Tuesday, November 2, 2021

1>ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব,

1>ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব,

ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৬ – ১৬ই আগস্ট, ১৮৮৬; পূর্বাশ্রমের নাম গদাধর চট্টোপাধ্যায়) ঊনবিংশ শতকের একজন প্রখ্যাতনামা বাঙালি যোগসাধক তিনি ছিলেন দার্শনিক ও ধর্মগুরু।

তাঁর প্রচারিত ধর্মীয় চিন্তাধারায় রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।
ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ওস্বামী বিবেকানন্দ, উভয়েই বঙ্গীয় নবজাগরণের এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর হিন্দু নবজাগরণের অন্যতম পুরোধাব্যক্তিত্ব।
ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ শিষ্যসমাজে, এমনকি তাঁর আধুনিক ভক্তসমাজেও তিনি ঈশ্বরের অবতাররূপে পূজিত হন।
রামকৃষ্ণ পরমহংস গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গের এক দরিদ্র বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

রানী রাসমণি নির্মিত দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে পৌরোহিত্য গ্রহণের পর তিনি কালীর আরাধনা শুরু করেন।
তাঁর প্রথম তন্ত্র গুরু ও বৈষ্ণবীয় ভক্তিতত্ত্বজ্ঞা এক সাধিকা।

পরবর্তীকালে অদ্বৈত বেদান্ত মতে সাধনা করে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন রামকৃষ্ণ।
অন্যান্য ধর্মীয় মতে, বিশেষত ইসলাম ও খ্রিস্টীয় মতে সাধনা তাঁকে “যত মত, তত পথ” উপলব্ধির জগতে উন্নীত করে।পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক গ্রামীণ উপভাষায় ছোটো ছোটো গল্পের মাধ্যমে তাঁর দেওয়া ধর্মীয় শিক্ষা সাধারণ জনমানসে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে অশিক্ষিত হলেও রামকৃষ্ণ বাঙালি বিদ্বজ্জন সমাজ ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সম্ভ্রম অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন।

১৮৭০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের নিকট তিনি হয়ে ওঠেন হিন্দু পুনর্জাগরণের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
তাঁর সংগঠিত একদল অনুগামী, যাঁরা ১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর সন্ন্যাস গ্রহণ করে তাঁর কাজ চালিয়ে যান। এঁদেরই নেতা ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় বিবেকানন্দ তাঁর ধর্মীয় চিন্তাধারাকে পাশ্চাত্যের জনসমক্ষে উপনীত করেন। বিবেকানন্দ যে বিশ্বমানবতাবাদের বার্তা প্রেরণ করে তা সর্বত্র সমাদৃত হয় এবং তিনিও সকল সমাজের সমর্থন অর্জন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু দর্শনের সার্বজনীন সত্য প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এরপর প্রতিষ্ঠা করেন বেদান্ত সোসাইটি এবং ভারতে রামকৃষ্ণের ধর্মীয় সমন্বয়বাদ ও “শিবজ্ঞানে জীবসেবা”র আদর্শ বাস্তবায়িত করার জন্য স্থাপনা করেন রামকৃষ্ণ মিশন নামে একটি ধর্মীয় সংস্থা।রামকৃষ্ণ আন্দোলন ভারতের অন্যতম নবজাগরণ আন্দোলনরূপে বিবেচিত হয়। ২০০৮ সালে ভারত ও বহির্ভারতে রামকৃষ্ণ মিশনের মোট ১৬৬টি শাখাকেন্দ্র বিদ্যমান। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার বেলুড় মঠে অবস্থিত।


জীবনী

জন্ম ও শৈশব

কামারপুকুর গ্রামের এই ছোটো কুটিরে রামকৃষ্ণ পরমহংস বাস করতেন (কেন্দ্রে)। বামে পারিবারিক ঠাকুরঘর, ডানে জন্মস্থল যার উপর বর্তমানে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরটি স্থাপিত।

