

==========================

===========================


===============================
স্বামী বিবেকানন্দ=====

1> স্বামী বিবেকানন্দ

In the year 2016 Swami Vivekananda's 153rd birth anniversary:
some inspiring quotes we need in our lives today

The chief disciple of Ramakrishna Paramahamsa . On his 153rd birth anniversary2016, we bring you 6 of Swami Vivekananda's
most inspiring quotes that stand true even today.

Young prēraṇāśrōta viśvavijētā dhermguru and Hindu
Culture in the entire world paracama who raise
The great philosopher and youth model swami
Vivekananda ji jayanti on the birth of his again
Remember quality and quality vandana





युवाओं के प्रेरणाश्रोत विश्वविजेता धर्मगुरु व हिन्दू // संस्कृति का परचम सम्पूर्ण विश्व मे फहराने वाले
महान दार्शनिक व युवाओं के आदर्श स्वामी // विवेकानन्द जी की जन्म जयन्ती पर उनका पुनः
स्मरण एवम् कोटि कोटि वन्दन
====================================================

2> "Arise! Awake! And stop not until the goal is reached."

Swami Vivekananda played an important role in the spiritual enlightenment of the Indian masses. He is also responsible for spreading Vedanta philosophy in the West and establishing the Ramakrishna Mission for service of the poor.

Born and raised in Kolkata, he was originally called Narendra Nath Datta, and acquired the name, Swami Vivekananda, when he became a monk. Born in an affluent family, Swamiji was always intrigued by spirituality and philosophy.


When he reached the threshold of youth, Swamiji passed through a period of spiritual crisis when he was troubled by doubts about the existence of God.


At this time, he met his then guru and mentor Sri Ramakrishna, and straightaway asked him a question that no one had been able to answer for him till then: "Sir, have you seen God?" Without a moment's hesitation, Sri Ramakrishna replied, "Yes, I have. I see Him as clearly as I see you, only in a much intense sense."


After removing several doubts from Swamiji's mind, Sri Ramakrishna won him over and thus began their guru-disciple relationship. After his guru's death, Vivekananda became the chief disciple of Ramakrishna Paramahamsa and became the founder of Ramakrishna Math and Ramakrishna Mission.


Not only this, Swamiji dedicated his life to the country and longed for the progress of the poor, the helpless and the underprivileged. He was the first religious leader in India to understand and openly declare that the real cause of India's downfall was the neglect of the masses.

He showed a beacon of light to a nation that had lost faith in its ability under the British rule and instilled self-confidence among Indians, who he believed were are second to none.

Here are 5 of Swami Vivekananda's most inspiring quotes, that stand true even today.

1> "Who is helping you, don't forget them. Who is loving you, don't hate them. Who is believing you, don't cheat them."

2> "Anything that makes you weak physically, intellectually and spiritually, reject as poison."

3>"Relationships are more important than life, but it is important for those relationships to have life in them."

4>"Like me or hate me, both are in my favor. If you like me I am in your heart, if you hate me I am in your mind."

5>"Fill the brain with high thoughts, highest ideals, place them day and night before you, and out of that will come great work."


==============================================
3> স্বামী বিবেকানন্দ নাম ছিল বীরেশ্বর অর্থাত = বীরশ্রেষ্ঠ

আর = নরেন্দ্র =অর্থাত =নর শ্রেষ্ঠ।
================================================
4> ALL POWER IS WITHIN YOU,

YOU CAN DO ANYTHING AND EVERYTHING,
Swami Vivekananda.
=====================================================

5> স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ত্যাগের ২বত্সর পূর্বে

স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ত্যাগের ২বত্সর পূর্বে আমেরিকাতে "ধর্ম সাধনা " নামে একটি অপূর্ব ব্রক্তিতা তে
বলেছিলেন তুমি দুই সহস্র আরোগ্য নিকেতন নির্মান করিয়া থাকিবে ।
কিন্তু তাহাতেকি আসে যায় যদি না তুমি আত্মানুভূতি লাভ করিয়া থাক,মরিবে সামান্য কুকুরের মতো
কুকুরের অনুভুতি লয়ে। কুকুর মৃত্যুকালে চিত্কার করে আর কাঁদে , কারণ সে জানে যে সে জড়বস্তু এবং
সে নিঃশেষ হয়ে যাইতেছে।
সন্তুষ্টি তোমার অন্তর ব্যাতীত অন্য কোথাও নেই। সেখানে অপরিবর্তীত,
অসীম আনন্দ রহিয়াছে। ধ্যানই সেখানে যাইবার দুয়ার। প্রার্থনা ,ক্রিয়াকান্ড, এবং অন্যান্য নানা প্রকার
উপাসনা ধ্যানের প্রাথমিক শিক্ষা মাত্র।ধ্যানের শক্তিতে আমরা আমাদের নিজ শরীর হতে বিছ্ন্নি হই।
তখন আত্মা আপনার সেই জন্মহীন মৃত্যুহীন স্বরুপকে জানতে পারে। তখন আর কোনো দুঃখ্য থাকেনা,
এই পৃথিবীতে আর জন্ম হয়না,ক্রমবিকাশ ও হয়না।
আত্মা তখন জানে যে সে সর্বদা পূর্ণ ও মুক্ত।
=================================================
6>Swami Vivekananda said:-Three things
are necessary to make every man good every nation great:-
1>Conviction of the Powers of goodness.
2>Absence of jealousy and suspicion.
3>Helping all who are trying to be and do good.
===================================================
7> स्वयं में बहुत सी कमियों के // वावजुद यदि मैं //स्वयं से प्रेम कर सकता हूं
तो फिर दूसरों में थोड़ी बहुत कमियों की // वजह से उनसे घ्रृणा कैसे कर सकता हूं। .

उदासीयों की वजह तो बहुत हैं जिंदगी में
पर बे-वजह खुश रहने का मजा ही कुछ और हैं।
=============================================
8>স্বামী বিবেকানন্দ:

স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি, ১৮৬৩ - ৪ জুলাই, ১৯০২) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল, "আমেরিকার ভাই ও বোনেরা ...," ১৮৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা, যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।
স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার এক উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তিনি আকর্ষিত হতেন। তার গুরু রামকৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ; তাই মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ ভালোভাবে ঘুরে দেখেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ১৮৯৩ সালের বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে তিনি হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ক্লাস নিয়েছিলেন।
তিনি নিম্নলিখিতভাবে বেদান্তের শিক্ষাসমূহের সারসংক্ষেপ করেন,
• প্রত্যেক আত্মাই সম্ভাব্যরুপে ঐশ্বরিক/দেবসুলভ।
• লক্ষ্য হচ্ছে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা এ দেবত্বকে সুষ্পষ্টভাবে দেখানো।
• কর্ম, বা পূজা, বা মন নিয়ন্ত্রণ, বা দর্শন - একটির দ্বারা, বা অধিকের দ্বারা, বা এ সকলগুলির দ্বারা এটি কর - এবং মুক্ত হ্‌ও।
• এটি হচ্ছে ধর্মের সমগ্রতা। মতবাদ, বা গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি হচ্ছে গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।
• যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যাই করা হোক না কেন তার সবই অধার্মিক।
• জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না।
• শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ।
• ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ।
• মানুষের সেবা করা হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা।
============================================
=================================

লেখাটা ফেসবুক থেকে নেওয়া
-------------------------

"বাজার থেকে হাফ ডজন ডিম কিনে নিয়ে আসলাম। ভাবছিলাম আমি যদি লন্ডনের কোন এক মুদির দোকানে গিয়ে বলতাম 'ডু ইউ কিপ ডিম? গিভ মে হাফ ডজেন ডিম প্লিজ!' দোকানদার নিশ্চয় ভুরু কুঁচকে বলত 'সরি!' অথবা 'পারডন মি!' সে তো জানেনা এগ মানে ডিম। ডিম মানে এগ!
এগ বলি বা ডিম- বস্তু কিন্তু এক। নামরকরণ আমরা যেভাবেই করিনা কেন তাতে পদার্থের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়না। পদার্থের বৈশিষ্টে এটা যোগ করা যেতে পারে। তবে এসব পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে কথা নয়। মনোবিজ্ঞানের ভাবনা। স্পষ্ট করে ফিলোসফি বলি।
একটা ভাষা বোধহীন শিশু হয়ত জানেনা ডিমকে ডিম বলা হয়। কিন্তু তাই বলে ঐ সফেদ ডিম্বাকৃতির পদার্থটার বিলোপ হয়না। সে ডিম সম্পর্কে কিছু জানুক বা নাই জানুক এতে ডিমের কিছু যায় আসেনা। কোন একটা বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা প্রমাণ করেনা যে ঐ বস্তু বা বিষয়ের অস্তিত্ব নেই। এভাবেই আমরা বলি ঈশ্বর আছেন! এভাবেই আমরা ভাবি- ডিম অথবা এগ যাই বলিনা কেন জিনিস এক! আল্লাহ বা ভগবান যাই বলিনা কেন বস্তু এক! আমরা দেখতে পাচ্ছিনা, বুঝতে পারছিনা বা আমরা জানিনা বলেই ঈশ্বর নেই তেমন তো নয়!

ডিমের তুলনায় ঈশ্বর অনেক বৃহৎ! এতটা বৃহৎ যে ঈশ্বর হাঁস মুরগীর কল্পনার বাইরে! তাই সমাধানে আসা সহজ হবেনা। ডিম পদার্থ আর ঈশ্বর অপদার্থ! বস্তুবাদী আলোচনার বিষয় নয় ঈশ্বর; ভাববাদের কেন্দ্র বলা যায়! তাই ঘটনাকে আরেকটু ঘোলা করা দরকার! ডিম কেনার সময় একটা বিষয় ভাবছিলাম। এই ডিমটা আছে বলেই কি আমি সত্য না কি আমি আছি বলেই ডিমটা সত্য? পরিষ্কার করে বললে, জগতের প্রেক্ষিতে আমি না কি আমার প্রেক্ষিতে জগত? জগতটা আছে বলেই কি আমি আমাকে তার চেয়ে স্বতন্ত্র বলে চিহ্নিত করি, না কি আমি আছি বলেই জগতটাকে আমি আমার চেয়ে আলাদা করে দেখতে পাই? আমি আর জগতকি একে অপরের নির্দেশক? জগতও সত্য, আমিও সত্য। কিন্তু এই সত্যটাকে উপলব্ধি করি আমি। জগত তো জড় মাত্র! আমাদের উপলব্ধির তারতম্যের অপর মোটামুটি সবকিছুই নির্ভর করে। সভ্যতার বিকাশ ও বিনাশ- সবকিছু! ডিমকে খাদ্য হিসেবে উপলব্ধি করেছি আমি। আমার কৃষ্ণভক্ত বন্ধুর কাছে এটা বিষভক্ষণ ও নরকের রাস্তা। উপলব্ধি দুরকম হল- তাই ডিমের প্রয়োগও দুরকম হল। সে বাঙালির ছেলে। ছেলেবেলা থেকে মাছ ডিম না খেয়ে প্রোটিনের ঘাটিতে ভুগছে! আর আমি বেশি খেয়ে কোলেস্টেরলের ঠেলায় আছি!

কথা হল উপলব্ধির তারতম্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনস্তিত্বেও ঘটছে আমাদের। কারো কাছে ঈশ্বরের হাত পা নাক কান সব আছে। কারো কাছে আবার ঈশ্বর আছেন। খোদার আরস আছে। তিনি সেখানে বসবেন হাসরের দিনে। অথচ তার নাকি কোন অবয়ব নেই! একই সত্ত্বা নিয়ে নিয়ে যখন এত রকমের উপলব্ধি তখন ভাবতে হয়- সত্যি টা কি? অথবা আদোও এমন কিছু আছে কিনা? ডিমের আলোচনায় বলেছিলাম ডিমের মতন ঈশ্বরও সত্য এমন দাবী করা যায়। তবে ডিমের গঠন সবার কাছে এক হলেও ঈশ্বরের গঠন অভিন্ন নয়! এটার জন্যই চিন্তা হচ্ছে!
তারপরের কথা হচ্ছে সেই অস্তিত্ববাদের। ঈশ্বরের প্রেক্ষিতে আমি না কি আমার প্রেক্ষিতে আমি? জগত ও আমার প্রেক্ষিতে বলেছিলাম আমরা একে অপরের নির্দেশক। বিষয়টা জটিল বটে। জগত জড় বলে একে আপেক্ষিক বা আমার স্বাপেক্ষিক বলা যায়। জগত বা আমি কোনটাই ভাববাদের বিষয় নই। আমাদের ওজন আছে, ভর আছে, স্পষ্ট গতি প্রকৃতি আছে। আমরা একে অপরের কাছে নির্দেশ্য! তাই বুঝি- জগত আছে বলে আমি টের পাই আমি আছি। আর আমি (সাবজেক্ট) না থাকলে এই প্রশ্ন কে ওঠাত 'জগত আছে কি নেই?' কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব খাটেনা। কারণ ঈশ্বর অনির্দেশ্য। ঈশ্বর ও আমি একে অপরের পরিণাম নই, নির্দেশক নই। আমি ভাবছি বলেই ঈশ্বর অস্তিত্বময় হচ্ছে! আপাতত বিষয়টা এরকম!

