Thursday, July 10, 2025

31>শিলং শহরের এক অলৌকিক ঘটনা লেখক: স্বামী ভাস্করানন্দ

 31>শিলং শহরের এক অলৌকিক ঘটনা

লেখক: স্বামী ভাস্করানন্দ

মা সারদা দেবীর করুণাময় আশীর্বাদের এক অমোঘ নিদর্শন::---

ঘটনাটা বহু বছর আগের। আমি তখন বেলুড় মঠে কর্মরত, রামকৃষ্ণ মিশনের সদর দপ্তরে।  একদিন সকালে এক অচেনা ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন।  পরনে ছিল বেশ পরিপাটি পোশাক, বয়সটা পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে।

স্বাভাবিক কুশল বিনিময়ের পর তিনি হঠাৎ বললেন, "আপনি কি কখনো শুনেছেন মা সারদা দেবীর শিষ্য, শিলংয়ের পঞ্চানন ব্রহ্মচারীর কথা?"

আমি একটু ভাবলাম, তারপর বললাম, "হ্যাঁ, বহু বছর আগে এক প্রবীণ সন্ন্যাসী ওঁর কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ওঁর জীবনে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। তবে দুঃখের বিষয়, এখন আমি পুরো ঘটনাটা ঠিক মনে রাখতে পারিনি।"

এই কথা শুনে ভদ্রলোকের চোখে জল এসে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "আমি ওঁরই ছেলে। খুবই অযোগ্য সন্তান। আমার বাবা একজন মহাভক্ত ও সাধু মানুষ ছিলেন।"

আমি তাঁকে বললাম, "তাহলেलP আপনি নিজেই আমাকে বলুন না, কী ঘটেছিল আপনার বাবার সঙ্গে।"

ভদ্রলোক একটু থেমে শুরু করলেন সেই অলৌকিক কাহিনিঃ

ঘটনাটা ১৯১২ সালের, মা সারদা দেবী তখন জীবিত ছিলেন। আর আমার বাবা, পঞ্চানন ব্রহ্মচারী, শিলংয়ে একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সরকার সাময়িকভাবে আসামের রাজধানী শিলং থেকে ঢাকায় সরিয়ে নেয়। ফলে শিলং প্রায় জনমানবহীন হয়ে পড়ে। রাস্তার ধারে অধিকাংশ বাড়ি ফাঁকা। 

বাবার পাড়াতে আশিটার মতো বাড়ি ছিল, তার মধ্যে মাত্র তিনটেতে মানুষ থাকত, বাকি সব ফাঁকা ছিল। এই সুযোগে কিছু উপজাতি ছেলে ওই খালি বাড়িগুলোতে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে, এমনকি কিছু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বাবা তখন নিজের বাড়িতে না থেকে, শিলং শহরের একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ, ভূপাল চন্দ্র বসু রায়বাহাদুরের বিশাল বাড়িতে থাকতেন। মিঃ বসু কলকাতায় ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন এবং অনুরোধ করেছিলেন যেন বাবা তাঁর বাড়ির দেখাশোনা করেন।

একদিন বাবা নিজের পুরোনো বাড়িতে কিছু মেরামতির কাজ করাচ্ছিলেন। তিনজন নেপালি শ্রমিক সেই কাজ করছিল। হঠাৎ বাবার চোখ পড়ল, রাস্তার নীচে একটা বাড়িতে আগুন লেগেছে।

ওই বাড়িটি ছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অধীনে একটা রাজকীয় রাজ্য — বিজনীর রানীর।*  রানীর সম্পত্তি, একটা রাজকীয় বাংলো। ছোট ভবনটা আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল, আর পাশের বড় ভবনটাতে আগুনের শিখা লাফিয়ে পড়ার উপক্রম।

বাবা সময় নষ্ট না করে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে এক বালতি জল এনে এক নেপালি শ্রমিককে দিলেন এবং নিজে ছাদে উঠে গেলেন আগুন নেভাতে। 

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জলটার অনেকখানি ছলকে পড়ে গিয়েছিল, ততক্ষণে আগুন বড় ভবনের খড়ের ছাদে লাফিয়ে পড়েছে। বিশ ফুট উঁচু আগুন বাবাকে ঘিরে ফেলেছে। বাবা বুঝলেন, মৃত্যু আসন্ন।

তিনি তখন প্রাণপণে মা সারদা দেবীর নামে ডাকতে লাগলেন—

"মা! মা! আমাকে রক্ষা করো!"