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমায় অবস্থিত কামারপুকুর গ্রামে ১৮৩৬ সালে এক দরিদ্র ধর্মনিষ্ঠ রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্ম হয়।
পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এবং মা চন্দ্রমণি দেবীর চতুর্থ ও শেষ সন্তান।
কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের পূর্বে তাঁর পিতামাতার সম্মুখে বেশ কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। সন্তানসম্ভবা চন্দ্রমণি দেবী দেখেছিলেন শিবলিঙ্গ থেকে নির্গত একটি জ্যোতি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করছে। তাঁর জন্মের অব্যবহিত পূর্বে গয়ায় তীর্থভ্রমণে গিয়ে ক্ষুদিরাম গদাধর বিষ্ণুকে স্বপ্নে দর্শন করেন। সেই কারণে তিনি নবজাতকের নাম রাখেন গদাধর।
শৈশবে গদাই নামে পরিচিত গদাধর তাঁর গ্রামবাসীদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। অঙ্কন ও মাটির প্রতিমা নির্মাণে তাঁর ছিল সহজাত দক্ষতা। যদিও প্রথাগত শিক্ষায় তাঁর আদৌ মনযোগ ছিল না। সেযুগে ব্রাহ্মণসমাজে প্রচলিত সংস্কৃত শিক্ষাকে তিনি “চালকলা-বাঁধা বিদ্যা” (অর্থাৎ পুরোহিতের জীবিকা-উপার্জনী শিক্ষা) বলে উপহাস করেন এবং তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। তবে পাঠশালার শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাঁর ঔদাসিন্য থাকলেও নতুন কিছু শিখতে তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না। গানবাজনা, কথকতা ও ধর্মীয় উপাখ্যান অবলম্বনে যাত্রাভিনয়ে তিনি অনায়াসে পারদর্শিতা অর্জন করেন।
গদাধর নিজে,তীর্থযাত্রী, সন্ন্যাসী এবং গ্রাম্য পুরাণকথকদের কথা শুনে অতি অল্প বয়সেই পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতে বুৎপত্তি অর্জন করেন ।
মাতৃভাষা বাংলায় তাঁর অক্ষরজ্ঞান ছিল; কিন্তু সংস্কৃত অনুধাবনে সক্ষম হলেও সেই ভাষা তিনি বলতে পারতেন না।
সন্ন্যাসীদের সেবাযত্ন করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় বিতর্ক মন দিয়ে শুনতেন গদাধর।
১৮৪৩ সালে পিতৃবিয়োগের পর পরিবারের ভার গ্রহণ করেন তাঁর অগ্রজ রামকুমার। এই ঘটনা গদাধরের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ধর্মীয় জীবনযাপনের ইচ্ছা তাঁর মনে দৃঢ় হয়। পিতার অভাব তাঁকে মায়ের খুব কাছে নিয়ে আসে; ঘরের কাজ ও গৃহদেবতার পূজাপাঠে তিনি অধিকতর সময় ব্যয় করতে থাকেন; আত্মমগ্ন হয়ে থাকেন ধর্মীয় মহাকাব্য পাঠে।

গদাধর যখন কিশোর, তখন তাঁর পরিবারের আর্থিক সংকট দেখা দেয়। রামকুমার কলকাতায় একটি সংস্কৃত টোল খোলেন ও পুরোহিতের বৃত্তি গ্রহণ করেন। ১৮৫২ সালে দাদাকে পৌরোহিত্যে সহায়তা করার জন্য গদাধর কলকাতায় আসেন।

১৮৫৫ সালে রানি রাসমণি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা করলে রামকুমার সেই মন্দিরে প্রধান পুরোহিতের পদ গ্রহণ করেন। নিম্নবর্ণীয়া এক নারীর প্রতিষ্ঠিত মন্দির হওয়া সত্ত্বেও সামান্য অনুরোধেই গদাধর সেই মন্দিরে চলে আসেন। তিনি ও তাঁর ভাগনে হৃদয়রাম রামকুমারের সহকারী হিসাবে প্রতিমার সাজসজ্জার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৫৬ সালে রামকুমারের মৃত্যু হলে গদাধর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। মন্দিরে উত্তর-পশ্চিম আঙিনায় তাঁকে একটি ছোটো ঘর দেওয়া হয়।
এই ঘরে থেকেই তিনি মন্দিরের পূজা কার্য করতেন।

রাণী রাসমণির জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাস, যিনি মথুরবাবু নামে পরিচিত ছিলেন, তিনিই গদাধরকে রামকৃষ্ণ নামটি দিয়েছিলেন।অন্য মতে, এই নামটি তাঁর অন্যতম গুরু তোতাপুরীর দেওয়া।

রামকুমারের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণের ভাবতন্ময়তা বৃদ্ধি পায়। কালীকে তিনি মা ও বিশ্বজননীভাবে প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেন। এই সময় দেবীর প্রত্যক্ষ রূপ দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস পাষাণপ্রতিমা জীবন্ত হয়ে অন্নগ্রহণ করতে শুরু করে। পূজা করতে করতে দেবীর দর্শন না পেয়ে তিনি চিৎকার করে কেঁদে উঠতে থাকেন। রাত্রিকালে নিকটবর্তী জঙ্গলে গিয়ে বস্ত্র ও উপবীত ত্যাগ করে নির্জনে ধ্যান করতেও শুরু করেন। কেউ কেউ বলতে থাকে যে তিনি পাগল হয়ে গেছেন, আবার কেউ বলেন তিনি ঈশ্বরের প্রেমে আকুল হয়েছেন।

একদিন অস্থিরতার বশে তিনি সংকল্প করেন দেবীর দর্শন না পেলে জীবন বিসর্জন দেবেন। দেওয়াল থেকে খড়্গ তুলে নিয়ে তিনি গলায় কোপ বসাবেন, এমন সময় অকস্মাৎ সমগ্র কক্ষ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর প্রথম কালীদর্শনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা নিম্নরূপ,