কিন্তু এই 'আমি' শব্দটা আমাদের সামনে একটা বিরাট প্রশ্ন নিয়ে আসে সেটা হল- 'কে আমি?' এর উত্তর পেতে গিয়ে আমাদের অনেক হিমশিম খেতে হয়। দেহ আমাদের আমিত্বের ধ্রুবক নয়, মন নয়, ইন্টেলিজেন্স নয়। কারণ এগুলো প্রতিনিয়ত বিবর্তনের আবহে আছে। আমাদের ব্রেইন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে এটা বিজ্ঞানের দাবী। কিন্তু ব্রেইনে ত্রুটি হলে ওষুধ পত্রের বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে। Absolute reality বলতে যা বোঝানো হয় ব্রেইন ঠিক সেটা নয়। শুদ্ধতম গাঁজায় জোরে দুটান দিলে ব্রেইনের (নিউরনের) অবস্থা টলমাটাল হয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আসে মৃত্যুকে নিয়ে? মরার পরেও ব্রেইন তাজা থাকে। তাহলে মরে কে? হিন্দু দর্শন বলছে দেহ মরে আত্মা থাকে! আমি হিন্দু দর্শনকে এজন্য প্রাইওরিটি দিচ্ছি কারণ আর কোন ধর্মদর্শন এই বিষয় নিয়ে এত গভীর আলোচনা করেনা! বৌদ্ধদর্শন এই আত্মাকে অস্বীকার করে গেছে, কিন্তু মানসিক সংস্কারের প্রবাহকে (জন্মান্তরীন কর্মফলপ্রসূত) পূণর্জন্মের নিয়ামক হিসেবে দাবী করছে যা প্রশ্নবিদ্ধ! এখন আত্মা আছে কি নেই তা বলতে পারছিনা, তবে মৃত্যুর সময় এমন একটা কিছু ঘটে, বা আমরা এমন একটা কিছু হারিয়ে ফেলি যাতে আমাদের আর আমি বোধ থাকেনা। অর্থাৎ আমিও বেঁচে নেই। বলতে পারেন- গভীর ঘুম অথবা অজ্ঞান হলেও এরকম হয়। কিন্তু মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নেই বলে এদুটোর সাথে আমি কোন তুলনায় যেতে পারছিনা এই মূহুর্তে। ঘুম ভাঙে, মৃত্যুর ঘুম আর ভাঙেনা। আমার আরো একটা সংশয় আছে ঘুমানোর সময় স্বপ্ন দেখে কে?
যাই হোক আমি এটাই বোঝাচ্ছিলাম প্রকৃত 'আমি' কি বস্তু সেটা সেটা আমাদের কাছেই এখনো অধরা। তাই আমিত্বের বিচার দিয়ে যখনই আমরা কোনকিছুর মূল্যায়ণ করি তখন আমার কাছে দুটো ধারণা প্রথমেই মাথায় আসে-
১। অভিজ্ঞতাবাদ। আমরা যা কিছু ভাবি সব আমাদের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই ভাবি। এটা দর্শনের ভাবনা।
২। আমাদের মস্তিষ্কের স্বতন্ত্র কার্যপ্রণালী ও আমাদের ডিএনএ- এর স্বতন্ত্র গঠন। আমরা একে অপরের থেকে ভিন্ন আদলে তৈরি। তাই আমাদের ভাবনাগুলো কখনো কখনো অপরের সাথে সাদৃশ্যতা পেয়ে গেলেও আমরা সম্পূর্ণ রূপে এক নই।
আমাদের ঈশ্বর ভাবনার সাথেও ওপরের দুটো ধারণাকে প্রাসঙ্গিক ফ্যাক্টর বলে রাখতেই হবে। আমরা যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই এখনো দ্বিধান্বিত সেখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নিঃসন্দিহান হওয়া আমার কাছে অযৌক্তিক লাগে। আমরা অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধান্বিত মানে কি আমরা কোনকিছু নিয়ে ভাবতে পারব না? তা কেন হবে? তবে perfect আর absolute এর মধ্যে ব্যাবধানটা কি সেটা জানা দরকার! (ক্রমশ......)"
==============================================
"ধর্ম-প্রচুর অন্ন ও পানে নাই, অথবা সুরম্য হর্ম্যেও নাই। বারংবার ধর্মের বিরুদ্ধে আপনারা এই আপত্তি শনিতে পাইবেনঃ ধর্মের দ্বারা কি উপকার হইতে পারে? উহা কি দরিদ্রের দারিদ্র দূর করিতে পারে? মনে করূন, উহা যেন পারে না, তাহা হইলেই কি ধর্ম অসত্য বলিয়া প্রমাণিত হইল? মনে করূন আপনি একটি জ্যোতিষের সিদ্ধান্ত প্রমান করিতে চেষ্টা করিতেছেন-একটি শিশু দাঁড়াইয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘ইহাতে কি মনোমত খাবার পাওয়া যায়?’ আপনি উত্তর দিলেন-‘না, পাওয়া যায় না।’ তখন শিশুটি বলিয়া উঠিল, ‘তবে ইহা কোন কাজের নয়।’ শিশুরা তাহাদের নিজেদের দৃষ্টি হইতে অর্থাৎ কোন‍ জিনিসে কত ভাল খাবার পাওয়া যায়, এই হিসাবে সমগ্র জগতের বিচার করিয়া থাকে। যাহারা অজ্ঞানাচ্ছন্ন বলিয়া শিশুসদৃশ, সংসারের সেই শিশুদের বিচারও ঐরূপ। নিম্নভূমির দৃষ্টি হইতে উচ্চতর বস্তুর বিচার করা কখনই কর্তব্য নয়। প্রত্যেক বিষয়ই তাহার নিজস্ব মনের দ্বারা বিচার করিতে হইবে। অনন্তের দ্বারা অনন্তকে বিচার করিতে হইবে। ধর্ম সমগ্র মানবজীবনে অনুস্যূত, শুধু বর্তমানে নয়-ভূত, ভবিষ্যত, বর্তমান সর্বকালে। অতএব ইহা অনন্ত আত্মা ও অনন্ত ঈশ্বরের মধ্যে অনন্ত সম্বন্ধ। অতএব ক্ষনিক মানবজীবনের উপর উহার কার্য দেখিয়া উহার মূল্য বিচার করা কি ন্যায়সঙ্গত?"


- স্বামী বিবেকানন্দ

====================================================বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও ভারত সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ প্রভাবকে এড়িয়ে থাকতে পারেননি। স্বামীজি কে উদ্দেশ্য করে একটি অসাধারণ বিবেকানন্দ স্তুতি রচনা করেন।
রাগ: আড়ানা ও তাল: তেওড়া তে রচিত 'জয় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী বীর চির গৈরিকধারী' গানটি নিচে দেয়া হল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

"জয় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী বীর
চির গৈরিকধারী।
জয় তরুণ যোগী শ্রীরামকৃষ্ণ
ব্রত সহায়কারী॥


যজ্ঞাহূতির হোমশিখা সম
তুমি তেজস্বী তাপস পরম।
ভারত অরিন্দম নমো নমো
বিশ্ব মঠ বিহারী॥

মদগর্বিত বলদর্পীর দেশে
মহাভারতের বাণী
শুনায়ে বিজয়ী ঘুচাইলে
স্বদেশের অপযশ গ্লানি।

নবভারতে আনিলে তুমি নববেদ
মুছে দিলে জাতি-ধর্মের ভেদ।
জীবে-ঈশ্বরে অভেদ আত্মা
জানাইলে উচ্চারি॥"
----------------------------------


"স্বামী বিবেকানন্দের বানী ও রচনা" পেজ থেকে নেয়া।
=====================================


"আপনাদের ভালবাসায় আজ আমাদের পেজের অর্ধলক্ষ ‘লাইক’ পূর্ণ হল। আমাদের সকল বন্ধুদের জানাই শুভেচ্ছা। ‘স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা’ আজ কেবল মাত্র স্বামীজির নামাঙ্কিত প্রথম বাংলা পেজই নয়- সর্ববৃহৎও। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বামীজির বাণীকে কোনরকম নিজস্ব ব্যাখা প্রদান না করেই মৌলিক ভাবে প্রত্যেকের টাইমলাইনে পৌঁছে দেয়া। এই কাজে আমরা কতটা সাফল্য পেয়েছি সেটার বিচার আপনাদের হাতে।
স্বামী বিবেকানন্দ ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় নবজাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অবিসংবাদিত এক চরিত্র। স্বামীজি ভারতবর্ষের কল্যানকেই নিজের কল্যান বলে জানতেন। এই বিপুল বিভবসম্পন্ন সন্ন্যাসী ধর্মকে তার সঙ্কীর্ণ প্রথাগত বলয় থেকে বের করে এনে তাকে মানবাত্মার প্রকৃত জাগরণের মাধ্যম হিসেবে ফোটাতে চেয়েছিলেন। তিনি মানুষ ছিলেন অবশ্যই। আর নির্দ্বিধায় বলতে হয়- তিনি একজন খাঁটি হিন্দু ছিলেন। আসুন একটু দেখি আজকের দিনে মানুষের বিবেকানন্দ ভাবনা কেমন?
১। তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ছিলেন।
২। তিনি কেবল মানবতাবাদী ছিলেন।
৩। তিনি একজন মহামানব ছিলেন (ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে অবতারতুল্য)
৪। তিনি একজন স্ববিরোধী ব্যাক্তিত্ব ছিলেন।
আমরা বিবেকানন্দকে এভাবে খন্ড খন্ড করে ভাবিনি। আমরা তাঁর সমগ্র চরিত্র অধ্যয়ণ করে বুঝেছি তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানব। তাঁর অনন্ত মানবপ্রেমের সাথে হিন্দুত্বের কখনো সংঘাত আসেনি। তাঁর হিন্দুত্বের সাথে অন্যধর্মকে গ্রহন করার মত বিরাট উদারতা সংযুক্ত হয়েও তাঁর হিন্দুত্বে কখনো কোন ছিদ্র দেখা যায়নি। তিনি ভারতপ্রেমিক ছিলেন সর্বাগ্রে। দীনদুখীর সেবাকেই বিরাটের উপাসনা বলে প্রচার করে গেছেন। বিবেকানন্দ চরিত্রের বহুমাত্রিকতা নানান জনের কাছে নানান ভাবে ধরা দেয়। এটা তাঁকে অসম্পূর্ণ ভাবে জানার ফল বলেই মনে করি। গোঁড়া আস্তিকের উপাস্যও বিবেকানন্দ কোনদিন হয়ে উঠতে পারেন না, ঠিক যেমন তিনি পারেননা গোঁড়া নাস্তিকের কাছে। স্বামীজির চরিত্রের মানবিক দিকগুলো নিয়েই ভাবা উচিৎ। তাঁকে দেবমানব বানাতে গিয়ে তাঁর আদর্শের জলাঞ্জলি হোক এটা তাঁর কাম্য ছিলনা। বিবেকানন্দ মানুষ ছিলেন, বিবেকানন্দ হিন্দুসন্ন্যাসী ছিলেন। যারা বিবেকানন্দের হিন্দুত্বের সঙ্গে মানবতাবাদের তফাৎ দেখাতে চান তাদের জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে আমরা সবসময় সংশয় প্রকাশ করে এসেছি।যারা বিবেকানন্দকে কেবল কট্টর হিন্দু হিসেবেই দেখে এসেছেন আমরা তাদের মনোবৃত্তি নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেছি। কারণ এরা খন্ড-বিবেকানন্দকে ধরেছেন। আমাদের এই পেজ থেকে আমরা একজন পূর্ণাঙ্গ বিবেকানন্দের অবতারণা করতে চেয়েছি তাঁর বাণীর আলোকে। একজন মানুষ বিবেকানন্দকে দেখাতে চেয়েছি সর্বোপরি। আশা করি আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আপনাদের ভাল লেগেছে।
[দৈনন্দিন ব্যাস্ততার ভেতরেও নিরলস ভাবে আমাদের অ্যাডমিনরা তাদের দায়িত্ব থেকে ক্ষান্ত হননি। একটা পোস্ট তৈরী করতে আমাদের কিছুটা সময় তো দিতেই হয়। তারপরও আশানুরূপ সাড়া আমরা অনেকক্ষেত্রে পাইনা। এর কারণ অনেকেই আমাদের পোস্ট আর দেখতে পাচ্ছেন না। ফেসবুকের নিয়মানুযায়ী আপনি যদি প্রতিদিন আমাদের যে কোন একটা পোস্টে লাইক না দেন তবে ধীরে ধীরে এই পেজটা আপনার টাইমলাইন থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। সুতরাং এ ব্যাপারে আপনারা সজাগ থাকবেন এই নিবেদন। শুভরাত্রি। নমস্কার।]"
====================================

সাগর-বক্ষে
---------------------
নীলাকাশে ভাসে মেঘকুল,
শ্বেত কৃষ্ণ বিবিধ বরণ—
তাহে তারতম্য তারল্যের
পীত ভানু মাঙ্গিছে বিদায়।
রাগচ্ছটা জলদ দেখায়।
বহে বায়ু আপনার মনে,
প্রভঞ্জন করিছে গঠন—
ক্ষণে গড়ে, ভাঙ্গে আর ক্ষণে—
কতমত সত্য অসম্ভব—
জড়, জীব, বর্ণ, রূপ, ভাব ।
ঐ আসে তূলারাশি সম,
পরক্ষণে হের মহানাগ,
দেখ সিংহ বিকাশে বিক্রম,
আর দেখ প্রণয়িযুগল;
শেষে সব আকাশে মিলায়।
নীচে সিন্ধু গায় নানা তান;
মহীয়ান্ সে নহে, ভারত !
অম্বুরাশি বিখ্যাত তোমার ;
রূপরাগ হ'য়ে জলময়
গায় হেথা, না করে গর্জন ।

- স্বামী বিবেকানন্দ
========================================

গাই গীত শুনাতে তোমায়
---------------------------
গাই গীত শুনাতে তোমায়,
ভাল মন্দ নাহি গণি,
নাহি গণি লোকনিন্দা যশকথা।
দাস তোমা দোঁহাকার,
সশক্তিক নমি তব পদে।
আছ তুমি পিছে দাঁড়াইয়ে,
তাই ফিরে দেখি তব হাসিমুখ।
ফিরে ফিরে গাই, কারে না ডরাই,
জন্মমৃত্যু মোর পদতলে।
দাস তব জনমে দয়ানিধে !
তব গতি নাহি জানি,
মম গতি-তাহাও না জানি ।
কেবা চায় জানিবারে ?
ভুক্তি মুক্তি ভক্তি আদি যত,
জপ-তপ সাধন-ভজন,
আজ্ঞা তব, দিয়েছি তাড়ায়ে,
আছে মাত্র জানাজানি-আশ,
তাও প্রভু কর পার ।
চক্ষু দেখে অখিল জগৎ,
না চাহে দেখিতে আপনায়,
কেন বা দেখিবে ?
দেখে নিজরূপ দেখিলে পরের মুখ ।
তুমি আঁখি মম, তব রূপ সর্ব ঘটে ।
ছেলেখেলা করি তব সনে,
কভু ক্রোধ করি তোমা'পরে,
যেতে চাই দূরে পলাইয়ে;
শিয়রে দাঁড়ায়ে তুমি রেতে,
নির্বাক আনন, ছল ছল আঁখি
চাহ মম মুখপানে।
অমনি যে ফিরি, তব পায়ে ধরি,
কিন্তু ক্ষমা নাহি মাগি।
তুমি নাহি কর রোষ।
পুত্র তব, অন্য কে সহিবে প্রগল্ভটতা ?
প্রভু তুমি, প্রাণসখা তুমি মোর ।
কভু দেখি আমি তুমি, তুমি আমি ।
বাণী তুমি, বীণাপাণি কণ্ঠে মোর,
তরঙ্গে তোমার ভেসে যায় নরনারী ।
সিন্ধুরোলে তব হুহুঙ্কার,
চন্দ্রসূর্যে তোমারি বচন,
মৃদুমন্দ পবন-আলাপ,
এ সকল সত্য কথা।
কিন্তু মানি-অতি স্থূল ভাব,
তত্ত্বজ্ঞের এ নহে বারতা।
সূর্যচন্দ্র চলগ্রহতারা,
কোটি কোটি মণ্ডলীনিবাস
ধূমকেতু বিজলি আভাস,
সুবিস্তৃত অনন্ত আকাশ-মন দেখে।
কাম ক্রোধ লোভ মোহ আদি
ভঙ্গ যথা তরঙ্গ-লীলার
বিদ্যা-অবিদ্যার ঘর,
জন্ম জরা জীবন মরণ,
সুখ-দুঃখ-দ্বন্দ্বভরা,
কেন্দ্র যার 'অহমহমিতি',
ভূজদ্বয়-বাহির অন্তর,
আসমুদ্র আসূর্যচন্দ্রমা,
আতারক অনন্ত আকাশ,
মন বুদ্ধি চিত্ত অহঙ্কার,
দেব যক্ষ মানব দানব,
পশু পাক্ষী কৃমি কীটগণ,
অণুক দ্বাণুক জড়জীব—
সেই সমক্ষেত্রে অবস্থিত ।
স্থূল অতি এ বাহ্য বিকাশ,
কেশ যথা শিরঃপরে ।
মেরুতটে হিমানীপর্বত,
যোজন যোজন সে বিস্তার;
অভ্রভেদী নিরভ্র আকাশে
শত উঠে চূড়া তার ।
ঝকমকি জ্বলে হিমশিলা
শত শত বিজলি-প্রকাশ !
উত্তর অয়নে বিবস্বান্,
একীভূত সহস্রকিরণ,
কোটি বজ্রসম করধারা
ঢালে যবে তাহার উপর,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে মূর্ছিত ভাস্কর,
গলে চূড়া শিখর গহ্বর,
বিকট নিনাদে খসে পড়ে গিরিবর,
স্বপ্নসম জলে জল যায় মিলে ।
সর্ব বৃত্তি মনের যখন
একীভূত তোমার কৃপায়
কোটি সূর্য অতীত প্রকাশ,
চিৎসূর্য হয় হে বিকাশ,
গলে যায় রবি শশী তারা,
আকাশ পাতাল তলাতল,
এ ব্রহ্মাণ্ড গোষ্পদ-সমান ।
বাহ্যভূমি অতীত গমন ।
শান্ত ধাতু, মন আস্ফালন নাহি করে,
শ্লথ হৃদয়ের তন্ত্রী যত,
খুলে যায় সকল বন্ধন,
মায়ামোহ হয় দূর,
বাজে তথা অনাহত ধ্বনি-তব বাণী ।।
—শুনি সসম্ভ্রমে, দাস তব প্রস্তুত সতত
সাধিতে তোমার কাজ ।—
'আমি বর্তমান ।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড গ্রাসি যবে।
প্রলয়ের কালে
জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা লয়,
অলক্ষণ অতর্ক্য জগৎ,
নাহি থাকে রবি শশী তারা,'
সে মহানির্বাণ, নাহি কর্ম করণ কারণ,
মহা অন্ধকার ফেরে অন্ধকার-বুকে,
আমি বর্তমান ।
'আমি বর্তমান ।
প্রলয়ের কালে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড গ্রাসি যবে
জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা লয়,
অলক্ষণ অতর্ক্য জগৎ,
নাহি থাকে রবি শশী তারা।