আর ঠিক তখনই ঘটল অলৌকিক ব্যাপারটা। মা সারদা দেবী যেন আকাশপথে উড়ে এসে তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন। শরীর থেকে বিদ্যুতের মতো আলো ঝলমল করছিল, চোখ দু’টো থেকে অতিমানবিক করুণার ছটা বেরোচ্ছে। তিনি বললেন, “ভয় পেও না, বাছা! আমি এসেছি!”

মা হাত তুলে ইশারা করার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের জ্বলন্ত শক্তি নিস্তেজ হয়ে গেল। বাবা আর কোন আগুনের উত্তাপ অনুভব করলেন না।

এরপর বাবা প্রায় তিন ঘণ্টা জ্ঞান হারিয়ে ছাদের উপর পড়ে ছিলেন। যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন, তখন দেখলেন ছোট বাড়িটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কিন্তু বড় বাড়ির ছাদের একটু খড়ও পোড়েনি!

যখন বাবা ছাদে বসে আছেন, তখন নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নেপালি শ্রমিকরা অবাক হয়ে বলল,

"স্যার, আপনি বেঁচে আছেন! আমরা তো দেখলাম আগুনে আপনি পুড়ে যাচ্ছেন, আর শুধুমাত্র শুনলাম আপনি ‘মা! মা!’ বলে চিৎকার করছেন। তারপর আর কোনও আওয়াজ পাইনি। আমরা ভাবলাম আপনি মারা গেছেন।"

শ্রমিকরা বাবাকে নিচে নামিয়ে আনল। দেখল, শুধু মুখে কয়েকটা ফোস্কা পড়েছে, বাকি শরীরে কোনও ক্ষতি হয় নি।

কয়েকদিনের মধ্যেই বাবার মুখ ভীষণভাবে কালো হতে শুরু করল, চেনা মানুষজনও তাঁকে চিনতে পারছিল না। এক ডাক্তার বন্ধু জানালেন, পোড়া ত্বকের স্তর উঠে গেলে নিচে সাদা দাগ দেখা যাবে, যেন লিউকোডার্মা (শ্বেতী জাতীয় সাদা দাগ) হয়েছে।

এই খবর বাবাকে একটু বিচলিত করল। একদিন খুব ভোরে, মা সারদা দেবী আবার বাবার কাছে এসে-দর্শন দিলেন। বললেন,

"বাছা, তুমি কি মুখের এই রূপে কষ্ট পাচ্ছো? একবার বলো, আমি তোমার মুখ ফের ঠিক করে দেবো।"

বাবা কেঁদে বললেন,

"মা, আমি তোমার কাছে এমন তুচ্ছ কিছু চাইতে পারি না। যদি কিছু চাইতেই হয়, তাহলে আরও মহার্ঘ কিছু চাইবো তোমার কাছ থেকে।"

মা হেসে বললেন,

“যদি তাই হয়, তাহলে আমি নিজেই বলছি—বাংলা বছরের শেষ দিনে, কাছে যে ঝর্ণাটা আছে, সেখানে গিয়ে স্নান করলেই তোমার মুখ আগের মতো হয়ে যাবে।”

বাবা প্রথমে এই কথা কাউকে বলেননি। পরে যখন কথাটা ছড়িয়ে পরল, তখন অনেকে—বিশেষ করে ব্রাহ্ম সমাজের লোকেরা—তামাশা করতে লাগল। কেউ সেটা বিশ্বাস করেনি।

বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন—উনি ব্যর্থ হলে মায়ের নামেই তো লোক হাসবে! তাই শেষ পর্যন্ত স্নান না করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

কিন্তু বাংলা বছরের শেষ দিনে, যেন এক অদৃশ্য শক্তির টানে, বাবা নিজেই ঝর্ণার দিকে রওনা দিয়ে স্নান করে ফিরে এলেন।

দেখলেন, দুজন পরিচিত তাঁর বাড়িতে এসে অপেক্ষা করছে। তারা অবাক হয়ে দেখে, বাবার মুখে আর কোনও দাগ নেই। আগুনে পোড়া মুখ একেবারে আগের মতো সুন্দর!

গভীর আবেগে ভদ্রলোক বললেন,

"এই ছিল আমার বাবার জীবনে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনা। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা এটিকে সত্য ঘটনা হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। পরে আমার বাবা এই গল্পটা তাঁর বন্ধু আচার্য জগদীশ মুখোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে লিখে পাঠান। সেই চিঠি ১৯৩৯ সালে ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

*বিজনী ছিল আসাম রাজ্যের বর্তমান চিরাং জেলার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক রাজ্য, যা ভারত-ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত। এই রাজ্যটি কোচ রাজা চন্দ্রনারায়ণ, যিনি পরবর্তীতে বিজিত নারায়ণ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম থেকেই ‘বিজনী’ নামের উৎপত্তি। ঐ বাড়িটা তখন ফাঁকা পড়ে ছিল, কারণ শহরের অনেক বাড়ির মতোই সেটিও তখন পরিত্যক্ত ছিল।”

এই ছিল শিলংয়ের পঞ্চানন ব্রহ্মচারীর জীবনের এক সত্যিই অসাধারণ ও অলৌকিক ঘটনা, যা মা সারদা দেবীর করুণাময় আশীর্বাদের এক অমোঘ নিদর্শন।

 #মাসারদা #অলৌকিক #সত্য #সনাতন

         【  সংগৃহীত】

==========================


Friday, July 4, 2025

30>স্বামীজির দেহাবসানের তারিখ ৪ ঠা জুলাই ১৯০২

 30>স্বামীজির দেহাবসানের তারিখ ৪ ঠা জুলাই ১৯০২ 



স্বামীজির দেহাবসানের তারিখ ৪ ঠা জুলাই ১৯০২ একশো চর্তুদশ বছর অতিক্রান্ত। তবুও তিনি আজও বিস্ময়কর ভাবে বেঁচে আছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, যেখানে আজও মৃত্যুকে তেমন কোনও স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। বরং বলা হয়, বিদায় দিন থেকেই তো মহামানবদের নতুন করে জন্ম নেওয়া। কৃষ্ণ, বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ তো এই ভাবেই বেঁচে আছেন। কিন্তু আমাদের স্বামীজি যে মাত্র ঊনচল্লিশ বছরের জীবনকে সম্বল করেই যে অমর হয়ে থাকবেন, সেটাও কম আশ্চর্যের কথা নয়। বেলুড়ে জুলাইয়ের রাত নটা বেজে দশ মিনিটে যে সন্ন্যাসী বিনা নোটিশে বিশ্বসংসার থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তাঁর দাপট আজকের বহুবন্দিত বিবেকানন্দের মতন ছিল না। বেলুড় মঠে বিদ্যুৎ না থাকলেও টেলিফোন অবশ্যই ছিল, কিন্তু প্রয়াত বিবেকানন্দ পরের দিন সংবাদ পত্রের শিরোনাম হননি, বিশ্বপ্রধানরাও তাঁর জন্য শোকবার্তা প্রেরণ করেন নি। সব ব্যাপারটাই ছিল নিতান্ত সাধারণ, তাই কালের সংগ্রহে বীর সন্ন্যাসীর ডেথ সার্টিফিকেট নেই, বিদায়কালের কোনও আলোকচিত্র নেই, শেষকৃত্যের স্থান সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিতেও যথেষ্ট দ্বিধা ও বিলম্ব।