"সহসা মার অদ্ভুত দর্শন পাইলাম ও সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলাম! তাহার পর বাহিরে কি যে হইয়াছে, কোন্ দিক দিয়া সেদিন ও তৎপরদিন যে গিয়াছে, তাহার কিছুই জানিতে পারি নাই! অন্তরে কিন্তু একটা অননুভূত জমাট-বাঁধা আনন্দের স্রোত প্রবাহিত ছিল এবং মার সাক্ষাৎ প্রকাশ উপলব্ধি করিয়াছিলাম!...ঘর, দ্বার, মন্দির সব যেন কোথায় লুপ্ত হইল – কোথাও যেন আর কিছুই নাই! আর দেখিতেছি কি, এক অসীম অনন্ত চেতন জ্যোতিঃ-সমুদ্র! – যেদিকে যতদূর দেখি, চারিদিক হইতে তার উজ্জ্বল ঊর্মিমালা তর্জন-গর্জন করিয়া গ্রাস করিবার জন্য মহাবেগে অগ্রসর হইতেছে! দেখিতে দেখিতে উহারা আমার উপর নিপতিত হইল এবং আমাকে এককালে কোথায় তলাইয়া দিল! হাঁপাইয়া হাবুডুবু খাইয়া সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলাম।"

উক্ত ঘটনার পর শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর নিকট সম্পূর্ণত নিজেকে সমর্পণ করেন। কি সাধারণ, কি দার্শনিক – সকল ক্ষেত্রেই বালকসুলভ আনুগত্য নিয়ে তিনি দেবীর নিকট প্রার্থনা নিবেদন করতে শুরু করেন। রাণী রাসমণি ও তাঁর জামাতা মথুরবাবু যদিও পরম স্নেহবশত তাঁকে তাঁর ইচ্ছামতো পূজার অনুমতি দিয়েছিলেন।

সাধনা

বিবাহের পর শ্রীরামকৃষ্ণ কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করে পুণরায় মন্দিরের কাজ গ্রহণ করেন। তবে ভাবতন্ময়তা কাটার পরিবর্তে তাঁর অধ্যাত্ম-পিপাসা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলতেন “টাকা মাটি, মাটি টাকা”।

এক সময়ে তিনি নিদ্রারহিত হলেন। ফলে মন্দিরের কাজকর্ম তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ল। চিকিৎসকগণ আহূত হলেন। কিন্তু তাঁদের একজন বললেন যে রোগীর এই অবস্থার কারণ আধ্যাত্মিক উত্তেজনা। কোনও ঔষধ একে সুস্থ করতে সক্ষম নয়।

ভৈরবী ব্রাহ্মণী ও তন্ত্রসাধনা

১৮৬১ সালে ভৈরবী ব্রাহ্মণী নামে গৈরিক বস্ত্র পরিহিতা এক যোগিনী দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল যোগেশ্বরী এবং বয়স ছিল চল্লিশের কাছাঁকাছি। দক্ষিণেশ্বরে আগমনের পূর্বে তাঁর জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। তবে তিনি ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞা ও তন্ত্র ও বৈষ্ণব সাধনে সিদ্ধা।
শ্রীরামকৃষ্ণ ভৈরবীর কাছে তাঁর ভাবতন্ময়তা ও দৈহিক পীড়ার বর্ণনা দিলেন। ভৈরবী তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি পাগল হয়ে যাননি; বরং আধ্যাত্মিক ‘মহাভাব’ তাঁকে আশ্রয় করেছে। এই মহাভাবের বশেই তিনি দিব্যপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন ভক্তিশাস্ত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখালেন রাধা ও চৈতন্য মহাপ্রভুরও একই ভাব উপস্থিত হয়েছিল। ভৈরবী তাঁর দৈহিক পীড়া অবসানের নিদানও দিলেন।
ভৈরবীর পথনির্দেশনায় শ্রীরামকৃষ্ণ তন্ত্রমতে সাধনা শুরু করলেন। এই সাধনায় তাঁর সমস্ত শারীরিক ও মানসিক পীড়ার উপশম হল। ভৈরবীর সহায়তায় তিনি তন্ত্রোল্লেখিত ৬৪ প্রকার প্রধান সাধন অভ্যাস করলেন। জপ ও পুরশ্চরণের মতো মন্ত্রসাধনায় চিত্ত শুদ্ধ করে পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ স্থাপন করলেন। তন্ত্রসাধনায় সাধারণত বামাচারের মতো ধর্মবিরোধী পন্থাও অভ্যাস করতে হয়; যার মধ্যে মাংস ও মৎস্য ভক্ষণ, মদ্যপান ও যৌনাচারও অন্তর্ভুক্ত। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর জীবনীকারগণের কথা থেকে জানা যায়, শেষোক্ত দুটি তিনি অভ্যাস করেননি, শুধুমাত্র সেগুলির চিন্তন করেই কাঙ্খিত সাধনফল লাভ করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বামাচারকে একটি জ্ঞানমার্গ বলে উল্লেখ করলেও, অন্যদের এই পথে সাধন করতে নিষেধ করতেন। পরে তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ যখন তাঁকে বামাচার সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তিনি বলেন, “(এই পথ) বড় কঠিন, ঠিক রাখা যায় না, পতন হয়।”