গাই গীত শুনাতে তোমায়
গাই গীত শুনাতে তোমায়,
ভাল মন্দ নাহি গণি,
নাহি গণি লোকনিন্দা যশকথা।
দাস তোমা দোঁহাকার,
সশক্তিক নমি তব পদে।
আছ তুমি পিছে দাঁড়াইয়ে,
তাই ফিরে দেখি তব হাসিমুখ।
ফিরে ফিরে গাই, কারে না ডরাই,
জন্মমৃত্যু মোর পদতলে।
দাস তব জনমে দয়ানিধে !
তব গতি নাহি জানি,
মম গতি-তাহাও না জানি ।
কেবা চায় জানিবারে ?
ভুক্তি মুক্তি ভক্তি আদি যত,
জপ-তপ সাধন-ভজন,
আজ্ঞা তব, দিয়েছি তাড়ায়ে,
আছে মাত্র জানাজানি-আশ,
তাও প্রভু কর পার ।
চক্ষু দেখে অখিল জগৎ,
না চাহে দেখিতে আপনায়,
কেন বা দেখিবে ?
দেখে নিজরূপ দেখিলে পরের মুখ ।
তুমি আঁখি মম, তব রূপ সর্ব ঘটে ।
ছেলেখেলা করি তব সনে,
কভু ক্রোধ করি তোমা'পরে,
যেতে চাই দূরে পলাইয়ে;
শিয়রে দাঁড়ায়ে তুমি রেতে,
নির্বাক আনন, ছল ছল আঁখি
চাহ মম মুখপানে।
অমনি যে ফিরি, তব পায়ে ধরি,
কিন্তু ক্ষমা নাহি মাগি।
তুমি নাহি কর রোষ।
পুত্র তব, অন্য কে সহিবে প্রগল্ভটতা ?
প্রভু তুমি, প্রাণসখা তুমি মোর ।
কভু দেখি আমি তুমি, তুমি আমি ।
বাণী তুমি, বীণাপাণি কণ্ঠে মোর,
তরঙ্গে তোমার ভেসে যায় নরনারী ।
সিন্ধুরোলে তব হুহুঙ্কার,
চন্দ্রসূর্যে তোমারি বচন,
মৃদুমন্দ পবন-আলাপ,
এ সকল সত্য কথা।
কিন্তু মানি-অতি স্থূল ভাব,
তত্ত্বজ্ঞের এ নহে বারতা।
সূর্যচন্দ্র চলগ্রহতারা,
কোটি কোটি মণ্ডলীনিবাস
ধূমকেতু বিজলি আভাস,
সুবিস্তৃত অনন্ত আকাশ-মন দেখে।
কাম ক্রোধ লোভ মোহ আদি
ভঙ্গ যথা তরঙ্গ-লীলার
বিদ্যা-অবিদ্যার ঘর,
জন্ম জরা জীবন মরণ,
সুখ-দুঃখ-দ্বন্দ্বভরা,
কেন্দ্র যার 'অহমহমিতি',
ভূজদ্বয়-বাহির অন্তর,
আসমুদ্র আসূর্যচন্দ্রমা,
আতারক অনন্ত আকাশ,
মন বুদ্ধি চিত্ত অহঙ্কার,
দেব যক্ষ মানব দানব,
পশু পাক্ষী কৃমি কীটগণ,
অণুক দ্বাণুক জড়জীব—
সেই সমক্ষেত্রে অবস্থিত ।
স্থূল অতি এ বাহ্য বিকাশ,
কেশ যথা শিরঃপরে ।
মেরুতটে হিমানীপর্বত,
যোজন যোজন সে বিস্তার;
অভ্রভেদী নিরভ্র আকাশে
শত উঠে চূড়া তার ।
ঝকমকি জ্বলে হিমশিলা
শত শত বিজলি-প্রকাশ !
উত্তর অয়নে বিবস্বান্,
একীভূত সহস্রকিরণ,
কোটি বজ্রসম করধারা
ঢালে যবে তাহার উপর,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে মূর্ছিত ভাস্কর,
গলে চূড়া শিখর গহ্বর,
বিকট নিনাদে খসে পড়ে গিরিবর,
স্বপ্নসম জলে জল যায় মিলে ।
সর্ব বৃত্তি মনের যখন
একীভূত তোমার কৃপায়
কোটি সূর্য অতীত প্রকাশ,
চিৎসূর্য হয় হে বিকাশ,
গলে যায় রবি শশী তারা,
আকাশ পাতাল তলাতল,
এ ব্রহ্মাণ্ড গোষ্পদ-সমান ।
বাহ্যভূমি অতীত গমন ।
শান্ত ধাতু, মন আস্ফালন নাহি করে,
শ্লথ হৃদয়ের তন্ত্রী যত,
খুলে যায় সকল বন্ধন,
মায়ামোহ হয় দূর,
বাজে তথা অনাহত ধ্বনি-তব বাণী ।।
—শুনি সসম্ভ্রমে, দাস তব প্রস্তুত সতত
সাধিতে তোমার কাজ ।—
'আমি বর্তমান ।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড গ্রাসি যবে।
প্রলয়ের কালে
জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা লয়,
অলক্ষণ অতর্ক্য জগৎ,
নাহি থাকে রবি শশী তারা,'
সে মহানির্বাণ, নাহি কর্ম করণ কারণ,
মহা অন্ধকার ফেরে অন্ধকার-বুকে,
আমি বর্তমান ।
'আমি বর্তমান ।
প্রলয়ের কালে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড গ্রাসি যবে
জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা লয়,
অলক্ষণ অতর্ক্য জগৎ,
নাহি থাকে রবি শশী তারা।

