31>শিলং শহরের এক অলৌকিক ঘটনা
লেখক: স্বামী ভাস্করানন্দ
মা সারদা দেবীর করুণাময় আশীর্বাদের এক অমোঘ নিদর্শন::---
ঘটনাটা বহু বছর আগের। আমি তখন বেলুড় মঠে কর্মরত, রামকৃষ্ণ মিশনের সদর দপ্তরে। একদিন সকালে এক অচেনা ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। পরনে ছিল বেশ পরিপাটি পোশাক, বয়সটা পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে।
স্বাভাবিক কুশল বিনিময়ের পর তিনি হঠাৎ বললেন, "আপনি কি কখনো শুনেছেন মা সারদা দেবীর শিষ্য, শিলংয়ের পঞ্চানন ব্রহ্মচারীর কথা?"
আমি একটু ভাবলাম, তারপর বললাম, "হ্যাঁ, বহু বছর আগে এক প্রবীণ সন্ন্যাসী ওঁর কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ওঁর জীবনে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। তবে দুঃখের বিষয়, এখন আমি পুরো ঘটনাটা ঠিক মনে রাখতে পারিনি।"
এই কথা শুনে ভদ্রলোকের চোখে জল এসে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "আমি ওঁরই ছেলে। খুবই অযোগ্য সন্তান। আমার বাবা একজন মহাভক্ত ও সাধু মানুষ ছিলেন।"
আমি তাঁকে বললাম, "তাহলেलP আপনি নিজেই আমাকে বলুন না, কী ঘটেছিল আপনার বাবার সঙ্গে।"
ভদ্রলোক একটু থেমে শুরু করলেন সেই অলৌকিক কাহিনিঃ
ঘটনাটা ১৯১২ সালের, মা সারদা দেবী তখন জীবিত ছিলেন। আর আমার বাবা, পঞ্চানন ব্রহ্মচারী, শিলংয়ে একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সরকার সাময়িকভাবে আসামের রাজধানী শিলং থেকে ঢাকায় সরিয়ে নেয়। ফলে শিলং প্রায় জনমানবহীন হয়ে পড়ে। রাস্তার ধারে অধিকাংশ বাড়ি ফাঁকা।
বাবার পাড়াতে আশিটার মতো বাড়ি ছিল, তার মধ্যে মাত্র তিনটেতে মানুষ থাকত, বাকি সব ফাঁকা ছিল। এই সুযোগে কিছু উপজাতি ছেলে ওই খালি বাড়িগুলোতে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে, এমনকি কিছু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
বাবা তখন নিজের বাড়িতে না থেকে, শিলং শহরের একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ, ভূপাল চন্দ্র বসু রায়বাহাদুরের বিশাল বাড়িতে থাকতেন। মিঃ বসু কলকাতায় ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন এবং অনুরোধ করেছিলেন যেন বাবা তাঁর বাড়ির দেখাশোনা করেন।
একদিন বাবা নিজের পুরোনো বাড়িতে কিছু মেরামতির কাজ করাচ্ছিলেন। তিনজন নেপালি শ্রমিক সেই কাজ করছিল। হঠাৎ বাবার চোখ পড়ল, রাস্তার নীচে একটা বাড়িতে আগুন লেগেছে।
ওই বাড়িটি ছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অধীনে একটা রাজকীয় রাজ্য — বিজনীর রানীর।* রানীর সম্পত্তি, একটা রাজকীয় বাংলো। ছোট ভবনটা আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল, আর পাশের বড় ভবনটাতে আগুনের শিখা লাফিয়ে পড়ার উপক্রম।
বাবা সময় নষ্ট না করে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে এক বালতি জল এনে এক নেপালি শ্রমিককে দিলেন এবং নিজে ছাদে উঠে গেলেন আগুন নেভাতে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জলটার অনেকখানি ছলকে পড়ে গিয়েছিল, ততক্ষণে আগুন বড় ভবনের খড়ের ছাদে লাফিয়ে পড়েছে। বিশ ফুট উঁচু আগুন বাবাকে ঘিরে ফেলেছে। বাবা বুঝলেন, মৃত্যু আসন্ন।
তিনি তখন প্রাণপণে মা সারদা দেবীর নামে ডাকতে লাগলেন—
"মা! মা! আমাকে রক্ষা করো!"
আর ঠিক তখনই ঘটল অলৌকিক ব্যাপারটা। মা সারদা দেবী যেন আকাশপথে উড়ে এসে তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন। শরীর থেকে বিদ্যুতের মতো আলো ঝলমল করছিল, চোখ দু’টো থেকে অতিমানবিক করুণার ছটা বেরোচ্ছে। তিনি বললেন, “ভয় পেও না, বাছা! আমি এসেছি!”