সংসারের সমস্ত মায়াবন্ধন ছিন্ন করেও তাঁর সমকালকে স্বামীজি বলতে পেরেছিলেন - ত্যাগভোগ সবই বুদ্ধির বিভ্রম ; ' প্রেম' ' প্রেম' -একমাত্র ধন। এই বিবেকানন্দই তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষ পরেও আশ্চর্য ভাবে বেঁচে আছেন এ দেশের সংখ্যাহীন মানুষের মনে। 


স্বামীজী শুধু ভারতের ছিলেন না তিনি ছিলেন সমগ্র জগতের। নিপীড়িত মানবাত্মার জন্যই তাঁর আবির্ভাব। জীবনের যত সমস্যা মানুষকে বিব্রত করে, সব সমস্যার উপরই তিনি আলোকপাত করেছেন। মানুষকে তিনি দেবতারূপে জ্ঞান করেছেন।


স্বামীজী সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ---- "অল্পদিন পূর্বে বাংলাদেশে যে-মহাত্মার মৃত্যু হইয়াছে, সেই বিবেকানন্দও পূর্ব ও পশ্চিমকে দক্ষিণে ও বামে রাখিয়া মাঝখানে দাঁড়াইতে পারিয়াছিলেন। ভারতনর্ষের ইতিহাসের মধ্যে পাশ্চত্যকে অস্বীকার করিয়া ভারতবর্ষকে সংকীর্ণ সংস্কারের মধ্যে চিরকালের জন্য সঙ্কুচিত করা তাঁহার জীবনের উপদেশ নহে। গ্রহণ করিবার, মিলন করিবার, সৃজন করিবার প্রতিভাই তাঁহার ছিল। তিনি ভারতবর্ষের সাধনাকে পশ্চিমে ও পশ্চিমের সাধনাকে ভারতবর্ষে দিবার ও লইবার পথ রচনার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন। যদি তুমি ভারতকে জানতে চাও, বিবেকানন্দকে জানো। তাঁর মধ্যে সবকিছুই ইতিবাচক, নেতিবাচক কিছু নেই।"


আজকের দিনে মানবকল্যাণে নিবেদিত প্রাণ মহান কর্মযোগী, মানবাত্মার পূজারী এই মহামানব চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম ---


"প্রতিদিন আমি, হে জীবনস্বামী, দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।

করি জোড়কর, হে ভুবনেশ্বর, দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।। "

=========================

29>শ্রীরামকৃষ্ণদেব কেন খাবারের প্রতি এত আসক্ত ছিলেন?

 29>শ্রীরামকৃষ্ণদেব কেন খাবারের প্রতি এত আসক্ত ছিলেন?