গাই গীত শুনাতে তোমায়
গাই গীত শুনাতে তোমায়,
ভাল মন্দ নাহি গণি,
নাহি গণি লোকনিন্দা যশকথা।
দাস তোমা দোঁহাকার,
সশক্তিক নমি তব পদে।
আছ তুমি পিছে দাঁড়াইয়ে,
তাই ফিরে দেখি তব হাসিমুখ।
ফিরে ফিরে গাই, কারে না ডরাই,
জন্মমৃত্যু মোর পদতলে।
দাস তব জনমে দয়ানিধে !
তব গতি নাহি জানি,
মম গতি-তাহাও না জানি ।
কেবা চায় জানিবারে ?
ভুক্তি মুক্তি ভক্তি আদি যত,
জপ-তপ সাধন-ভজন,
আজ্ঞা তব, দিয়েছি তাড়ায়ে,
আছে মাত্র জানাজানি-আশ,
তাও প্রভু কর পার ।
চক্ষু দেখে অখিল জগৎ,
না চাহে দেখিতে আপনায়,
কেন বা দেখিবে ?
দেখে নিজরূপ দেখিলে পরের মুখ ।
তুমি আঁখি মম, তব রূপ সর্ব ঘটে ।
ছেলেখেলা করি তব সনে,
কভু ক্রোধ করি তোমা'পরে,
যেতে চাই দূরে পলাইয়ে;
শিয়রে দাঁড়ায়ে তুমি রেতে,
নির্বাক আনন, ছল ছল আঁখি
চাহ মম মুখপানে।
অমনি যে ফিরি, তব পায়ে ধরি,
কিন্তু ক্ষমা নাহি মাগি।
তুমি নাহি কর রোষ।
পুত্র তব, অন্য কে সহিবে প্রগল্ভটতা ?
প্রভু তুমি, প্রাণসখা তুমি মোর ।
কভু দেখি আমি তুমি, তুমি আমি ।
বাণী তুমি, বীণাপাণি কণ্ঠে মোর,
তরঙ্গে তোমার ভেসে যায় নরনারী ।
সিন্ধুরোলে তব হুহুঙ্কার,
চন্দ্রসূর্যে তোমারি বচন,
মৃদুমন্দ পবন-আলাপ,
এ সকল সত্য কথা।
কিন্তু মানি-অতি স্থূল ভাব,
তত্ত্বজ্ঞের এ নহে বারতা।
সূর্যচন্দ্র চলগ্রহতারা,
কোটি কোটি মণ্ডলীনিবাস
ধূমকেতু বিজলি আভাস,
সুবিস্তৃত অনন্ত আকাশ-মন দেখে।
কাম ক্রোধ লোভ মোহ আদি
ভঙ্গ যথা তরঙ্গ-লীলার
বিদ্যা-অবিদ্যার ঘর,
জন্ম জরা জীবন মরণ,
সুখ-দুঃখ-দ্বন্দ্বভরা,
কেন্দ্র যার 'অহমহমিতি',
ভূজদ্বয়-বাহির অন্তর,
আসমুদ্র আসূর্যচন্দ্রমা,
আতারক অনন্ত আকাশ,
মন বুদ্ধি চিত্ত অহঙ্কার,
দেব যক্ষ মানব দানব,
পশু পাক্ষী কৃমি কীটগণ,
অণুক দ্বাণুক জড়জীব—
সেই সমক্ষেত্রে অবস্থিত ।
স্থূল অতি এ বাহ্য বিকাশ,
কেশ যথা শিরঃপরে ।
মেরুতটে হিমানীপর্বত,
যোজন যোজন সে বিস্তার;
অভ্রভেদী নিরভ্র আকাশে
শত উঠে চূড়া তার ।
ঝকমকি জ্বলে হিমশিলা
শত শত বিজলি-প্রকাশ !
উত্তর অয়নে বিবস্বান্,
একীভূত সহস্রকিরণ,
কোটি বজ্রসম করধারা
ঢালে যবে তাহার উপর,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে মূর্ছিত ভাস্কর,
গলে চূড়া শিখর গহ্বর,
বিকট নিনাদে খসে পড়ে গিরিবর,
স্বপ্নসম জলে জল যায় মিলে ।
সর্ব বৃত্তি মনের যখন
একীভূত তোমার কৃপায়
কোটি সূর্য অতীত প্রকাশ,
চিৎসূর্য হয় হে বিকাশ,
গলে যায় রবি শশী তারা,
আকাশ পাতাল তলাতল,
এ ব্রহ্মাণ্ড গোষ্পদ-সমান ।
বাহ্যভূমি অতীত গমন ।
শান্ত ধাতু, মন আস্ফালন নাহি করে,
শ্লথ হৃদয়ের তন্ত্রী যত,
খুলে যায় সকল বন্ধন,
মায়ামোহ হয় দূর,
বাজে তথা অনাহত ধ্বনি-তব বাণী ।।
—শুনি সসম্ভ্রমে, দাস তব প্রস্তুত সতত
সাধিতে তোমার কাজ ।—
'আমি বর্তমান ।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড গ্রাসি যবে।
প্রলয়ের কালে
জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা লয়,
অলক্ষণ অতর্ক্য জগৎ,
নাহি থাকে রবি শশী তারা,'
সে মহানির্বাণ, নাহি কর্ম করণ কারণ,
মহা অন্ধকার ফেরে অন্ধকার-বুকে,
আমি বর্তমান ।
'আমি বর্তমান ।
প্রলয়ের কালে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড গ্রাসি যবে
জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা লয়,
অলক্ষণ অতর্ক্য জগৎ,
নাহি থাকে রবি শশী তারা। (অসমাপ্ত)
- স্বামী বিবেকানন্দ
==========================================
মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বাংলার অকুতোভয় ভাষা সৈনিকদের যাদের আত্মবলিদানে আজ বাংলা পেয়েছে বিশ্বদরবারে রাজসিংহাসন।
আজকের এই পোস্ট তাই বাংলা ভাষা নিয়ে। স্বামীজি কেমন ভাবতেন?...
---------------------------------------------------------------------
------------------------------
বাঙ্গলা ভাষা
[ ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে ২০শে ফেব্রুয়ারি আমেরিকা হইতে 'উদ্বোধন' পত্রিকার সম্পাদককে স্বামীজী যে পত্র লিখেন, তাহা হইতে উদ্ধৃত। ]
---------------------------------------------------------------------------------------------
‘আমাদের দেশে প্রাচীন কাল থেকে সংস্কৃত সমস্ত বিদ্যা থাকার দরুন, বিদ্বান্ এবং সাধারণের মধ্যে একটা অপার সমুদ্র দাঁড়িয়ে গেছে। বুদ্ধ থেকে চৈতন্য রামকৃষ্ণ পর্যন্ত-যাঁরা লোকহিতায় এসেছেন, তাঁরা সকলেই সাধারণ লোকের ভাষায় সাধারণকর শিক্ষা দিয়েছেন। পাণ্ডিত্য অবশ্য উৎকৃষ্ট; কিন্তু কটমট ভাষা-যা অপ্রাকৃতিক, কল্পিত মাত্র, তাকে ছাড়া কি আর পাণ্ডিত্য হয় না? চলিত ভাষায় কি আর শিল্পনৈপুণ্য হয় না? স্বাভাবিক ভাষা ছেড়ে একটা অস্বাভাবিক ভাষা তয়ের ক’রে কি হবে? যে ভাষায় নিজের মনে দর্শন-বিজ্ঞান চিন্তা কর, দশজনে বিচার কর—সে ভাষা কি দর্শন-বিজ্ঞান লেখবার ভাষা নয়? যদি না হয় তো নিজের মনে এবং পাঁচজনে ও-সকল তত্ত্ববিচার কেমন ক'রে কর? স্বাভাবিক যে ভাষায় আমরা মনে ভাব প্রকাশ করি, যে ভাষায় ক্রোধ দুঃখ ভালবাসা ইত্যাদি জানাই, তার চেয়ে উপযুক্ত ভাষা হতেই পারে না; সেই ভাব, সেই ভঙ্গি, সেই সমস্ত ব্যবহার ক'রে যেতে হবে। ও ভাষার যেমন জোর, যেমন অল্পের মধ্যে অনেক, যেমন যে-দিকে ফেরাও সে-দিকে ফেরে, তেমন কোন তৈরী ভাষা কোন কালে হবে না। ভাষাকে করতে হবে-যেমন সাফ ইস্পাত, মুচড়ে মুচড়ে যা ইচ্ছে কর—আবার যে-কে-সেই, এক চোটে পাথর কেটে দেয়, দাঁত পড়ে না। আমাদের ভাষা—সংস্কৃতর গদাই-লস্করি চাল—ঐ এক চাল নকল ক'রে অস্বাভাবিক হ'য়ে যাচ্ছে। ভাষা হচ্ছে উন্নতির প্রধান উপায়,—লক্ষণ।
যদি বল ও কথা বেশ; তবে বাঙ্গলা দেশের স্থানে স্থানে রকমারি ভাষা, কোনটি গ্রহণ করব? প্রাকৃতিক নিয়মে করব? প্রাকৃতিক নিয়মে যেটি বলবান হচ্ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে, সেইটিই নিতে হবে। অর্থাৎ কলকেতার ভাষা। পূর্ব-পশ্চিম, যে দিক্ হতেই আসুক না, একবার কলকেতার হাওয়া খেলেই দেখছি সেই ভাষাই লোকে কয়। তখন প্রকৃতি আপনিই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কোন্ ভাষা লিখতে হবে, যত রেল এবং গতাগতির সুবিধা হবে, তত পূর্ব-পশ্চিমী ভেদ উঠে যাবে, এবং চট্টগ্রাম হইতে বৈদ্যনাথ পর্যন্ত ঐ কলকেতার ভাষাই চলবে। কোন্ জেলার ভাষা সংস্কৃতর বেশী নিকট, সে কথা হচ্ছে না—কোন্ ভাষা জিতছে সেইটি দেখ। যখন দেখতে পাচ্ছি যে, কলকেতার ভাষাই সমস্ত বাঙ্গলা দেশের ভাষা হ'য়ে যাবে, তখন যদি পুস্তকের ভাষা এবং ঘরে কথা-কওয়া ভাষা এক করতে হয় তো বুদ্ধিমান অবশ্যই কলকেতার ভাষাকে ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ করবেন। এথায় গ্রাম্য ঈর্ষাটিকেও জলে ভাসান দিতে হবে। সমস্ত দেশের যাতে কল্যাণ, সেথা তোমার জেলা বা গ্রামের প্রাধান্যটি ভুলে যেতে হবে। ভাষা ভাবের বাহক। ভাবই প্রধান; ভাষা পরে। হীরেমতির সাজ-পরানো ঘোড়ার উপর বাঁদর বসালে কি ভাল দেখায়? সংস্কৃতর দিকে দেখ দিকি। ব্রাহ্মণের সংস্কৃত দেখ, শবরস্কামীর মীমাংসাভাষ্য দেখ, পতঞ্জলির মহাভাষ্য দেখ, শেষ-আচার্য শঙ্করের ভাষ্য দেখ, আর অর্বাচীন কালের সংস্কৃত দেখ। এখুনি বুঝতে পারবে যে, যখন মানুষ বেঁচে থাকে, তখন জেন্ত-কথা কয়, মরে গেলে মরা-ভাষা কয়। যত মরণ নিকট হয়, নূতন চিন্তাশক্তির ক্ষয় হয়, ততই দু-একটা পচা ভাব রাশীকৃত ফুল-চন্দন দিয়ে ছাপবার চেষ্টা হয়। বাপ রে, সে কি ধুম-দশপাতা লম্বা লম্বা বিশেষণের পর দুম ক'রে,-'রাজা আসীৎ'!!! আহাহা! কি প্যাঁচওয়া বিশেষণ, কি বাহাদুর সমাস, কি শ্লেষ!! ও সব মড়ার লক্ষণ। যখন দেশটা উৎসন্ন যেতে আরম্ভ হ,ল। তখন এই সব চিন্তা উদয় হ'ল। ওটি শুধু ভাষায় নয়,সকল শিল্পতেই এল। বাড়ীটার না আছে ভাব, না ভঙ্গি; থামগুলোকে কুঁদে কুঁদে সারা ক'রে দিলে। গয়নাটা নাক ফুঁড়ে ঘাড় ফুঁড়ে ব্রহ্মরাক্ষসী সাজিয়ে দিলে, কিন্তু সে গয়নায় লতা-পাতা চিত্র-বিচিত্রর কি ধুম!! গান হচ্ছে, কি কান্না হচ্ছে, কি ঝগড়া হচ্ছে-তার কি ভাব, কি উদ্দেশ্য, তা ভরত ঋষিও বুঝতে পারেন না; আবার সে গানের মধ্যে কি ধুম! সে কি আঁকাবাঁকা ডামাডোল—ছত্রিশ নাড়ীর টান তায় রে বাপ! তার উপর মুসলমান ওস্তাদের নকলে দাঁতে দাঁতে চেপে, নাকের মধ্য দিয়ে আওয়াজে সে গানের আবির্ভাব! এগুলো শোধরাবার লক্ষণ এখন হচ্ছে, এখন ক্রমে বুঝবে যে, যেটা ভাবহীন প্রাণহীন-সে ভাষা, সে শিল্প, সে সঙ্গীত কোনও কাজের নয়। এখন বুঝবে যে, জাতীর জীবনে যেমন যেমন বল আসবে, তেমন তেমন ভাষা শিল্প সঙ্গীত প্রভৃতি আপনা-আপনি ভাবময় প্রাণপূর্ণ হ'য়ে দাঁড়াবে। দুটো চলিত কথায় যে ভাবরাশি আসবে, তা দু-হাজার ছাঁদি বিশেষণেও নাই। তখন দেবতার মূর্তি দেখলেই ভক্তি হবে, গহনা-পরা মেয়ে-মাত্রই দেবী বলে বোধ হবে, আর বাড়ী ঘর দোর সব প্রাণস্পন্দনে ডগমগ করবে।”
================================================
নাচুক তাহাতে শ্যামা
---------------------------------------------------
ফুল্ল ফুল সৌরভে আকুল, মত্ত অলিকুল গুঞ্জরিছে আশে পাশে।
শুভ্র শশী যেন হাসিরাশি, যত স্বর্গবাসী বিতরিছে ধরাবাসে ।।
মৃদুমন্দ মলয়পবন, যার পরশন, স্মৃতিপট দেয় খুলে।
নদী, নদ, সরসী-হিল্লোল, ভ্রমর চঞ্চল, কত বা কমল দোলে ।।
ফেনময়ী ঝরে নির্ঝরিণী-তানতরঙ্গিণী-গুহা দেয় প্রতিধ্বনি ।
স্বরময় পতত্রিনিচয়, লুকায়ে পাতায়, শুনায় সোহাগবাণী ।।
চিত্রকর, তরুণ ভাস্কর, স্বর্ণতুলিকর, ছোঁয় মাত্র ধরাপটে।
বর্ণখেলা ধরাতল ছায়, রাগপরিচয় ভাবরাশি জেগে ওঠে ।।
মেঘমন্দ্র কুলিশ-নিস্বন, মহারণ, ভুলোক-দ্যুলোক-ব্যাপী ।
অন্ধকার উগরে আঁধার, হুহুঙ্কার শ্বসিছে প্রলয়বায়ু ।।
ঝলকি ঝলকি তাহে ভায়, রক্তকায় করাল বিজলীজ্বালা ।
ফেনময় গর্জি মহাকায়, উর্মি ধায় লঙ্ঘিতে পর্বতচূড়া ।।
ঘোষে ভীম গম্ভীর ভূতল, টলমল রসাতল যায় ধরা ।
পৃথ্বীচ্ছেদি উঠিছে অনল, মহাচল চূর্ণ হয়ে যায় বেগে ।।
শোভাময় মন্দির-আলয়, হৃদে নীল পয়, তাহে কুবলয়শ্রেণী ।
দ্রাক্ষাফল-হৃদয়-রুধির, ফেনশুভ্রশির, বলে মৃদু মৃদু বাণী ।।
শ্রুতিপথে বীণার ঝঙ্কার, বাসনা বিস্তার, রাগ তাল মান লয়ে ।
কতমত ব্রজের উচ্ছ্বাস, গোপী-তপ্তশ্বাস, অশ্রুরাশি পড়ে বয়ে ।।
বিম্বফল যুবতী-অধর, ভাবের সাগর—নীলোৎপল দুটি আঁখি ।
দুটি কর—বাঞ্ছাঅগ্রসর, প্রেমের পিঞ্জর, তাহে বাঁধা প্রাণপাখী ।।
ডাকে ভেরী, বাজে ঝর্,‍র্ ঝর্ঞ‍র্ দামামা নক্কাড়, বীর দাপে কাঁপে ধরা।
ঘোষে তোপ বব-বব-বম্, বব-বব-বম্ বন্দুকের কড়কড়া ।।
ধুমে ধুমে ভীম রণস্থলে, গরজি অনল বমে শত জ্বালামুখী ।
ফাটে গোলা লাগে বুকে গায়, কোথা উড়ে যায় আসোয়ার ঘোড়া হাতি ।।
পৃথ্বীতল কাঁপে থরথর, লক্ষ অশ্ববরপৃষ্ঠে বীর ঝাঁকে রণে।
ভেদি ধূম গোলাবরিষণ গুলি স্বন্ স্বন্, শত্রুতোপ আনে ছিনে ।।
আগে যায় বীর্য-পরিচয় পতাকা-নিচয়, দণ্ডে ঝরে রক্তধারা ।
সঙ্গে সঙ্গে পদাতিকদল, বন্দুক প্রবল, বীরমদে মাতোয়ারা ।।
ঐ পড়ে বার ধ্বজাধারী, অন্য বীর তারি ধ্বজা লয়ে আগে চলে।
তলে তার ঢের হয়ে যায় মৃত বীরকায়, তবু পিছে নাহি টলে ।।
দেহ চায় সুখের সঙ্গম, চিত্ত-বিহঙ্গম সঙ্গীত-সুধার ধার।
মন চায় হাসির হিন্দোল, প্রাণ সদা লোল যাইতে দুঃখের পার ।।