ভৈরবী শ্রীরামকৃষ্ণকে কুমারী পূজা শিক্ষা দেন। এই পূজায় কোনও কুমারী বালিকাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এছাড়াও ভৈরবীর নির্দেশনায় শ্রীরামকৃষ্ণ কুণ্ডলিনী যোগেও সিদ্ধ হন। ১৮৬৩ সাল নাগাদ তাঁর তন্ত্রসাধনা সম্পূর্ণ হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণ ভৈরবীকে মাতৃভাবে দেখতেন। অন্যদিকে ভৈরবী তাঁকে মনে করতেন ঈশ্বরের অবতার। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথম সর্বসমক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু নানা লোকের কথা শুনেই শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে তাঁর অবতারত্ব সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। যাই হোক, ভৈরবীর নিকট তন্ত্রসাধনা তাঁর আধ্যাত্ম-সাধনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বিবেচিত হয়।

বৈষ্ণবীয় ভক্তিসাধনা

বৈষ্ণব ভক্তিশাস্ত্রে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম নিবেদনে পাঁচটি ভাবের উল্লেখ রয়েছে – শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। শ্রীরামকৃষ্ণ এই ভাবগুলির কয়েকটি অভ্যাস করেন।

তোতাপুরী ও বৈদান্তিক সাধনা

১৮৬৪ সালে তোতাপুরী নামক জনৈক পরিব্রাজক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর নিকট শ্রীরামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী তোতাপুরী ছিলেন জটাজুটধারী এক বিশালবপু উলঙ্গ নাগা সন্ন্যাসী।গুরুর নাম গ্রহণ করা শাস্ত্রমতে বারণ; তাই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ‘ল্যাংটা’ বা ‘ন্যাংটা’ বলে উল্লেখ করতেন। তোতাপুরী ‘নেতি নেতি’ দৃষ্টিকোণ থেকে জগৎ দর্শন করতেন। তাঁর মতে সকলই ছিল মায়া। দেব-দেবীর মূর্তিপূজাকেও তিনি উপহাস করতেন। বিশ্বাস করতেন এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মে।
তোতাপুরী প্রথমে সকল জাগতিক বন্ধন থেকে শ্রীরামকৃষ্ণকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁকে সন্ন্যাস প্রদান করেন। অতঃপর তোতা তাঁকে অদ্বৈত তত্ত্ব শিক্ষা দেন –

নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব, দেশকালাদি দ্বারা সর্বদা অপরিচ্ছিন্ন একমাত্র ব্রহ্মবস্তুই নিত্য সত্য। অঘটন-ঘটন-পটীয়সী মায়া নিজপ্রভাবে তাঁহাকে নামরূপের দ্বারা খণ্ডিতবৎ প্রতীত করাইলেও তিনি কখনও বাস্তবিক ঐরূপ নহেন। ... নামরূপের দৃঢ় পিঞ্জর সিংহবিক্রমে ভেদ করিয়া নির্গত হও। আপনাতে অবস্থিত আত্মতত্ত্বের অন্বেষণে ডুবিয়া যাও।
অদ্বৈত বেদান্তের নানা তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার জন্য তোতা এগারো মাস দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট রয়ে যান। তিনি বিদায় নিলে আরও ছয় মাস শ্রীরামকৃষ্ণ আধ্যাত্মিক ভাবতন্ময়তার জগতে অবস্থান করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের কথা অনুযায়ী, এরপর তিনি দেবী কালীর নিকট থেকে নির্দেশ প্রাপ্ত হন - “তুই ভাবমুখে থাক” (অর্থাৎ, সমাধি ও সাধারণ অবস্থার মুখে অবস্থান করে লোকশিক্ষা দান কর।)

ইসলাম ও খ্রিস্টমতে সাধনা

১৮৬৬ সালে সুফিমতে সাধনাকারী হিন্দু গুরু গোবিন্দ রায়ের কাছে ইসলাম ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা করেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি বলেছেন, ঐ সময়ে ‘আল্লা’মন্ত্র জপ করিতাম, মুসলমানদিগের ন্যায় কাছা খুলিয়া কাপড় পরিতাম; ত্রিসন্ধ্যা নমাজ পড়িতাম এবং হিন্দুভাব মন হইতে এককালে লুপ্ত হওয়ায় হিন্দুদেবদেবীকে প্রণাম দূরে থাকুক, দর্শন পর্যন্ত করিতে প্রবৃত্তি হইত না।