কামিনী -কাঞ্চন ত‍্যাগী ব্রহ্ম সাধনায় সিদ্ধ একজন সাধক হয়েও অবতার পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেব কেন এত খেতে ভালোবাসতেন? কেন ঠাকুর খাবারের প্রতি নিজের আসক্তি ত‍্যাগ করেন নি? ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ খাদ‍্যদ্রব‍্যের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিলেন।পছন্দের খাবার রান্নার সুবাস পেলে কিংবা তাঁকে পছন্দের খাবার দেওয়া হলে তিনি একেবারে বালকের  মতো আহ্লাদ প্রকাশ করতেন।কোনো লোকসমাজের পরোয়া করতেন না। খাবারের প্রতি ঠাকুরের এই অত‍্যাধিক আগ্রহের কারণে মা সারদা অনেক সময় বিব্রত বোধ করতেন। এমনকি দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের উপদেশ দিতে দিতেও তিনি মাঝে মধ‍্যে মায়ের ঘরে কী রান্না হচ্ছে তাই দেখতে চলে যেতেন।ঘনিষ্ঠ ভক্তরা এ নিয়ে  প্রশ্ন করলে ঠাকুর এক মায়াময় হাসি হেসে ভক্তদের দিকে চেয়ে নীরব থাকতেন কিংবা অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতেন।একদিন মা সারদা এরকম একটি ঘটনায় লজ্জিত হয়ে ঠাকুরকে প্রশ্ন করেছিলেন,” ঠাকুর আপনি খাবারের ব‍্যাপারে এমনটি কেন করেন? আমি এতে লজ্জিত হই মাঝে মাঝে,বিশেষ করে ভক্ত সন্তানদের সম্মুখে।মায়ের এই কথা শুনে ঠাকুর বলেছিলেন, “আমার প্রারদ্ধ কর্ম শেষ হয়ে গেছে। তাই খাবারকে আঁকড়ে ধরে আছি।যেদিন ছেড়ে দেব সেদিন চলে যাবো।” এই কথা শুনে শ্রীমা ভাবলেন ঠাকুর নিশ্চয়ই তাঁকে আসল কারণটা বলছেন না। মায়ের মনের ভাব আন্দাজ করে ঠাকুর বললেন, “ দেখো , তুমি এখন আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছো না কিন্তু একদিন করবে।যেদিন তুমি আমার জন্য খাবার আনবে, আর আমি খাবারের দিকে না তাকিয়ে অন‍্যদিকে তাকিয়ে থাকবো সেদিন জানবে আমার আর তিনদিন বাকি।মা সারদার মনে সংশয় রয়েই গেলো। এই ঘটনার পর সাত বছর কেটে যায় । একদিন কাশীপুরে শ্রীমা ঠাকুরের জন্য খাবার নিয়ে গেলেন । ঠাকুর দরজার দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিলেন।শ্রীমা খাবারের থালা হাতে ঘরে ঢোকা মাত্রই ঠাকুর অন‍্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।তিনি আর খাবেন না। শ্রীমা বিস্মিত হলে ঠাকুর বললেন, “অনেকদিন আগে আমি তোমায় কিছু কথা বলেছিলাম মনে করো ।তখন শ্রীমার মনে পড়ল সাত বছর আগের ঠাকুরের সেই বক্তব্য।শ্রীমা কেঁপে উঠলেন। এর ঠিক তিনদিন পর ঠাকুর চিরকালের মতো পার্থিব দেহ ত‍্যাগ করে চলে গেলেন।আসলে পরমব্রহ্ম ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতিদিন নিজের মনের মধ‍্যে খাবারের প্রতি এই আগ্রহ তৈরী করতেন।কারণ ঠাকুর জানতেন নিজের মনের মধ‍্যে এই ইচ্ছে তৈরী না করলে তাঁর আত্মা দেহে থাকবে না, মুক্ত হয়ে যাবে।তাই আত্মাকে দেহের মধ‍্যে ধরে রাখতে অবতার পুরুষ ঠাকুর ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন কাণ্ড ঘটাতেন।  

=======================

28>| দি ব্য বা ণী || স্বামী বিবেকানন্দ

 28>| দি ব্য বা ণী || স্বামী বিবেকানন্দ

 

_জগৎটা আমার জন্য, আমি কখনও জগতের জন্য নই। ভাল-মন্দ আমাদের দাসস্বরূপ, আমরা কখনও তাদের দাস নই।_

             _*পশুর স্বভাব –উন্নতি করা নয়, বরং যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায় পড়ে থাকা। মানুষের স্বভাব– মন্দ ত্যাগ করে ভালটা পাবার চেষ্টাকরা। আর দেবতার স্বভাব –ভাল-মন্দ কিছুর জন্য চেষ্টা থাকবে না, সর্বদা সর্বাবস্থায় আনন্দময় হয়ে থাকা। আমাদের দেবতা হতে হবে।*_

             _*হৃদয়টাকে সমুদ্রের মতো মহান করে ফেলো। সাংসারিক তুচ্ছতার পারে চলে যাও। এমনকি অশুভ এলেও আনন্দে উন্মত্ত হয়ে যাও।*_ 