ছাড়ি হিম শশাঙ্কচ্ছটায়, কেবা বল চায়, মধ্যাহ্নপতন-জ্বালা।
প্রাণ যার চণ্ড দিবাকর, স্নিগ্ধ শশধর, সেও তবু লাগে ভালো ।।
সুখতরে সবাই কাতর, কেবা সে পামর দুঃখে যার ভালবাসা ?
সুখে দুঃখ, অমৃতে গরল, কণ্ঠে হলাহল, তবু নাহি ছাড়ে আশা ।।
রুদ্রমুখে সবাই ডরায়, কেহ নাহি চায় মৃত্যুরূপা এলোকেশী ।
উষ্ণধার, রুধির-উদগার, ভীম তরবার খসাইয়ে দেয় বাঁশী ।।
সত্য তুমি মৃত্যরূপা কালী, সুখবনমালী তোমার মায়ার ছায়া।
করালিনি, কর মর্মচ্ছেদ, হোক মায়াভেদ, সুখস্বপ্ন দেহে দয়া ।।
মুণ্ডমালা পরায়ে তোমায়, ভয়ে ফিরে চায়, নাম দেয় দয়াময়ী।
প্রাণ কাঁপে, ভীম অট্টহাস, নগ্ন দিক্া‍বাস, বলে মা দানবজয়ী ।।
মুখে বলে দেখিবে তোমায়, আসিলে সময় কোথা যায় কেবা জানে।
মৃত্যু তুমি, রোগ মহামারী বিষকুম্ভ ভরি, বিতরিছ জনে জনে ।।
রে উন্মাদ, আপনা ভুলাও, ফিরে নাহি চাও, পাছে দেখ ভয়ঙ্করা।
দুখ চাও, সুখ হবে ব'লে, ভক্তিপূজাছলে স্বার্থ-সিদ্ধি মনে ভরা ।।
ছাগকণ্ঠ রুধিরের ধার, ভয়ের সঞ্চার, দেখে তোর হিয়া কাঁপে।
কাপুরুষ! দয়ার আধার! ধন্য ব্যবহার! মর্মকথা বলি কাকে ?
ভাঙ্গ বীণা-প্রেমসুধাপান, মহা আকর্ষণ-দূর কর নারীমায়া ।
আগুয়ান, সিন্ধুরোলে গান, অশ্রুজলপান, প্রাণপণ, যাক্ কায়া ।।
জাগো বীর, ঘুচায়ে স্বপন, শিয়রে শমন, ভয় কি তোমার সাজে?
দুঃখভার, এ ভব-ঈশ্বর, মন্দির তাহার প্রেতভূমি চিতামাঝে ।।
পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার, সদা পরাজয় তাহা না ডরাক তোমা।
চূর্ণ হোক স্বার্থ সাধ মান, হৃদয় শ্মশান, নাচুক তাহাতে শ্যামা ।।
- স্বামী বিবেকানন্দ
==================================
বাগেশ্রী—আড়া (ঝাঁপতাল)
-----------------------------------------------
নাহি সূর্য, নাহি জ্যোতিঃ, নাহি শশাঙ্ক সুন্দর,
ভাসে ব্যোমে ছায়াসম ছবি বিশ্ব চরাচর ।।
অস্ফুট মন-আকাশে, জগতসংসার ভাসে,
ওঠে ভাসে ডোবে পুনঃ অহং-স্রোতে নিরন্তর ।।
ধীরে ধীরে ছায়াদল, মহালয়ে প্রবেশিল,
বহে মাত্র 'আমি' 'আমি'-এই ধারা অনুক্ষণ ।।
সে ধারাও বদ্ধ হ'ল, শুন্যে শুণ্য মিলাইল,
'অবাঙ‍্মনসোগোচরম্', বোঝে—প্রাণ বোঝে যার ।।
- স্বামী বিবেকানন্দ।
-----------------------------
স্বামীজির শিবোপাসনা-
**********************
“যখন তোমরা শুধু তাঁহাকে শিবলিঙ্গ নয়, সর্বত্র দেখিবেতখনই তোমাদের শিব ভক্তি এবং তোমাদের শিবদর্শন সম্পূর্ণ হইবে। তিনিই যথার্থ সাধু তিনিই যথার্থ হরিভক্ত, যিনি সেই হরিকে সর্বজীবে ও সর্বভুতে দেখিয়া থাকেন। যদি তুমি শিবের যথার্থ ভক্ত হও, তবে তুমি তাঁহাকে সর্বজীবে ও সর্বভূতে দেখিবে। যে নামে, যে রূপে তাঁহাকে উপাসনা করা হউক না কেন, তোমাকে বুঝিতে হইবে যে, সব তাঁহারই উপাসনা।“ (কলম্বো বক্তৃতা)
“সকল উপাসনার সার – শুদ্ধচিত্ত হওয়া ও অপরের কল্যাণ সাধন করা। দরিদ্র, দুর্বল, রোগী—সকলেরই মধ্যে যিনি শিব দর্শন করেন, তিনিই যর্থার্থ শিবের উপাসনা করেন। আর যে—ব্যক্তি কেবল প্রতিমার মধ্যে শিব উপাসনা করে, সে প্রবর্তকমাত্র। যে—ব্যক্তি কেবল শিব দর্শন করে, তাহার অপেক্ষা যে—ব্যক্তি জাতি— ধর্মনির্বিশেষে একটি দরিদ্রকেও শিববোধে সেবা করে, তাহার প্রতি শিব অধিকতর প্রসন্ন হন।
কোন ধনী ব্যক্তির একটি বাগান ছিল এবং দুইটি মালী ছিল। তাহাদের মধ্যে একজন খুব অলস, সে কোন কাজ করিত না;কিন্তু প্রভু আসিবামাত্র করজোড়ে ‘প্রভুর কিবা রূপ, কি বা গুণ!’ বলিয়া তাঁহার সম্মুখে নৃত্য করিত। অপর মালীটি বেশী কথা জানিত না—সে খুব পরিশ্রম করিয়া প্রভুর বাগানে সকল প্রকার ফল ও শাকসব্জি উৎপন্ন করিত ও সেইগুলি মাথায় করিয়া অনেক দুরে প্রভুর বাটিতে লইয়া যাইত। বলো দেখি, এই দুইজন মালীর মধ্যে প্রভু কাহাকে অধিকতর ভালবাসিতেন ? এইরূপে শিব আমাদের সকলের প্রভু, জগৎ তাঁহার উদ্যানস্বরূপ, আর এখানে দুই প্রকার মালী আছে। এক প্রকার মালী অলস কপট, কিছুই করিবে না, কেবল শিবের রূপের —তাঁহার চোখ নাক ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বর্ণনা করিবে; আর এক প্রকার মালী আছেন, যাঁহারা শিবের দরিদ্র দুর্বল সন্তান গণের জন্য, তাঁহার সৃষ্ট সকল প্রাণীর কল্যাণের জন্য চেষ্টা করেন। এই দ্বিবিধপ্রকৃতি বিশিষ্ট ভক্তের মধ্যে কেশিবের প্রিয়তর হইবে? নিশ্চয়ই যিনি শিবের সন্তান গণের সেবা করেন। যিনি পিতার সেবা করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাকে আগে তাঁহার সন্তান গণের সেবা করিতে হইবে। যিনি শিবের সেবা করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাকে তাঁহার সন্তান গণের সেবা সর্বাগ্রে করিতে হইবে—জগতের জীবগণের সেবা আগে করিতে হইবে।“ (রামেশ্বরম বক্তৃতা)
------------------------------------------------------------------
শুভ মহাশুভরাত্রি।
===========================================
সখার প্রতি
আঁধারে আলোক-অনুভব, দঃখে সুখ, রোগে স্বাস্থ্যভান;
প্রাণ-সাক্ষী শিশুর ক্রন্দন, হেথা সুখ ইচ্ছ মতিমান্?
দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলে অনিবার, পিতা পুত্রে নাহি দেয় স্থান;
'স্বার্থ' স্বার্থ সদা এই রব, হেথা কোথা শান্তির আকার?
সাক্ষাৎ নরক স্বর্গময়-কেবা পারে ছাড়িতে সংসার?
কর্ম-পাশ গলে বাঁধা যার-ক্রীতদাস বল কোথা যায়?
যোগ-ভোগ, গার্হস্থ্য-সন্ন্যাস, জপ-তপ, ধন-উপার্জন,
ব্রত ত্যাগ তপস্যা কঠোর, সব মর্ম দেখেছি এবার;
জেনেছি সুখের নাহি লেশ, শরীরধারণ বিড়ম্বন;
যত উচ্চ তোমার হৃদয়, তত দুঃখ জানিহ নিশ্চয়।
হৃদিবান্ নিঃস্বার্থ প্রেমিক! এ জগতে নাহি তব স্থান;
লৌহপিণ্ড সহে যে আঘাত, মর্মর-মূরিত তা কি সয়?
হও জড়প্রায়, অতি নীচ, মুখে মধু, অন্তরে গরল-
সত্যহীন, স্বার্থপরায়ণ, তবে পাবে এ সংসারে স্থান।
বিদ্যাহেতু কবি প্রাণপণ, অর্ধেক করেছি আয়ুক্ষয়-
প্রেমহেতু উন্মাদের মতো, প্রাণহীন ধরেছি ছায়ায়;
ধর্ম তরে করি কত মত, গঙ্গাতীর শ্মশানে আলয়,
নদীতীর পর্বতগহ্বর, ভিক্ষাশনে কত কাল যায়।
অসহায়-ছিন্নবাস ধ'রে দ্বারে উদরপূরণ-
ভগ্নদেহ তপস্যার ভারে, কি ধন করিনু উপার্জন?
শোন বলি মরমের কথা, জেনেছি জীবনে সত্য সার-
তরঙ্গ-আকুল ভবঘোর, এক তরী করে পারাপার-
মন্ত্র-তন্ত্র, প্রাণ-নিয়মন, মতামত, দর্শন-বিজ্ঞান,
ত্যাগ-ভোগ-বুদ্ধির বিভ্রম; 'প্রেম' 'প্রেম'-এই মাত্র ধন।
জাব ব্রহ্ম, মানব ঈশ্বর, ভূত-প্রেত-আদি দেবগণ,
পশু-পক্ষী কীট-অনুকীট-এই প্রেম হৃদয়ে সবার ।
'দেব' 'দেব'-বলো আর কেবা? কেবা বলো সবারে চালায়?
পুত্র তরে মায়ে দেয় প্রাণ, দস্যু হরে-প্রেমের প্রেরণ !!
হয়ে বাক্য-মন-অগোচর, সুখ-দুঃখে তিনি অধিষ্ঠান,
মহাশক্তি কালী মৃত্যুরূপা, মাতৃভাবে তাঁরি আগমন।
রোগ-শোক, দারিদ্র-যাতনা, ধর্মাধর্ম, শুভাশুভ ফল,
সব ভাবে তাঁরি উপাসনা, জীবে বলো কেবা কিবা করে?
ভ্রান্ত সেই যেবা সুখ চায়, দুঃখ চায় উন্মাদ সে জন-
মৃত্যু মাঙ্গে সেও যে পাগল, অমৃতত্ব বৃথা আকিঞ্চন।
যতদূর যতদূর যাও, বুদ্ধিরথে করি আরোহণ,
এই সেই সংসার-জলধি, দুঃখ সুখ করে আবর্তন।
পক্ষহীন শোন বিহঙ্গম, এ যেনহে পথ পালবার
বারংবার পাইছ আঘাত, কেন কর বৃথায় উদ্যম?
ছাড় বিদ্যা জপ যজ্ঞ বল, স্বার্থহীন প্রেম যে সম্বল;
দেখ, শিক্ষা দেয় পতঙ্গম-অগ্মিশিখা করি আলিঙ্গন।
রূপমুগ্ধ অন্ধ কীটাধম, প্রেমমত্ত তোমার হৃদয়;
হে প্রেমিক, স্বার্থ-মলিনতা অগ্নিকুণ্ডে কর বিসর্জন।
ভিক্ষুকের কবে বলো সুখ? কৃপাপাত্র হয়ে কিবা ফল ?
দাও আর ফিরে চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।
অনন্তের তুমি অধিকারী প্রেমসিন্ধু হৃদে বিদ্যমান,
'দাও, দাও'-সেবা ফিরে চায়, তার সিন্ধু বিন্দু হয়ে যান।
ব্রহ্ম হ'তে কীট-পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মন প্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে, এ সবার পায়।
বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
- স্বামী বিবেকানন্দ
=====================================================
শিবস্তোত্রম্
স্বামী বিবেকানন্দ
------------------
ওঁ নমঃ শিবায়
নিখিলভুবনজন্মস্থেমভঙ্গপ্ররোহাঃ
অকলিতমহিমানঃ কল্পিতা যত্র তস্মিন্।
সুবিমলগগনাভে ত্বীশসংস্থেহপ্যনীশে
মম ভবতু ভবেহস্মিন্ ভাসুরো ভাববদ্ধঃ!!১
যাঁহাতে সমুদয় জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও লয়ের অঙ্কুরসমূহ অসংখ্য বিভূতিরূপে কল্পিত, যিনি সুনির্মল আকাশের তুল্য, যিনি জগতের ঈশ্বর-রূপে অবস্থিত, যাঁহার কোন নিয়ন্তা নাই—সেই মহাদেব আমার প্রেমবন্ধন দৃঢ় ও উজ্জ্বল হউক।১
নিহতনিখিলমোহেহধীশতা যত্র রূঢ়া
প্রকটিতপরপ্রেম্না যো মহাদেবসংজ্ঞঃ।
অশিথিলপরিরম্ভঃ প্রেমরূপস্য যস্য
হৃদি প্রণয়তি বিশ্বং ব্যাজমাত্রং বিভুত্বম্!!২
যিনি সমুদয় মোহ নাশ করিয়াছেন, যাঁহাতে ঈশ্বরত্ব স্বাভাবিক ভাবে অবস্থিত, যিনি (হলাহল পান করিয়া জগতের জীবগণের প্রতি) পরম প্রেম প্রকাশ করায় 'মহাদেব' নামে অভিহিত হইয়াছেন, প্রেমস্বরূপ যাঁহার গাঢ় আলিঙ্গনে সমুদয় ঐশ্বর্যই আমাদের হৃদয়ে শুধু মায়া বলিয়া প্রতিভাত হয়, সেই মহাদেবে আমার প্রেমবন্ধন দৃঢ় হউক।২
বহতি বিপুলবাতঃ পূর্বসংস্কারূপঃ
বিদলতি১ বলবৃন্দং ঘূর্ণিতেবোর্মিমালা।
প্রচলিত খলু যুগ্মং যুষ্মদস্মৎপ্রতীতম্
অতিবিকলিতরূপং নৌমি চিত্তং শিবস্থম্!!৩
পূর্বসংস্কাররূপ প্রবল বায়ু প্রবাহিত হইতেছে, উহা, ঘূর্ণায়মান তরঙ্গ সমূহের মতো বলবান ব্যক্তিদিগকেও দলিত করিতেছে। 'তুমি-আমি'—রূপে প্রতিভাত দ্বন্দ চলিতেছে। সেই শিবে সংস্থাপিত অতি বিকারশীল অস্থির চিত্তকে আমি বন্দনা করি।৩
জনকজনিভাবো বৃত্তয়ঃ সংস্কৃতাশ্চ
অবগণবহুরূপা যত্র চৈকো যথার্থ।
শমিতবিকৃতিবাতে যত্র নান্তর্বহিশ্চ
তমহহ হরমীড়ে চিত্তবৃত্তের্নিরোধম্!!৪
কার্যকারণভাব এবং নির্মল বৃত্তিসমূহ অসংখ্য নানারূপ হইলেও যেখানে একবস্তুই সত্য, বিকাররূপ বায়ু শান্ত হইলে যেখানে ভিতর ও বাহির থাকে না, আহা! সেই চিত্তবৃত্তির নিরোধস্বরূপ মহাদেবকে আমি বন্দনা করি।৪
গলিততিমিরমালঃ শুভ্রতেজঃপ্রকাশঃ
ধবলকমলশোভঃ জ্ঞানপুঞ্জাট্টহাসঃ ।
যমিজনহৃদিগম্য নিষ্কলো ধ্যায়মানঃ!!
প্রণতমবতু মাং সঃ মানসো রাজহংসঃ!!৫
যাঁহা হইতে অজ্ঞানরূপ অন্ধকারসমূহ নষ্ট হইয়াছে, শুভ্র জ্যোতির মতো যাঁহার প্রকাশ, যিনি শ্বেতবর্ণ পদ্মের ন্যায় শোভা ধারণ করিয়াছেন, জ্ঞানরাশি যাঁহার অট্টহাস্যস্বরূপ (যাঁহার অট্টহাসিতে জ্ঞানরাশি ছড়াইয়া পড়িতেছে), যিনি সংযমী ব্যক্তির হৃদয়ে লভ্য, যিনি অখণ্ডস্বরূপ, মনোরূপ সরোবরে অবস্থিত সেই রাজহংসরূপী শিব, আমার দ্বারা ধ্যাত প্রণত আমাকে রক্ষা করুন।৫
দুরিতদলনদক্ষং দক্ষজাদত্তদোষং
কলিতকলিকলঙ্কং কম্রকহ্লারকান্তম্।
পরহিতকরণায় প্রাণপ্রচ্ছেদপ্রীতং
নতনয়ননিযুক্তং নীলকন্ঠং নমামঃ!!৬
যিনি পাপনাশ করিতে সমর্থ, দক্ষকন্যা সতী—যাঁহাকে করকমল দান করিয়াছেন, যিনি কলির দোষসমূহ নাশ করেন, যিনি সুন্দর কহ্লারপুষ্পের মতো মনোহর, পরের কল্যাণের জন্য প্রাণত্যাগ করিতে যাঁহার সদাই প্রীতি, প্রণত ব্যক্তিগণের মঙ্গলের জন্য সর্বদা যাঁহার দৃষ্টি রহিয়াছে—সেই নীলকন্ঠ মহাদেবকে আমরা প্রণাম করি।৬
============================================