তিনদিন অনুরূপ সাধনার পর তিনি “এক দীর্ঘশ্মশ্রুবিশিষ্ট, সুগম্ভীর, জ্যোতির্ময় পুরুষপ্রবরের (মহানবী) দিব্যদর্শন লাভ” করেন। সেই পুরুষ তাঁর দেহে লীন হন।

১৮৭৩ সালের শেষভাগ নাগাদ শম্ভুচরণ মল্লিক তাঁকে বাইবেল পাঠ করে শোনালে তিনি খ্রিস্টীয় মতে সাধনা শুরু করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, এই সময় তাঁর চিত্ত খ্রিস্টীয় ভাবে পূর্ণ হয়েছিল এবং তিনি কালীঘরে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। একদিন মেরিমাতার কোলে যিশু খ্রিস্টের চিত্রে তিনি জীবন্ত যিশুর দিব্যদর্শন লাভ করেছিলেন। তাঁর ঘরে হিন্দু দেবদেবীদের সঙ্গে পিতরকে ত্রাণরত যিশুর একটি চিত্র ছিল, সেটিতে তিনি প্রত্যহ সকাল ও সন্ধ্যায় ধূপারতি করতেন।


সারদা দেবী

সেকালের প্রথা অনুযায়ী সতেরো-আঠারো বছর বয়স হলে সারদা দেবী স্বামীগৃহে যাত্রা করলেন। স্বামী পাগল হয়ে গেছেন – এইরূপ একটি গুজব শুনে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত ছিলেন। আবার এও শুনেছিলেন, তাঁর স্বামী একজন বিশিষ্ট সাধকে পরিণত হয়েছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ এই সময় ষোড়শী পূজার আয়োজন করেন। এই পূজায় তিনি সারদা দেবীকে দিব্য মাতৃকাজ্ঞানে পূজা নিবেদন করেছিলেন। তাঁকে দেবী কালীর পীঠে বসিয়ে পুষ্প ও ধূপদানে তাঁর পূজা সম্পাদন করেন শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, তিনি যে নারীমাত্রেই জগজ্জননীর রূপ দর্শন করেন, তাঁর নিজের স্ত্রীও তার ব্যতিক্রম নয়। এমনকি তিনি রূপপোজীবিনী বারবণিতাদেরও মাতৃসম্বোধন করতেন। দাম্পত্যজীবনে সারদা দেবীর মধ্যে মাতৃজ্ঞান করায় তাঁদের বিবাহ অসাধারণত্বে উন্নীত হয়।
সারদা দেবীর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ কোনও দিন তাঁকে ‘তুই’ সম্বোধন করেননি। কখনও রূঢ়বাক্য প্রয়োগ বা তিরস্কারও করেননি।
সারদা দেবীকেই শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম অনুগামী মনে করা হয়। তাঁর শিষ্য ও ভক্তসমাজে সারদা দেবী ‘শ্রীমা’ বা ‘মাতাঠাকুরানী’ নামে পরিচিতা হন। শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোভাবের পর তিনিই রামকৃষ্ণ আন্দোলনের কেন্দ্রস্বরূপা হয়েছিলেন।

প্রভাব

রামকৃষ্ণ পরমহংসের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন হল স্বামী বিবেকানন্দের স্থাপন করা প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলির একটি। এটি স্থাপিত হয়েছে ১৮৯৭ সালে। স্বাস্থ্যরক্ষা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ত্রাণকার্য, গ্রাম ব্যবস্থাপনা, আদিবাসী কল্যাণ, প্রাথমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে রামকৃষ্ণ মিশন একাধিক শাখাকেন্দ্রের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যকলাপ ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণ আন্দোলনের একটি অন্যতম প্রধান অঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের নামাঙ্কিত আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ১৯২৩ সালে স্বামী অভেদানন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ (বেদান্ত সোসাইটি)। ১৯২৯ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের কয়েক জন বিক্ষুব্ধ সদস্য স্থাপন করেন রামকৃষ্ণ সারদা মঠ। ১৯৭৬ সালে স্বামী নিত্যানন্দ স্থাপন করেন রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন। ১৯৫৯ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ভগিনী সংগঠন হিসেবে স্থাপিত হয় শ্রীসারদা মঠ ও রামকৃষ্ণ সারদা মিশন। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ও বঙ্গীয় নবজাগরণে রামকৃষ্ণ পরমহংসকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মনে করা হয়। ম্যাক্স মুলার, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, শ্রীঅরবিন্দ ও লিও টলস্টয় মানবসমাজে রামকৃষ্ণ পরমহংসের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। ফ্রাঞ্জ ডোরাক (১৮৬২–১৯২৭) ও ফিলিপ গ্লাসের শিল্পকর্মে রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রভাব দেখা যায়।

রামকৃষ্ণ পরমহংস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর "পরমহংস রামকৃষ্ণদেবের প্রতি" কবিতাটি লিখেছিলেন:

বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা,

ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা;

তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে

নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;

দেশ বিদেশের প্রণাম আনিল টানি

সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।।

রামকৃষ্ণ মিশন আয়োজিত রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রধান অতিথি। এই অনুষ্ঠানে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের অবদান সম্পর্কে নিজের উচ্চ ধারণার কথা উল্লেখ করেছিলেন।১৯৩৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন কলকাতায় বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। এই সময় রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মশতবর্ষ উৎসবও চলছিল। এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশালতা বোঝা যায় আপাত-বিরোধী সাধনপদ্ধতিগুলির অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে। আর তাঁর মনের সরলতা পুরোহিত ও যাজকশ্রেণীর আড়ম্বর ও পাণ্ডিত্যকে চিরকালের জন্য ম্লান করে দিয়েছে।"

ব্রাহ্ম ও ভদ্রলোক সমাজে প্রভাব

১৮৭৫ সালে প্রভাবশালী ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ হয়। কেশব খ্রিস্টধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং আদি ব্রাহ্মসমাজের সহিত তাঁর বিচ্ছেদও ঘটেছিল। তিনি প্রথমে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেছিলেন। পরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের বহুদেববাদ গ্রহণ করেন এবং তাঁর সর্বধর্মসমন্বয়, ঈশ্বরে মাতৃভাব আরোপ এবং ব্রাহ্ম ও বহুদেববাদের সম্মিলনের আদর্শে “নববিধান” প্রতিষ্ঠা করেন। নববিধানের পত্রপত্রিকায় কেশব বেশ কয়েকবছর শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশাবলি প্রচারও করেছিলেন। এর ফলে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী, অর্থাৎ ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ও ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়গণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন।

কেশবচন্দ্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর মতো অন্যান্য ব্রাহ্মগণও শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট যাতায়াত শুরু করেন, ও তাঁর মতের অনুগামী হয়ে পড়েন। প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, শিবনাথ শাস্ত্রী ও ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল প্রমুখ কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ১৮৭১ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিময়িত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। প্রতাপচন্দ্র মজুমদার প্রথম ইংরেজিতে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনা করেন। ১৯৭৯ সালে থেইস্টিক কোয়ার্টারলি রিভিউ পত্রিকায় দ্য হিন্দু সেইন্ট নামে প্রকাশিত সেই জীবনী জার্মান ভারতবিদ ম্যাক্স মুলার প্রমুখ পাশ্চাত্য পণ্ডিতের দৃষ্টি শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট করে। এছাড়াও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অন্যান্য ব্রাহ্মদের বক্তৃতা ও নিবন্ধ থেকেও বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণী শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুসারে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির বাণী বাঙালি সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে এবং বহু বিপথগামী যুবককে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও স্বামী দয়ানন্দের সঙ্গেও ধর্মবিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের বাক্যালাপ হয়েছিল। তবে ব্রাহ্মসমাজে তাঁর মত ও ধর্মবিশ্বাসের বিরোধিতাও অনেকে করেছিলেন। তাঁর সমাধি অবস্থাকে তাঁরা স্নায়ুদৌর্বল্য বলে উপহাস করেন। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় তাঁর অবতারত্ব অস্বীকার করেছিলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব কলকাতার শিক্ষিত সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর জীবদ্দশাতেই পণ্ডিত-বিদ্বজ্জন মহলের গণ্ডী টপকে তাঁর ধর্মীয় চিন্তাধারণা ও উপদেশের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল বাংলার বাউল ও কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মধ্যে, এমনকি বাংলার বাইরেও। অবশ্য মৃত্যুর পূর্বে রামকৃষ্ণ আন্দোলনের কাজ বিশেষ কিছুই সাধিত হয়নি। ব্রাহ্মসমাজ ও নবোত্থিত হিন্দু পুনর্জাগরণ আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে বাংলার নবজাগরণে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব অবিস্মরণীয়।

সেই যুগে শ্রীরামকৃষ্ণের পাশ্চাত্য গুণগ্রাহীদের অন্যতম ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের তদনীন্তুন অধ্যক্ষ ডক্টর ডব্লিউ ডব্লিউ হেস্টি। শ্রেণীকক্ষে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রচিত দ্য এক্সকারসন কবিতাটিতে ব্যবহৃত "ট্র্যান্স" শব্দটি বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, শব্দটির প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে হলে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট যাওয়া আবশ্যক। তাঁর এই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ দক্ষিণেশ্বরে যান। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরে স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন।

ভক্ত ও শিষ্য

১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের প্রধান শিষ্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ হয়। এঁদের অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কেউ আবার ছিলেন একান্তই নাস্তিক; নিছক কৌতূহলের বশেই তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ এঁদের সকলের মধ্যেই গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং এঁরা সকলেও তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। প্রবল যুক্তিবাদী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁর ‘কান মলে’ দেওয়ার জন্য; কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হন। তাঁর অননুকরণীয় ধর্মপ্রচারের ভঙ্গি অনেক সংশয়বাদী ব্যক্তির মনেও দৃঢ় প্রত্যয়ের উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল।