_*স্বামী বিবেকানন্দ*_

*==============*

*তথ্যসূত্রঃ* স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা,৪র্থ খন্ড।


Wednesday, May 7, 2025

27>| | জপ-ধ্যান, স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ||

  

 27>|| জপ-ধ্যান, স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ||


জপ-ধ্যান- সাধন-ভজন, নমে মনে,

 সব কাজকর্ম করতে হবে এক সাথে

প্রথম দিকে কষ্ট করে একটু খাটতে হবে

ছাড়া যায়না একবার তাঁর আস্বাদ পেলে।


প্রথম বয়সে খেটেখুটে তাঁর আস্বাদ পেতে হয়। 

একবার যে আস্বাদ পেয়েছে সে আর যায় কোথায় ? 

তার ধড় থেকে মাথা নামিয়ে নিলেও সে আর তাঁকে ছাড়তে পারে না।


ঠিকঠিক সাধক কী রকম জানিস ? মশারির ভিতর শুয়েছে, সকলে মনে করছে ঘুমুচ্ছে, সে কিন্তু সারারাত ধ্যান জপে কাটিয়েছে। 

সকালে যখন উঠল, সকলে জানল সে ঘুম থেকে উঠল।


সাধন-ভজন ঢাক পিটে করবার জিনিস নয়–তাতে অনিষ্ট হয়। নানা লোকে নানা কথা বলে ঠাট্টা করে। আবার এটা ঠিক নয়, ওটা ঠিক নয়, এসব বলে নানা ভাবে উপদেশ দিয়ে মনকে চঞ্চল করে তোলে, সাধনার বিঘ্ন করে।


অনেক সময় আমার মনে হয়, যারা ঘুমের জন্য বড় কাতর হয় তারা যদি প্রথম প্রথম দিনে ঘুমিয়ে নিয়ে রাতে জাগে, সেও ভাল। সাধন-ভজনের সুন্দর সময় সন্ধিক্ষণ ও নিশীথ রাত। মানুষ সাধারণত সেই সময়টা বাজে নষ্ট করে।


দিনের বেলায় নানারকম গোলমাল থাকে, মনকে একটু স্থির করতে গেলে নানারকম গোলমাল এসে চঞ্চল করে দেয়। রাতে প্রকৃতি বেশ শান্ত। জীবজন্তুরা সব অসাড়ে ঘুমায়–সাধনার পক্ষে এই উপযুক্ত সময়। গভীর রাতে ধ্যান জপ অল্পেতেই জমে ওঠে।


ঠাকুর বলতেন– 'দিনে বারুদ-ঠাসা খা, রাতে কম খাবি'। দিনের বেলা পেট ভর্তি খাও, হজম হবে। রাতে কম করে খেলে শরীরটা বেশ হালকা থাকবে।

ধ্যান-ভজনের বেশ সুবিধা হবে। রাতে ভরপেট খেলে আলস্য বাড়বে, কেবল ঘুমোবার ইচ্ছা হবে। রাতে ঘুমিয়ে কাটাবি, না ভজন করবি?


দেখ বাবা, তোদের মুখে ওসব কথা শোভা পায় না। তোরা সাধু-ব্রহ্মচারী লোক, তোদের ভিতর ব্রহ্মচর্যের একটা শক্তি রয়েছে। তোদের ধ্যান-ভজন, কাজকর্ম সব এক সাথে করতে হবে। 'এটা করে ওটা পারিনে― ও তো গৃহস্থের কথা'।


আমার ধারণা তোদের ভজনে স্পৃহা নেই―কেবল কাজকর্ম, হইচই ও আড্ডা দিয়ে সময় কাটাস, আর মুখে বলিস, ধ্যান-ভজনের সময় পাই না। প্রথম প্রথম না হয় কিছু খাটাখাটুনি হয়, বরাবর তো সে রকম থাকে না ? তখন সাধন-ভজন করিসনে কেন ? তোদের ওসব কথা বলতে লজ্জা হয় না ?

স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ।।

===========================