আপনার সন্ধ্যা হয়ে উঠুক প্রার্থনাময়।
----------------------------------------------
সামাখ্যাদ্যৈর্গীতিসুমধুরৈর্মেঘগম্ভীরঘোষৈ-
র্যজ্ঞধ্বনি-ধ্বনিতগগনৈর্ব্রাহ্মণৈর্জ্ঞাতবেদৈঃ।
বেদান্তাখৌঃ সুবুহিত-মখোদ্ভিন্ন-মোহান্ধকারৈঃ
স্তুতো গীতো য ইহ সততং তং ভজে রামকৃষ্ণম্।।
বেদতত্ত্ব ব্রাহ্মণগণ যজ্ঞস্থলে মন্ত্রোচ্চারণ দ্বারা আকাশ বাতাস মুখরিত করিতেন, বিধিপূর্বক যজ্ঞ সম্পাদন করার ফলে তাঁহাদের শুদ্ধ হৃদয় হইতে বেদান্তবাক্যদ্বারা ভ্রম ও অজ্ঞানের অন্ধকার দূরীভূত হইয়াছিল; তাঁহারা মেঘের মতো গম্ভীর সুমধুর সুরে সামবেদ প্রভৃতি দ্বারা যাঁহার স্তব করিয়াছেন, যাঁহার মহিমা কীর্তন করিয়াছেন—আমি সর্বদা সেই শ্রীরামকৃষ্ণের ভজনা করি।
শ্রীরামকৃষ্ণপ্রণাম
--------------------------
স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিণে।
অবতারবরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ!!
ধর্মের সংস্থাপক, সকলধর্মস্বরূপ, অবতারগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হে রামকৃষ্ণ, তোমাকে প্রণাম করি।
- স্বামী বিবেকানন্দ।
======================================
নরদেব দেব জয় জয় নরদেব
শক্তিসমুদ্রসমুত্থতরঙ্গং
দর্শিতপ্রেমবিজৃম্ভিতরঙ্গং
সংশয়রাক্ষসনাশমহাস্ত্রং
যামি গুরুং শরণং ভববৈদ্যং
নরদেব দেব জয় জয় নরদেব!!
অদ্বয়তত্ত্বসমাহিতচিত্তং
প্রোজ্জ্বলভক্তিপটাবৃতবৃত্তং
কর্মকলেবরমদ্ভুতচেষ্টং
যামি গুরুং শরণং ভববৈদ্যং
নরদেব দেব জয় জয় নরদেব!!
- হে নরদেব দেব! তোমার জয় হউক। যিনি শক্তিরূপ সমুদ্র হইতে উত্থিত তরঙ্গস্বরূপ, যিনি প্রেমের নানা লীলা দেখাইয়াছেন, যিনি সন্দেহরূপ রাক্ষস বিনাসের মহাস্ত্রুস্বরূপ, সংসাররূপ রোগের চিকিতসক সেই গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি। হে নরদেব দেব! তোমার জয় হউক।
যাঁহার চিত্ত অদ্বয় ব্রহ্মে সমাহিত, যাঁহার চরিত্র অতি শ্রেষ্ঠ ভক্তিরূপ বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত—অর্থাৎ যাঁহার ভিতরে জ্ঞান এবং বাহিরে ভক্তি, যিনি দেহের দ্বারা ক্রমাগত লোকহিতার্থ কর্ম করিয়াছেন, যাঁহার কার্যকলাপ অদ্ভুত, সংসাররূপ রোগের চিকিৎসক সেই গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি। হে নরদেব দেব! তোমার জয় হউক।
- স্বামী বিবেকানন্দ
==========================================
আচণ্ডালাপ্রতিহতরয়ো যস্য প্রেমপ্রবাহঃ
লোকাতীতোহপ্যহহ ন জহৌ লোককল্যাণমার্গম্।
ত্রৈলোক্যোহপ্যপ্রতিমমহিমা জানকীপ্রাণবন্ধঃ
ভক্ত্যা জ্ঞানং বৃতবরবপুঃ সীতায় যো হি রামঃ!!
স্তব্ ধীকৃত্য প্রলয়কলিতং বাহবোত্থং মহান্তং
হিত্বা রাত্রিং প্রকৃতিসহজামন্ধতামিস্রমিশ্রাম্ !!
গীতং শান্তং মধুরমপি যঃ সিংহনাদং জগর্জ
সোহয়ং জাতঃ প্রথিতপুরুষো রামকৃষ্ণস্ত্বিদানীম্।।
যাঁহার প্রেমস্রোত চণ্ডাল পর্যন্ত অপ্রতিহতবেগে প্রবাহিত অর্থাৎ চণ্ডালোকের যিনি ভালবাসিতে কুন্ঠিত হন নাই, আহা! যিনি অতিমানব-স্বভাব হইয়াও লোকের কল্যাণের পথ পরিত্যাগ করেন নাই, স্বর্গ মর্ত্য পাতাল—এই তিনলোকেই যাঁহার মহিমার তুলনা নাই, যিনি সীতার প্রাণস্বরূপ, যিনি ভক্তির সহিত শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের কল্যাণমূর্তি ধারণ করিয়াছিলেন; কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের সময় যে ভয়ানক প্রলয়তুল্য হুহুঙ্কার উঠইয়াছিল, তাহাকে স্তব্ধ করিয়া এবং(অর্জুনের) ঘোরতর স্বাভাবিক অন্ধতম-স্বরূপ অজ্ঞান-রজনীকে দূর করিয়া দিয়া, শান্ত ও মধুর গীত (গীতাশাস্ত্র) যিনি সিংহনাদরূপে গর্জন করিয়া বলিয়াছিলেন, তিনিই ইদানীং রামকৃষ্ণ।
- স্বামী বিবেকানন্দ
============================================
শ্রীরামকৃষ্ণস্তোত্রাণি
ওঁ হ্রীং ঋতং ত্বমচলো গুণজিৎ গুণেড্যঃ
ন-ক্তন্দিবং সকরুণং তব পাদপদ্মম্।
মো-হঙ্কষং বহুকৃতং ন ভজে যতোহহং
তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো!১
ওঁ হ্রীং তুমি সত্য, স্থির, ত্রিগুণজয়ী অথচ নানাপ্রকার গুণের দ্বারা স্তবের যোগ্য। যেহেতু তোমার মোহনিবারক পূজনীয় পাদপদ্ম আমি ব্যাকুলভাবে দিনরাত্রি ভজনা করি না, সেজন্য হে দীনবন্ধো! তুমিই আমার আশ্রয়।১
ভ-ক্তির্ভগশ্চ ভজনং ভবভেদকারি
গ-চ্ছন্ত্যলং সুবিপুলং গমনায় তত্ত্বম্।
বক্ত্রোদ্ধৃতোহপি হৃদয়ে ন মে ভাতি কিঞ্চিৎ১
তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো!২
সংসার-বন্ধন-নাশকারী ভজন, ভক্তি ও বৈরাগ্যাদি ষড়ৈশ্বর্য সেই অতি মহান্ ব্রহ্মতত্ত্বপ্রাপ্তির পক্ষে যথেষ্ট,—এই কথা মুখে উচ্চারিত হইলেও আমার অন্তঃকরণে কিছুমাত্র প্রতিভাত হইতেছে না। অতএব হে দীনবন্ধো! তুমিই আমার আশ্রয়।২
তে-জস্তরন্তি ত্বরিতং ত্বয়ি তৃপ্ততৃষ্ণাঃ২
রা-গং কৃতে ঋতপথে ত্বয়ি রামকৃষ্ণে।৩
ম-র্ত্যামৃতং তব পদং মরণোর্মিনাশং
তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো! ৩
হে রামকৃষ্ণ! সত্যের পথস্বরূপ তোমাতে যাহারা অনুরক্ত, তোমাকে পাইয়াই তাহাদের কামনা পূর্ণ হয়, সুতরাং তাহারা শীঘ্র রজোগুণকে অতিক্রম করে। মরণশীল নরলোকে অমৃতস্বরূপ তোমার পাদপদ্ম মৃত্যুরূপ তরঙ্গকে নাশ করে। অতএব হে দীনবন্ধো! তুমিই আমার আশ্রয়।৩
কৃ-ত্যং করোতি কলুষং কুহকান্তকারি
ষ্ণা-ন্তং শিবং সুবিমলং তব নাম নাথ।
য-স্মাদহং ত্বশরণো জগদেকগম্য
তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো!৪
হে প্রভো! মায়াদূরকারী মঙ্গলময় অতি পবিত্র তোমার 'ষ্ণান্ত'(রামকৃষ্ণ) নাম পাপকেও পুণ্যে পরিণত করে। হে জগতের একমাত্র লভ্য, যেহেতু আমি নিরাশ্রয়, সেজন্য হে দীনবন্ধো! তুমিই আমার আশ্রয়।৪
---------------------------------------- -স্বামী বিবেকানন্দ
১ পাঠান্তর-বক্ত্রোদ্ধৃতন্তু হৃদি মে ন চ ভাতি কিঞ্চিৎ
২ পাঠান্তর-তেজয়স্তরন্তি ভরসা ত্বয়ি তৃপ্ততৃষ্ণা
৩ পাঠান্তর-রাগে কৃতে ঋতপথে ইত্যাদি
===================================================
"If you have the spirit within, you will never fail to attract others."
- Swami Vivekananda
===============================================
মাতা ভুবনেশ্বরী দেবীর প্রতি তাঁর স্নেহের সন্তানের ভালবাসা কেমন ছিল তার একটু আভাস হয়ত এখানে পাব -
'প্রিয় দেওয়ানজী সাহেব,
কয়েক দিন হয় আপনার শেষ চিঠিখানা পাইয়াছি। আপনি আমার দুঃখিনী মা ও ছোটভাইদের দেখিতে গিয়াছিলেন জানিয়া সুখী হইয়াছি। কিন্তু আপনি আমার অন্তরের একমাত্র কোমল স্থানটি স্পর্শ করিয়াছেন। আপনার জানা উচিত যে, আমি নিষ্ঠুর পশু নই। এই বিপুল সংসারে আমার ভালবাসার পাত্র যদি কেহ থাকেন, তবে তিনি আমার মা। তথাপি এ বিশ্বাস আমি দৃঢ়ভাবে পোষণ করিয়া আসিতেছি এবং এখনও করি যে, যদি আমি সংসার ত্যাগ না করিতাম, তবে আমার মহান্ গুরু পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণদেব যে বিরাট সত্য প্রচার করিতে জগতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, তাহা প্রকাশিত হইতে পারিত না।...............'