তাঁর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখনীয়

গৃহস্থ শিষ্য
মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত,
গিরিশচন্দ্র ঘোষ,
অক্ষয়কুমার সেন প্রমুখ;

ত্যাগী বা সন্ন্যাসী শিষ্য

নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ),
রাখালচন্দ্র ঘোষ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ),
কালীপ্রসাদ চন্দ্র (স্বামী অভেদানন্দ),
তারকনাথ ঘোষাল (স্বামী শিবানন্দ),
শশীভূষণ চক্রবর্তী (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ),
শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী (স্বামী সারদানন্দ) প্রমুখ।

এছাড়া নারী ভক্তদের একটি ছোটো অংশও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। এঁদের মধ্যে গৌরী মা ও যোগীন মা উল্লেখযোগ্য। এঁদের কেউ কেউ মন্ত্রদীক্ষার মাধ্যমে তাঁর থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। তবে তপস্যার বদলে শহরে অবস্থান করে নারীসমাজের সেবাতেই তাঁদের উৎসাহিত করতেন শ্রীরামকৃষ্ণ।

তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসতে শুরু করেন - “কি মহারাজা কি ভিখারি, কি পত্রিকাকার কি পণ্ডিত, কি শিল্পী কি ভক্ত, কি ব্রাহ্ম কি খ্রিস্টান কি মুসলমান, সকল মতের সকল পেশার আবালবৃদ্ধ বণিতা”। জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ছিলেন খুবই মিশুকে ও তুখোড় আলাপচারী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক নাগাড়ে বলে যেতে পারতেন – নিজের অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতার কথা, নানা গল্প; খুব সাধারণ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে চলতেন বেদান্তের দুর্বোধ্য তত্ত্ব; রসিকতা, গান বা অন্যদের নকল করারও মাধ্যমে আমোদ-প্রমোদেও পিছপা হতেন না। সকল শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধের মত টেনে রাখতেন তাঁর কাছে।

কিছু সন্ন্যাসী শিষ্য থাকলেও, তিনি সকলকে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হতে বলতেন না। আবার ত্যাগী শিষ্যদের সন্ন্যাসজীবনের জন্য প্রস্তুত করার মানসে তাদের জাতিনির্বিশেষে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করার নির্দেশ দিতেন। এঁদের তিনি সন্ন্যাসী জীবনের প্রতীক গৈরিক বস্ত্র ও মন্ত্রদীক্ষাও দান করেছিলেন।

শেষ জীবন

১৮৮৫ সালের প্রারম্ভে তিনি ক্লার্জিম্যান’স থ্রোট রোগে আক্রান্ত হন; ক্রমে এই রোগ গলার ক্যান্সারের আকার ধারণ করে। কলকাতার শ্যামপুকুর অঞ্চলে তাঁকে নিয়ে আসা হয়। বিশিষ্ট চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার তাঁর চিকিৎসায় নিযুক্ত হন। অবস্থা সংকটজনক হলে ১১ ডিসেম্বর, ১৮৮৫ তারিখে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় কাশীপুরের এক বিরাট বাগানবাড়িতে।
এই সময় তাঁর শিষ্যগণ ও সারদা দেবী তাঁর সেবাযত্ন করতেন। চিকিৎসকগণ তাঁকে কথা না বলার কঠোর নির্দেশ দেখাশোনার ভার অর্পণ করে যান।

উপদেশ

লোকশিক্ষক হিসাবে রামকৃষ্ণ পরমহংস ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। গ্রাম্য বাংলায় ছোটো ছোটো গল্পের মাধ্যমে দেয় তাঁর উপদেশাবলি জনমানসে বিস্তার করেছিল ব্যাপক প্রভাব। ঈশ্বর-উপলব্ধিই তিনি মানবজীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বলে মনে করতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের মতে, কাম ও অর্থই মানুষকে ঈশ্বরের পথ হতে বিচ্যুত করে; তাই “কাম-কাঞ্চন” বা

“কামিনী-কাঞ্চন” ত্যাগের পথই তাঁর কাছে ছিল ঈশ্বরের পথ। জগতকে তিনি ‘মায়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে জগতের অন্ধকার শক্তি ‘অবিদ্যা মায়া’ (অর্থাৎ, কামনা, বাসনা, লোভ, মোহ, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি) মানুষকে চেতনার সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনে। এই মায়া মানুষকে কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে। অন্যদিকে সৃষ্টির আলোকময় শক্তি ‘বিদ্যা মায়া’ (অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক গুণাবলি, জ্ঞান, দয়া, শুদ্ধতা, প্রেম ও ভক্তি) মানুষকে চৈতন্যের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যায়।
শ্রীরামকৃষ্ণ ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মমত অভ্যাস করেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন সকল মতই একই ঈশ্বরের পথে মানুষকে চালিত করে। তিনি ঘোষণা করেন “যত্র জীব তত্র শিব” অর্থাৎ, যেখানেই জীবন, সেখানেই শিবের অধিষ্ঠান। “জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীবসেবা” – তাঁর এই উপদেশ স্বামী বিবেকানন্দের কর্মের পাথেয় হয়েছিল। 'শ্রীম' অর্থাৎ মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রণীত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত গ্রন্থে তাঁর ধর্মভাবনার মূল কথাগুলি লিপিবদ্ধ আছে। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুগামীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ এটিই।