মা হাত তুলে ইশারা করার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের জ্বলন্ত শক্তি নিস্তেজ হয়ে গেল। বাবা আর কোন আগুনের উত্তাপ অনুভব করলেন না।
এরপর বাবা প্রায় তিন ঘণ্টা জ্ঞান হারিয়ে ছাদের উপর পড়ে ছিলেন। যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন, তখন দেখলেন ছোট বাড়িটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কিন্তু বড় বাড়ির ছাদের একটু খড়ও পোড়েনি!
যখন বাবা ছাদে বসে আছেন, তখন নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নেপালি শ্রমিকরা অবাক হয়ে বলল,
"স্যার, আপনি বেঁচে আছেন! আমরা তো দেখলাম আগুনে আপনি পুড়ে যাচ্ছেন, আর শুধুমাত্র শুনলাম আপনি ‘মা! মা!’ বলে চিৎকার করছেন। তারপর আর কোনও আওয়াজ পাইনি। আমরা ভাবলাম আপনি মারা গেছেন।"
শ্রমিকরা বাবাকে নিচে নামিয়ে আনল। দেখল, শুধু মুখে কয়েকটা ফোস্কা পড়েছে, বাকি শরীরে কোনও ক্ষতি হয় নি।
কয়েকদিনের মধ্যেই বাবার মুখ ভীষণভাবে কালো হতে শুরু করল, চেনা মানুষজনও তাঁকে চিনতে পারছিল না। এক ডাক্তার বন্ধু জানালেন, পোড়া ত্বকের স্তর উঠে গেলে নিচে সাদা দাগ দেখা যাবে, যেন লিউকোডার্মা (শ্বেতী জাতীয় সাদা দাগ) হয়েছে।
এই খবর বাবাকে একটু বিচলিত করল। একদিন খুব ভোরে, মা সারদা দেবী আবার বাবার কাছে এসে-দর্শন দিলেন। বললেন,
"বাছা, তুমি কি মুখের এই রূপে কষ্ট পাচ্ছো? একবার বলো, আমি তোমার মুখ ফের ঠিক করে দেবো।"
বাবা কেঁদে বললেন,
"মা, আমি তোমার কাছে এমন তুচ্ছ কিছু চাইতে পারি না। যদি কিছু চাইতেই হয়, তাহলে আরও মহার্ঘ কিছু চাইবো তোমার কাছ থেকে।"
মা হেসে বললেন,
“যদি তাই হয়, তাহলে আমি নিজেই বলছি—বাংলা বছরের শেষ দিনে, কাছে যে ঝর্ণাটা আছে, সেখানে গিয়ে স্নান করলেই তোমার মুখ আগের মতো হয়ে যাবে।”
বাবা প্রথমে এই কথা কাউকে বলেননি। পরে যখন কথাটা ছড়িয়ে পরল, তখন অনেকে—বিশেষ করে ব্রাহ্ম সমাজের লোকেরা—তামাশা করতে লাগল। কেউ সেটা বিশ্বাস করেনি।
বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন—উনি ব্যর্থ হলে মায়ের নামেই তো লোক হাসবে! তাই শেষ পর্যন্ত স্নান না করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু বাংলা বছরের শেষ দিনে, যেন এক অদৃশ্য শক্তির টানে, বাবা নিজেই ঝর্ণার দিকে রওনা দিয়ে স্নান করে ফিরে এলেন।
দেখলেন, দুজন পরিচিত তাঁর বাড়িতে এসে অপেক্ষা করছে। তারা অবাক হয়ে দেখে, বাবার মুখে আর কোনও দাগ নেই। আগুনে পোড়া মুখ একেবারে আগের মতো সুন্দর!
গভীর আবেগে ভদ্রলোক বললেন,
"এই ছিল আমার বাবার জীবনে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনা। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা এটিকে সত্য ঘটনা হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। পরে আমার বাবা এই গল্পটা তাঁর বন্ধু আচার্য জগদীশ মুখোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে লিখে পাঠান। সেই চিঠি ১৯৩৯ সালে ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
*বিজনী ছিল আসাম রাজ্যের বর্তমান চিরাং জেলার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক রাজ্য, যা ভারত-ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত। এই রাজ্যটি কোচ রাজা চন্দ্রনারায়ণ, যিনি পরবর্তীতে বিজিত নারায়ণ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম থেকেই ‘বিজনী’ নামের উৎপত্তি। ঐ বাড়িটা তখন ফাঁকা পড়ে ছিল, কারণ শহরের অনেক বাড়ির মতোই সেটিও তখন পরিত্যক্ত ছিল।”
এই ছিল শিলংয়ের পঞ্চানন ব্রহ্মচারীর জীবনের এক সত্যিই অসাধারণ ও অলৌকিক ঘটনা, যা মা সারদা দেবীর করুণাময় আশীর্বাদের এক অমোঘ নিদর্শন।
#মাসারদা #অলৌকিক #সত্য #সনাতন
【 সংগৃহীত】
==========================
No comments:
Post a Comment