- স্বামী বিবেকানন্দ।
লিখছেন হরিদাস বিহারীদাস দেশাইকে, শিকাগো থেকে। ২৯শে জানুারি, ১৮৯৪।
=======================================

সবাইকে জানাই বড়দিনের শুভেচ্ছা। সম্পূর্ণ পড়ে দেখবেন অবশ্যই...
--------------------------------------------------------------
‘………… যীশু তাঁহার নিজের সম্বন্ধে কি বলিয়াছেন শুনুনঃ 'শৃগালেরও একটা গর্ত থাকে, আকাশচারী পাখিদেরও বাসা আছে, কিন্তু মানবপুত্রের (যীশুর) মাথা গুঁজিবার এতটুকু স্থান নাই।' যীশুখ্রীষ্ট বলিয়াছেন, ইহাই মুক্তির একমাত্র পথ। তিনি মুক্তির আর কোন পথ প্রদর্শন করেন নাই। আমরা যেন দন্তে তৃণ লইয়া দীনভাবে স্বীকার করি যে , আমাদের এইরূপ ত্যাগ বৈরাগ্যের শক্তি নাই, আমাদের এখনও 'আমি ও আমার' প্রতি ঘোর অসক্তি বর্তমান। আমাদের ধন ঐশ্বর্য বিষয়-এই সব চাই। আমাদিগকে ধিক্, আমরা যেন আমাদের দূর্বলতা স্বীকার করি, কিন্তু যীশুকে অন্যরূপে বর্ণনা করিয়া মানবজাতির এই মহান্ আচার্যকে লোকচক্ষে হীন প্রতিপন্ন না করি। তাঁহার কোন পারিবারিক বন্ধন ছিল না। আপনারা কি মনে করেন, এই ব্যক্তির ভিতরে কোন দেহ ভাব ছিল ? আপনারা কি মনে করেন, জ্ঞানজ্যোতির পরম আধার এই অতিমানব স্বয়ং ঈশ্বর জগতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন পশুগণের সহধর্মী হইবার জন্য ? তথাপি লোকে তাঁহার উপদেশ বলিয়া যা খুশী প্রাচার করিয়া থাকে। তাঁহার স্ত্রী -পুরুষ -এই ভেদজ্ঞন ছিল না, তিনি নিজেকে আত্মা বলিয়াই জানিতেন। তিনি জানিতেন, তিনি শুদ্ধ আত্মা, কেবল মানবজাতির কল্যানের জন্য দেহকে পরিচালনা করিতেছেন-দেহের সঙ্গে তাঁহার শুধু ঐটুকু সম্পর্ক ছিল। আত্মাকে কোন-রূপ লিঙ্গভেদ নাই। পাশব ভাবের সহিত বিদেহ আত্মার কোন সম্বন্ধ নাই, দেহের সহিত কোন সম্বন্ধ নাই। অবশ্য এইরূপ ত্যাগের ভাব হইতে আমরা এখনও বহুদূরে থাকিতে পারি, থাকিলামই বা, কিন্তু আদর্শটিকে আমাদের বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। আমরা যেন স্পষ্ট স্বীকার করি যে, ত্যাগই আমাদের আদর্শ , ঐ আদর্শের নিকট পৌঁছাতে এখনও অক্ষম।…………..
…………………….. যদি প্রাচ্যদেশীয়দের মতো আমাকে এই ন্যাজারেথবাসী যীশুর উপাসনা করিতে হয়, তবে একটিমাত্র ভাবেই আমি তাঁহার উপাসনা করিতে পারি, অর্থাৎ আমায় তাঁহাকে ঈশ্বর বলিয়াই উপসনা করিতে হইবে, অন্য কোনরূপে উপাসনা করিবার উপায় নাই। আপনারা কি বলিতে চান, আমাদের ঐরূপে তাঁহার উপাসনা করিবার অধিকার নাই? যদি আমরা তাঁহাকে আমাদের সমান স্তরে টানিয়া আনিয়া একজন মহাপুরুষমাত্র বলিয়া একটু সন্মান দেখাই, তবে আর আমাদের তাঁহকে উপাসনা করিবার প্রয়োজন কি? আমাদের শাস্ত্র বলেন, 'যাঁহাদের ভিতর দিয়া ব্রহ্ম-জ্যোতিঃ প্রকাশিত হয়, যাঁহারা স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপ, সেই জ্যোতির তনয়গণ উপাসিত হলেই যেন আমাদের সহিত তদাত্মাভাব প্রাপ্ত হন এবং আমরাও তাঁহাদের সহিত এক হইয়া যাই।'………….
…………. বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে আছে, 'যাহাদের হৃদয় পবিত্র, তাঁহারা ধন্য, কারণ তাঁহারাই ঈশ্বরকে দর্শন করিবেন।' অবশেষে তাঁহারা দেখিলেন, তাঁহারা ও পিতা ঈশ্বর অভিন্ন।
আপনারা দেখিবেন, বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট-অংশে এই মহানধর্মাচার্য যীশু উক্ত ত্রিবিধ সোপানের উপযোগী শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। তিনি যে সাধারণ প্রার্থনা (Common Prayer) শিক্ষা দিয়েছেন, তাহা লক্ষ্য করুণঃ 'হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতা, তোমার নাম জয়যুক্ত হউক; ইত্যাদি। ইহা সরল ভাবের প্রার্থনা, শিশু প্রার্থনা। লক্ষ্য করিবেন যে, ইহা 'সাধারণ প্রার্থনা' ; কারণ ইহা অশিক্ষিত জনসাধারনের জন্য বিহিত। অপেক্ষকৃত উচ্চতর ব্যক্তিদের জন্য-যাহারা পূর্বোক্ত অবস্থা হইতে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়াছেন, তাঁহাদের জন্য-তিনি উন্নততর সাধানের ব্যবস্থা করিয়াছেনঃ 'আমি ও আমার পিতা এক, য়াহুদীরা মনে করিয়াছিল, আমার পিতাতে, তোমরা আমাতে এবং আমি তোমাদিগের মধ্যেই বর্তমান।' স্মরণ হইতেছে তো? আর যখন য়াহুদীরা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল-আমনি কে ? তিনি স্পষ্টই বলিয়াছেন, আমিও তিনি ঈশ্বরের সহিত নিজেকে অভিন্ন ঘোষনা করিয়া ঈশ্বরের অমর্যাদা করিতেছেন। কিন্তু তিনি এই বাক্যে কি উদ্দেশ্য বলিয়াছেন, তাহাও আমাদের প্রাচীন ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষগণ বলিয়া গিয়াছেন, 'তোমরা সকলেই দেবতা বা ঈশ্বর-তোমরা সকলেই সেই পরাৎপর পুরুষের সন্তান।' অতএব দেখুন, বাইবেলেও ধর্মের এই ত্রিবিধ সোপান স্পষ্টরূপে উপদিষ্ট হইয়াছে ; আর আপনারা ইহাও দেখিবেন যে, আপনাদের পক্ষে প্রথম সোপান হইতে আরম্ভ করিয়া ধীরে ধীরে শেষ সোপানে পৌঁছানোই অপেক্ষাকৃত সহজ।
এই ঈশ্বরের দূত বার্তাবহ যীশু সত্যলাভের পথ দেখাইতে আসিয়াছিলেন তিনি দেখাইতে আসিয়াছিলেন যে, নানারূপ অনুষ্ঠান ক্রিয়াকলাপাদি দ্বারা সেই যথার্থ তত্ত্ব-আত্মতত্ত্ব লাভ হয় না, নানাবিধ কূট জটিল দার্শনিক বিচারের দ্বারা আত্মতত্ত্ব লাভ হয় না। আপনার যদি কিছুমাত্র বিদ্যা না থাকে, সে বরং আরও ভাল ; আপনি সারা জীবনে যদি একখানি পুস্তকও না পরিয়া থাকেন, সে আরও ভালো কথা। এগুলি আপনার মুক্তির জন্য পবিত্রাত্মা বা শুদ্ধচিত্ত ঐশ্বর্য বৈভব উচ্চপদ বা প্রভুত্বের জন্য কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই-এমন কি, পান্ডিত্যেরও কিছু প্রয়োজন নাই ; কেবল একটি জিনিসের প্রয়োজন পবিত্রতা-চিত্তশুদ্ধি। একেবারেই আবশ্যক নয়, মুক্তি লাভের জন্য ব্যক্তিগণ ধণ্য', কারণ আত্মা স্বয়ং শুদ্ধস্বভাব। তাহা অন্যরূপ অর্থাৎ অশুদ্ধ কিরূপে হইতে পারে ? আত্মা ঈশ্বরপ্রসূত, ঈশ্বর হইতে তাহার আবির্ভাব । বাইবেলের ভাষায় আত্মা ' ঈশ্বরের নিঃশ্বাসস্বরূপ' ; কোরাণের ভাষায় তাহা ' ঈশ্বরেরও আত্মাস্বরূপ'। আপনারা কি বলিতে চান-এই ঈশ্বরেরও কখনও অপবিত্র হইতে পারেন ? কিন্তু হায়, আমাদেরই শুভাশুভ কর্মের দ্বারা তাহা যেন শত শত শতাব্দীর ধুলি ও মলিনতায় আবৃত হইয়াছে। নানাবিধ অন্যায় কর্ম, অশুভ কর্ম সেই আত্মাকে শত শত শতাব্দীর অজ্ঞানরূপ ধূলিও মলিনতায় সমাচ্ছন্ন করিয়াছে। কেবল ওই ধূলি ও মলিনতা দূর করা আবশ্যক, তাহা হইলেই তৎক্ষণাৎ আত্মা নিজের প্রভায় উজ্বলভাবে প্রকাশিত হইবে। 'শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিরা ধন্য, কারণ তাহারা ঈশ্বরকে দর্শন করিবে।' স্বর্গরাজ্য তোমাদের অন্তরে।' ন্যাজারেথবাসী যীশু আপনাদিগকে জিজ্ঞসা করিতেছেন, 'স্বর্গরাজ্য এখনই-তোমাদের ভিতরে রহিয়াছে, তখন আবার উহার অন্বেসণের জন্য কোথায় যাইতেছ ? আত্মার উপরিভাগে যে মলিনতা সঞ্চার হইয়াছে, তাহা পরিষ্কার করিয়া ফেলো, স্বর্গরাজ্য এখনই বর্তমান দেখিতে পাইবে। ইহা পূর্ব হইতেই তোমার সম্পত্তি। যাহা তোমার নহে, তাহা তুমি কি করিয়া পাইবে? ইহা তো তোমার জন্মপ্রাপ্ত অধিকার। তোমার অমৃতের অধিকার, সেই নিত্য সনাতন পিতার তনয়।'
ইহাই সেই সুসমাচারা-বাহী যীশুখ্রীষ্টের মহতী শিক্ষা । তাঁহার অপর শিক্ষা-ত্যাগ ; ত্যাগই সকল ধর্মের ভিত্তিস্বরূপ। আত্মাকে কি করিয়া বিশুদ্ধ করিবে? ত্যগের দ্বারা। জনৈক ধনী যুবক যীশুকে জিজ্ঞসা করিয়াছিল, 'প্রভো, অনন্ত জীবন লাভ করিবার জন্য আমাকে কি করিতে হইবে ?' যীশু তাঁকে বলিলেন, 'তোমার এখনও একটি জিনিসের অভাব আছে। যাও, বাড়ি যাও ; তোমার যাহা কিছু আছে সব বিক্রয় কর, ঐ বিক্রয়লব্ধ অর্থ দরিদ্রগণকে বিতরণ কর, তাহা হইলে স্বর্গে তুমি অক্ষয় সম্পদ্ সঞ্চয় করিবে। তারপর নিজের দুঃখ (Cross) বহন করিয়া আমায় অনুসরন কর।' ধনী যুবকটি যীশুর এই উপদেশ দুঃখিত হইল এবং বিষণ্ন হইয়া চলিয়া গেল, কারন তাহার অগাধ সম্পত্তি ছিল। আমরা সকলেই অল্পবিস্তর ঐ ধনী যুবকের মতো। দিবারাত্র আমাদের কর্ণে সেই মহাবানী ধ্বনিত হইতেছে। আমাদের সুখ স্বাচ্ছন্দতার মধ্যে, সংসারিক বিষয় ভোগের মধ্য আমরা মনে করি, আমরা জীবনের উচ্চতর লক্ষ্য সব ভুলিয়া গিয়াছি। কিন্তু ইহার মধ্যেই হঠাৎ এক মুহুর্তের বিরাম আসিল, সেই মহাবানী আমাদের কর্ণে ধ্বনিত হইতে লাগিলঃ 'তোমার যাহা কিছু আছে, সব ত্যাগ করিয়া আমার অনুসরন কর।' 'যে কোন ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষার দিকে মনোযোগ দিবে, সে তাহা হারাইবে, আর যে আমার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিবে সে তাহা পাইবে।' কারণ, যে কোন ব্যক্তি তাঁহার জন্য এই জীবন উৎসর্গ করিবে, সে অমৃতত্ব লাভ করিবে। আমাদের সর্ববিধ দূর্বলতার মধ্যে, সর্ববিধ কার্যকলাপের মধ্যে ক্ষণকালের জন্য কখন কখন যেন একটু বিরাম আসিয়া উপস্থিত হয়, আর সেই মহাবানী আমাদের কর্ণে ঘোষণা করিতে থাকেঃ তোমার যাহা কিছু আছে, সব ত্যাগ করিয়া দরিদ্রগণের মধ্যে বিতরণ কর এবং আমাকে অনুসরণ কর।' তিনি ঐ এক আদর্শ প্রচার করিতেছেন, জগতের সকল শ্রেষ্ঠ ধর্মাচার্যগণও ঐ এক আদর্শ প্রচার করিয়াছেন- তাহা এই ত্যাগ। এই ত্যাগের তাৎপর্য কী ? সু-নীতির একটি মাত্র আদর্শ-নিঃস্বার্থপরতা। অহংশূণ্য হও। সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থপরতা বা অহংশূণ্যতাই আমাদের এক মাত্র আদর্শ । সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত এই যে, ডান গালে চড় মারিলে বাম গাল ফিরাইয়া দিতে হইবে। যদি কেহ তোমার জামা কাড়িয়া লয়, তাহাকে বহিরাবরণটিরও খুলিয়া দিতে হইবে।
আদর্শকে ছোট না করিয়া যতদূর পারা যায় উত্তমরূপে কার্য করিয়া যাইতে হইবে। আর সেই আদর্শ অবস্থা এইঃ যে-অবস্থায় মানুষের 'অহং'-ভাব কিছুই থাকে না, যখন কোন বস্তুতে তাহারা কোন অধিকারবোধ থাকে না, যখন 'আমি, আমার' বলিবার কিছু থাকে না, সে যখন সম্পূর্ণরূপে আত্ম-বিসর্জন করে, সে নিজেকে যেন মারিয়া ফেলে-এরূপ ব্যক্তির ভিতর স্বয়ং ঈশ্বর বিরাজমান। কারণ, তাহার ভিতর হইতে 'অহং'-বোধ একেবারে চলিয়া গিয়াছে, নষ্ট হইয়াছে, একেবারে নির্মূল হইয়া গিয়াছে। আমারা এখনও সেই আদর্শে পৌঁছিতে পারতেছি না, তথাপি আমাদিগকে ঐ আদর্শের উপাসনা করিতে হইবে এবং ধীরে ধীরে ঐ আদর্শের পৌঁছিবার জন্য চেষ্টা করিতে হইবে, যদিও আমাদিগকে ইতস্থতঃ পদক্ষেপে অগ্রসর হইতে হয়। কল্যই হউক., আর সহস্র বর্ষ পরেই হউক, ঐ আদর্শ অবস্থায় পৌঁছাতেই হইবে । কারণ, ইহা শুধু আমাদের লক্ষ নহে, ইহা উপায় বটে। নিঃস্বার্থপরতা-সম্পূর্ণভাবে অহংশূণ্যতাই সাক্ষাৎ মুক্তিস্বরূপ ; কারণ 'অহং'ভাব-ত্যাগ হইলে ভিতরের মানুষ-ভাব মরিয়া যায়, একমাত্র ঈশ্বরই অবশিষ্ট থাকেন।
আর এক কথা। দেখিতে পাওয়া যায়, মানবজাতির সকল ধর্মচর্চাই সম্পূর্ণ স্বার্থশূণ্য। মনে করুন, ন্যাজারেথবাসী যীশু উপদেশ দিতেছেন, কোন ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে বলিল, 'আপনি যাহা উপদেশ করিতেছেন, তাহা অতি সুন্দর ; আমি বিশ্বাস করি, ইহাই পূর্ণতা লাভের উপায়, আর আমি ইহা অনুসরণ করিতে প্রস্তুত । কিন্তু আমি আপনাকে ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র বলিয়া উপাসনা করিতে পারিব না।' ন্যাজারেথবাসী যীশু এ-কথার কি উত্তর দিবেন? তিনি নিশ্চয় উত্তর দিবেন, 'বেশ ভাই, তুমি আদর্শ অনুসরণ কর এবং নিজের ভাবে ইহার দিকে অগ্রসর হও। তুমি ঐ উপদেশের জন্য আমাকে প্রশংসা কর আর নাই কর, তাহা আমি গ্রাহ্য করি না। আমি তো দোকানদার নই, ধর্ম লইয়া ব্যবসা করিতেছি না। আমি কেবল সত্যের শিক্ষা দিয়া থাকি, আর সত্য কোন ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নহে। সত্যকে একচেটিয়া করিবার অধিকার কাহারও নই। সত্য স্বয়ং ঈশ্বর। আগাইয়া চল।' কিন্তু তাঁহার অনুগামীরা আজকাল কি বলেন? তাঁহার বলেন, তোমরা তাঁহার উপদেশ অনুসরন কর বা নাই কর, তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না, উপদেষ্টাকে যথাযথ সন্মান দিতেছ কি ? যদি উপদেষ্টার -আচার্যের সন্মান কর, তবেই তোমার উদ্ধার হইবে ; নতুবা তোমা মুক্তি নাই।' এইরূপে এই আচার্যবরের সমুদয় উপদেশই বিকৃত হইয়াছে। এখন কেবল উপদেষ্টার ব্যক্তিত্ব লইয়া বিবাদ। তাহারা জানে না যে, এইরূপে উপদেশ অনুসরণ না করিয়া উপদেষ্টার নাম লইয়া টানাটানি করাতে ব্যক্তিকে সন্মান না করিয়া একভাবে তাঁহাকে অপমানিতই করিতেছে। ঐরূপে তাঁহার উপদেশ ভুলিয়া শুধু তাঁহাকে সন্মান করিতে গেলে তিনি নিজেই লজ্জায় সঙ্কুচিত হইতেন। জগতের কোন ব্যক্তি বা তাঁহাকে মনে রাখিল বা না রাখিল, তাহাতে তাঁহার আসিয়া যায় ? জগতের নিকট তাঁহার একটি বার্তা ছিল, এবং তিনি তাহা প্রচার করিয়াছেন। বিশ সহস্র জীবন পাইলেও তিনি জগতের দরিদ্রতম ব্যক্তির জন্য তাহা উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত ছিলেন। যদি লক্ষ লক্ষ ঘৃণিত সামারীয়াবাসীর জন্য লক্ষ লক্ষ বার তাঁহাকে ক্লেশ সহ্য করিতে হইত, এবং তাঁহার জীবনাবলিই যদি প্রত্যেকের মুক্তির একমাত্র উপায় হইত, তবে তিনি অনায়াসে তাঁহার নিজ জীবন বলী দিতে প্রস্তুত হইতেন। এ সমস্ত কাজই তিনি করিতেন, ইহাতে এক ব্যক্তির নিকট তাঁহার নাম জানাইবার ইচ্ছা তাঁহার হইত না। স্বয়ং ভগবান যেভাবে কার্য করেন, তিনিও তেমনি ধীরস্থিরভাবে, নীরবে অজ্ঞত ভাবে কার্য করিয়া যাইতেন। তাঁহার অনুগামীরা এক্ষণে কি বলেন? তাঁহারা বলেন, 'তোমরা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ও নির্দোষ হইতে পারো, কিন্তু তোমরা যদি আমাদের আচার্যকে-আমাদের মহাপুরুষকে যথোপযুক্ত সন্মান না দাও, তবে তাহাতে কোন ফল হইবে না।' কেন ? এই কুসংস্কার-এই ভ্রমের উৎপত্তি কোথা হইতে? এই ভ্রমের একমাত্র কারন এই যে, যীশুখ্রীষ্টের অনুগামীগণ মনে করেন, ভগবান কেবল একবার মাত্র দেহে আবির্ভূত হইতে পারেন।
ঈশ্বর তোমাদের নিকট মানবরূপেই আবির্ভৃত হন। সমগ্র প্রকৃতিতে যাহা একবার ঘটিয়াছে, তাহা নিশ্চই অতীতে বহুবার ঘটিয়াছিল এবং ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই ঘটিবে। প্রকৃতিতে এমন কিছু নাই, যাহা নিয়মাধীন নহে ; আর নিয়মাধীন হওয়ার অর্থ এই যে, যাহা একবার ঘটিয়াছে, তাহা চিরদিনই ঘটিয়া আসিতেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটিতে থাকিবে।………………..
…………………………………………. অতএব আসুন, আমরা শুধু ন্যাজারেথবাসী যীশুর ভিতর ভগবানকে দর্শন না করিয়া তাঁহার পূর্বে যে-সকল মহাপুরুষ আবির্ভূত হইয়াছে, তাঁহার পরে যাঁহারা আসিয়াছেন এবং ভবিষ্যতেও যাঁহারা আসিবেন, তাঁহাদের সকলের ভিতরই ঈশ্বর দর্শন করি। আমাদের উপাসনা যেন সীমাবদ্ধ না হয়। সকলেই সেই এক অনন্ত ঈশ্বরেরই বিভিন্ন অভিব্যক্তিমাত্র। তাঁহারা সকলেই পবিত্রত্মা ও স্বার্থগন্ধহীন । তাঁহারা সকলেই এই দুর্বল মানবজাতির কল্যানের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছেন এবং জীবন দিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা প্রত্যেকেই আমাদের সকলের, এমন কি ভবিষ্যদ্বংশীয়গণের সমস্ত পাপ নিজেরা গ্রহণ করিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিয়া গিয়াছেন।…..
অন্য আরেকটি বক্তৃতা থেকে:
--------------------------------
……….. যীশুখ্রীষ্ট ভগবান ছিলেন-মানবদেহে অবতীর্ণ সগুণ ঈশ্বর। বহুরূপে বহু বার ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেছেন এবং তোমরা শুধু তাঁর সেই রূপগুলিরই উপাসনা করিতে পারো। পরমব্রহ্ম উপাসনার বস্তু নন। ঈশ্বরের নির্গুণ ভাবকে উপাসনা করা অর্থহীন। নরদেহে অবতীর্ণ যীশুখ্রীষ্টকেই আমাদের ঈশ্বর ব'লে পূজা করতে হবে। ঈশ্বরের এরূপ বিকাশের চেয়ে উচ্চতর কোন কিছুর পূজা কেউ করতে পারে না। খ্রীষ্ট থেকে পৃথক কোন ভগবানের উপাসনা যত শীঘ্র ত্যাগ করিবে ততই তোমাদের কল্যাণ। তোমাদের কল্পনানির্মিত যিহোবার কথা ধর, আবার সুন্দ মহান খ্রীষ্টের কথা ভেবে দেখ। যখনই খ্রীষ্টের উর্ধ্বে কোন কোন ভগবান সৃষ্টি কর, সব পন্ড করল দেবতাই দেবতার উপাসনা করিতে পারে, মানুষের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়, এবং ঈশ্বরের প্রচলিত প্রকাশের উর্ধ্বে তাঁকে উপাসনা করার যে-কোন প্রয়াস মানুষের পক্ষে বিপদ জনকই হবে। যদি মুক্তি চাও তো খ্রীষ্টের সমীপবর্তী হও ; তোমাদের কল্পিত যে কোন ঈশ্বরের চেয়ে তিনি অনেক উর্ধ্বে। যদি মনে কর-খ্রীষ্ট এক জন মানুষ ছিলেন তবে তাঁর উপাসনা ক'রো না। কিন্তু যখনই ধারনা করিতে পারিবে -তিনি ঈশ্বর, তখনই তাঁর উপাসনা ক'রো। যারা বলে-তিনি মানুষ ছিলেন, আবার তাঁকে পূজাও করে, তারা নিতান্ত অশাস্ত্রীয় অধর্মের কাজই করে। এখানে মধ্য পন্থা ব'লে কিছু নেই, সমগ্র শক্তিকেই গ্রহণ করতে হবে। 'যে পুত্রকে দেখেছে, সে পিতাকেই দর্শন করেছে', আর পুত্রকে না দেখে কেউ পিতার দর্শন পাবে না। শুধু বড় বড় কথা, অসার দার্শনিক বিচার আর স্বপ্ন ও কল্পনা ! যদি আধ্যাত্মিক জীবনে কিছু উপলব্ধি করতে চাও, তবে খ্রীষ্টের প্রকাশিত ঈশ্বরকে নিবিড়ভাবে ধরে থাকো।……..”
- স্বামী বিবেকানন্দ
=======================================

"......... গরু মাংস খায় না—নিরামিষভোজী, মেষও তাই; তবে কি তাহারা যোগী বা অহিংসাপরায়ণ ? যে-কোন মূর্খ ইচ্ছা করিলেই মাংসাহার বর্জন করিতে পারে । শুধু এইজন্যই তাহাকে উদ্ভিদ্‌ভোজী জন্তুগণ অপেক্ষা বিশেষ উন্নত বলা যাইতে পারে না, খাদ্যবিশেষ ত্যাগ করিলেই কেহ জ্ঞানী হইয়া যায় না ।
যে ব্যক্তি নির্দয়ভাবে বিধবা ও অনাথ বালকবালিকাকে ঠকাইয়া অর্থ লইতে পারে, অর্থের জন্য যে কোন রূপ অন্যায় কার্য করিতে যাহার দ্বিধা নাই, সে যদি কেবল তৃণভোজন করিয়াও জীবনধারণ করে, তথাপি সে পশুরও অধম । যাঁহার হৃদয়ে কখনও অপরের অনিষ্টচিন্তা পর্যন্ত উদিত হয় না, যিনি শুধু বন্ধুর নয়, পরম শত্রুরও সৌভাগ্যে আনন্দিত, সারা জীবন প্রতিদিন শূকরমাংস খাইলেও তিনিই প্রকৃত ভক্ত, তিনিই প্রকৃত যোগী, তিনিই সকলের গুরু।
সুতরাং এইটি সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত যে, বাহ্য রীতিনীতি কেবল অন্তঃশুদ্ধির সহায়কমাত্র; যেখানে বাহ্যবিষয়ে অত খুঁটিনাটি-বিচার করা অসম্ভব, সেখানে কেবল অন্তঃশৌচ-অবলম্বনই যথেষ্ট। সেই লোককে ধিক্, সেই জাতিকে ধিক্, যে লোক বা যে জাতি ধর্মের সার ভুলিয়া অভ্যাসবশে বাহ্যঅনুষ্ঠানগুলিকে মরণ-কামড়ে ধরিয়া থাকে, কোনমতে ছাড়িতে চায় না। যদি ঐ অনুষ্ঠানগুলি আধ্যাত্মিক জীবনের পরিচায়ক হয়, তবেই উহাদের উপযোগিতা আছে বলিতে হইবে। প্রাণশূন্য হইলে উহাদিগকে নির্দয়ভাবে উৎপাটন করিয়া ফেলা উচিত।......''
- স্বামী বিবেকানন্দ
=================================================




“সত্য যা, তা সাহসপূর্বক নির্ভীকভাবে লোকের কাছে বলো,--ঐ সত্য প্রকাশের জন্য ব্যক্তিবিশেষের কষ্ট হ’ল বা না হ’ল, সে দিকে খেয়াল ক’রো না। দুর্বলতাকে আমল দিও না। সত্যের জ্যোতিঃ বুদ্ধিমান্ লোকদের পক্ষেও যদি অতিমাত্রায় প্রখর বোধ হয়, তাঁরা যদি তা সহ্য করতে না পারেন, সত্যের বন্যায় যদি তাঁদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তা যাক—যত শীঘ্র যায়, ততই ভাল। ছেলেমানুষী ভাব সব শিশুদের ও বুনো অসভ্যদেরই শোভা পায়; কিন্তু দেখা যায়, ঐসব ভাল কেবল শিশুমহলে বা জঙ্গলেই আবদ্ধ নয়, ঐ-সকল ভাবের অনেকগুলি ধর্মপ্রচারকের আসনেও উঠেছে।
আধ্যাত্মিক উন্নতিলাভ হ’লে আর সম্প্রদায়ের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা খারাপ। তা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতার মুক্ত বাতাসে দেহপাত কর।
উন্নতি যা কিছু, তা এই ব্যবহারিক বা আপেক্ষিক জগতেই হয়ে থাকে। মানবদেহেই সর্বশ্রেষ্ঠ দেহ এবং মানুষই সর্বোচ্চ প্রাণী, কারণ এই মানবদেহে এই জন্মেই আমরা এই আপেক্ষিক জগতের সম্পূর্ণরূপে বাইরে যেতে পারি, সত্যসত্যই মুক্তির অবস্থা লাভ করতে পারি, আর ঐ মুক্তিই আমাদের চরম লক্ষ্য। শুধু যে আমরা পারি তা নয়,
অনেকে সত্যসত্যই ইহজীবনে মুক্তাবস্থা লাভ করেছেন, পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন। সুতরাং কেউ এ দেহ ত্যাগ ক’রে যতই সূক্ষ্ম—সূক্ষ্মতর দেহ লাভ করুক, সে তখনও এই আপেক্ষিক জগতের ভিতরই রয়েছে, সে আর আমাদের চেয়ে বেশী কিছু করতে পারে না, কারণ মুক্তিলাভ করা ছাড়া আর কি উচ্চাবস্থা লাভ করা যেতে পারে।
দেবতারা(angels) কখনও কোন অন্যায় কাজ করেন না, কাজেই তাঁরা শাস্তিও পান না; সুতরাং তাঁরা মুক্ত হতেও পারেন না। সংসারের ধাক্কাই আমাদের জাগিয়ে দেয়, এই জগৎস্বপ্ন ভঙাবার সাহায্য করে। ঐরূপ ক্রমাগত আঘাতই এই জগতের অসম্পূর্ণতা বুঝিয়ে দেয়, আমাদের এ সংসার থেকে পালাবার—মুক্তিলাভ করবার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে দেয়, এই জগৎস্বপ্ন ভাঙাবার সাহায্য করে। ঐরূপ ক্রমাগত আঘাতই এই জগতের অসম্পূর্ণতা বুঝিয়ে দেয়, আমাদের এ সংসার থেকে পালাবার—মুক্তিলাভ করবার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে দেয়।”
- স্বামী বিবেকানন্দ
----------------------------------------------------
[ বাণী ও রচনা, ৪র্থ খন্ড]
====================================

আজ কথা হবে মহাতীর্থ অমরনাথ নিয়ে। স্বামী বিবেকানন্দও অমরনাথ দর্শন করতে গিয়েছিলেন যেমন আজও লক্ষাধিক লোক প্রতিবছর যায়। অমরনাথ নিয়ে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি হয়ত অনেকেই জানেন। তাই সে আলোচনায় যাবনা। এই পোস্টে শুধু কিছু তথ্য উইকিপিডিয়া থেকে সরাসরি তুলে ধরা হচ্ছে।
-------------------------------------------------------------
অমরনাথ মন্দির
অমরনাথ গুহা একটি হিন্দু তীর্থক্ষেত্র যা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত।এটি একটি শৈব তীর্থ। এই গুহাটি সমতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার (১২,৭৫৬ ফুট) [১]উঁচুতে অবস্থিত। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাও শহর অতিক্রম করতে হয়। এই তীর্থ ক্ষেত্রটি হিন্দুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। গুহাটি পাহাড় ঘেরা আর এই পাহাড় গুলো সাদা তুষারে আবৃত থাকে বছরের অনেক মাস ধরে। এমনকি এই গুহার প্রবেশপথও বরফ ঢাকা থাকে।গ্রীষ্মকালে খুব স্বল্প সময়ের জন্য এই দ্বার প্রবেশের উপযোগী হয়। তখন লক্ষ লক্ষ তীর্থ যাত্রী অমরনাথের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অমরনাথের গুহাতে চুইয়ে পড়া জল জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন।
অমরনাথের শিবলিঙ্গ
গুহার ভিতরে ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) ভিতরে গুহার ছাদ থেকে জল ফোটায় ফোটায় চুইয়ে পড়ে।এই চুইয়ে পড়া জলের ধারা খাড়া ভাবে গুহার মেঝে পড়ার সময় জমে গিয়ে শিব লিঙ্গের আকার ধারণ করে।কখনো কখনো ৮ ফুট উঁচুও হয় এই শিব লিঙ্গ।তবে গত কয়েকবছর ধরেই সময়ের আগেই বরফলিঙ্গ গলে যাচ্ছে যা হয়তো উষ্ণায়নের ফল। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-আগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন। তীর্থ যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্যই এই শিব লিঙ্গে পূজা দেয়া।
বৈষ্ণোদেবী
সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের অধিষ্ঠাত্রী বৈষ্ণোদেবী। গুহামন্দিরে দেবীর তিন ভিন্ন রূপ দেখতে পাওয়া যায়। ডানদিকে মহাকালী, বামে মহাসরস্বতী ও মাঝে মহালক্ষ্মী।
পৌরাণিক কাহিনী
পৌরাণিক মতে, পার্বতীকে গোপনে সৃষ্টি রহস্য বোঝাতে নির্জনে পাহাড় কুঁদে গুহা নির্মাণ করেন মহাদেব।
অমরনাথ যাত্রার ইতিহাস
অমরনাথে কবে থেকে তীর্থ যাত্রা শুরু হয় তা জানা যায় না।একটি তথ্যসুত্র থেকে ধারনা করা হয় কিংবদন্তী রাজা আরজরাজা( খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সাল) বরফ নির্মিত শিবলিঙ্গে পূজা দিতেন।ধারনা করা হয় রাণী সূর্যমতি ১১ শতকে অমরনাথের এই ত্রিশুল,বানলিঙ্গ ও অন্যান্য পবিত্র জিনিস উপহার দেন।এছাড়াও পুরাতন বিভিন্ন বই থেকে আরও বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন এসম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়।
অমরনাথের পবিত্র গুহার সন্ধানলাভ
ধারনা করা হয় মধ্যযুগে অমরনাথের কথা মানুষে ভুলে গিয়েছিল কিন্তু ১৫ শতকে তা আবার আবিষ্কৃত হয়। প্রচলিত আছে কাশ্মীর একসময় জলে প্লাবিত হয়ে যায় এবং কাশ্যপ মুনি সে জল নদীর মাধ্যমে বের করে দেন। এরপর ভৃগু মুনি অমরনাথ বা শিবের দেখা পান। এভাবে আবার অমরনাথের প্রচার শুরু হয়। বর্তমানে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ অমরনাথ যাত্রা করে।
তীর্থ যাত্রা
২০১১ সালে ৬৩৪,০০০ ; ২০১২ তে ৬২২,০০০ এবং ২০১৩ তে ৩৫০,০০ তীর্থ যাত্রী অমরনাথ যাত্রা করেন।
যাত্রাপথ এবং তীর্থ যাত্রার নিয়ম
জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাও শহর অতিক্রম করতে হয়।পহেলগাও থেকে অমরনাথ যেতে পাঁচ দিল সময় লাগে। অমরনাথে যাওয়ার জন্য আগে প্রত্যেক যাত্রীর রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। শ্রী অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড (SASB) যাত্রা শুরুর মোটামুটি মাসখানেক আগে যাত্রা শুরুর ও শেষের তারিখ ঘোষণা করে। জম্মু-কাশ্মীর ব্যাঙ্ক থেকে ফর্ম সংগ্রহ করতে হবে। ভরতি করা ফর্মটি ২টি পাসপোর্ট ছবি ও শারীরিক সক্ষমতার ডাক্তারি প্রশংসাপত্র সহ নিকটবর্তী জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের অফিসে জমা দিতে হবে।
যাত্রাপথে সুযোগ-সুবিধা
তীর্থ যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন মন্দির,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন যাত্রা পথে বিনা মুল্যে খাবার,চিকিৎসাসেবা ও বিশ্রামের জন্য তাবু সরবরাহ করে থাকে। মন্দিরের কাছে স্থানীয়রা শত শত তাবুর ব্যবস্থা করে তীর্থযাত্রীদের রাত্রি যাপনের জন্য।[১৩]জম্মু থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কাটরা পর্যন্ত বাস ও ভাড়া গাড়ি চলে। শেষ ১৪ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হয় মন্দিরে। যাঁরা হাঁটতে পারবেন না তাঁদের জন্য রয়েছে ডান্ডি ও ঘোড়ার ব্যবস্থা। কাটরা শহরের ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার থেকে যাত্রা-স্লিপ অর্থাৎ 'পরচি' সংগ্রহ করতে হয়। পুজোর উপকরণ আর নগদ টাকা পয়সা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ নিষেধ। নিকটতম রেলস্টেশন জম্মু। জম্মু থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কাটরায় নিয়মিত বাস যায়। জম্মু বা কাটরা থেকে হেলিকপ্টারেও বৈষ্ণোদেবী ঘুরে আসা যায়। জম্মু থেকে প্রতিদিন ২টি ও কাটরা থেকে ৫টি পবনহংস ফ্লাইট রয়েছে। জম্মু যাওয়ার আগে জেনে নিতে হবে উড়ান চালু আছে কিনা।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ইসলামি জঙ্গি সংগঠন গুলোর হুমকির কারণে বর্তমানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যাত্রীদের জন্য।
যাত্রা পথে মৃত্যু
যাত্রা পথে অনেক যাত্রী বয়স জনিত কারণে অসুস্থ হয়ে মারা যান। ২০১২ সালে ৬২২,০০ যাত্রীর মধ্যে ১৩০ জন তীর্থযাত্রী মারা গিয়েছিলেন।
তীর্থযাত্রা আয়োজনকারী
এই তীর্থ যাত্রা রাজ্য সরকার ও শ্রী অমরনাথ যাত্রা ট্রাস্ট যৌথ ভাবে আয়োজন করে থাকে।
১৯৯০ সালের অমরনাথ যাত্রায় ইসলামি সন্ত্রাসবাদীদের বাধা
১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ইসলামি জঙ্গি সংগঠন গুলোর হুমকির কারণে অমরনাথ যাত্রা বন্ধ ছিল।১৯৯৬ সালে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে আবার অমরনাথ যাত্রা শুরু হয়।
২০০০ সালের মুসলিম জঙ্গিদের হামলা
চার বছর পরে ২০০০ সালে পহেলগাও শহরে অমরনাথ যাত্রীদের উপর মুসলিম জঙ্গিরা ন্যক্কার জনক হামলা চালায়। এতে ৩০ জন মারা যায় যাদের বেশির ভাগ ছিলেন তীর্থ যাত্রী। আর কিছু ছিলেন যাত্রীদের জন্য ঘোড়া সরবরাহকারী যাদেরকে গুলি করে মারা হয়। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এ হামলার জন্য সরাসরি পাকিস্তান ভিত্তিক ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা কে দায়ী করেন।
২০০৮ ভূমিহস্তান্তর বিতর্ক
২৬ মে, ২০০৮ এ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্য সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুসারে শ্রী অমরনাথ স্রাইন বোর্ড কে একশ একর ভূমি দেয়া হবে যেখানে তীর্থ যাত্রীরা অস্থায়ী ক্যাম্প করতে পারবে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কাশ্মীরের মুসলিমরা সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।ফলে রাজ্য সরকার তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।
-----------------------------------------------------------

আধ্যাত্মিক সত্যের একমাত্র প্রমাণ প্রত্যক্ষ করা। প্রত্যককে নিজে নিজে পরীক্ষা ক’রে দেখতে হবে। যদি কোন ধর্মাচার্য বলেন, আমি এই সত্য দর্শন করেছি, কিন্তু তোমরা কোন কালে পারবে না, তাঁর কথায় বিশ্বাস ক’রো না; কিন্তু যিনি বলেন, তোমরাও চেষ্টা করলে দর্শন করতে পারো, কেবল তাঁর কথায় বিশ্বাস করবে। জগতের সকল যুগের সকল দেশের সকল শাস্ত্র সকল সত্যই বেদ। কারণ এই-সব সত্য প্রত্যক্ষ করতে হয়, আর যে কোন মানুষেই ঐ-সব সত্য আবিষ্কার করতে পারে।"
- স্বামী বিবেকানন্দ।
=====================================