মূল্যায়ন

রামকৃষ্ণ পরমহংসের ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও তাঁর সাধনা, বিশেষত তন্ত্র ও মধুর ভাব সাধনা বিশিষ্ট দার্শনিক তথা বিদ্বজ্জন কর্তৃক পর্যালোচিত হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধি, যা চিকিৎসাশাস্ত্রের লক্ষণ অনুসারে মৃত্যুবৎ, তাও বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও গবেষকের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে। রোম্যাঁ রোলাঁ, সুধীর কক্কর, নরসিংহ শীল, জেফরি কৃপাল, অ্যালান রোনাল্ড, ডক্টর জিন ওপেনশ, সোমনাথ ভট্টাচার্য, কেলি অ্যান রাব ও জে এস হলে প্রমুখ পণ্ডিতগণ এই সব ক্ষেত্রে মনোবিশ্লেষণমূলক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অবশ্য এই ব্যাখ্যা অনেকক্ষেত্রেই বিতর্কিত। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও ধর্মমত, যা রামকৃষ্ণ মিশনের সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের মূলভিত্তি, তার পর্যালোচনা করেছেন লিও শ্নাইডারম্যান, ওয়াল্টার জি নিভাল, সাইরাস আর প্যাঙ্গবর্ন ও অমিয় পি সেন।

========================

জন্ম ::--১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৬ কামারপুকুর তিরোধান ১৬,-১৫ আগস্ট ১৮৮৬

জুন, জুলাই ,আগস্ট , এই তিন মাসেই আমরা হারিয়েছি আমাদের
প্রিয় বহু প্রিয়জনকে।
অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণেই আমাদের যত বিচ্ছেদবেদনা,
এই বিচ্ছেদবেদনার তালিকা লিখতে গিয়েই পেলাম


আনন্দ বাজার পত্রিকার এক তথ্য -----

সংগ্রহ --------
Anandabazar Patrika
15, অগস্ট,2020.

রোদনভরা শুধু বসন্তই নয়, বর্ষামুখর আষাঢ়-শ্রাবণেই ভাগ্যহীন বাংলার যত বিচ্ছেদবেদনা। আষাঢ়-শ্রাবণের বিচ্ছেদ যন্ত্রণার একটা তালিকা এক সময়ে তৈরি করেছিলাম।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ : ১৫ অগস্ট ১৮৮৬
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : ২৯ জুলাই ১৮৯১
স্বামী বিবেকানন্দ : ৪ জুলাই ১৯০২
শ্রীমা সারদামণি : ২১ জুলাই ১৯২০
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন : ১৬ জুন ১৯২৫
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ: ৭ অগস্ট ১৯৪১
ডা. বিধানচন্দ্র রায়: ১ জুলাই ১৯৬২

সপ্তরথীর এই তালিকা দেখে পুলিশের এক কর্তা আমাকে বলেছিলেন, ফাঁসিতে ঝোলাবার আগে সাহেবরাও বোধহয় পাঁজি দেখতেন, নইলে ক্ষুদিরামের বিদায়দিন (১১. ০৮. ১৯০৮) কেন এই অগস্টেই ?


পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের বিদায়দিনের বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়েও শ্রাবণের শেষ দিনের কথা মনে পড়ে যায়। তার পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু আজও মানুষ বারবার জানতে চায় কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে সে রাত্রে কী হয়েছিল এবং কেমন ভাবে তাঁকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্যবৃন্দ, যাঁরা পরবর্তী কালে ভারতবিজয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে বিশ্ববিজয়ে বার হয়েছিলেন বিশ্বজনের হৃদয় জয় করতে।

শিষ্য বিবেকানন্দের মহাপ্রস্থানের বিস্তারিত বিবরণ আজও আমাদের আয়ত্তে নেই, কিন্তু ১৮৮৬ সালের অগস্ট মাসে পরমহংস রামকৃষ্ণের বিদায়কাহিনি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সংগ্রহ করেছেন স্বামী প্রভানন্দ—‘বরুণ মহারাজ’ নামে যিনি পাঠকমহলে সুপরিচিত। তিন দশক আগে (১৩৯২- ১৩৯৪) দু’খণ্ডে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন সমস্ত টুকিটাকি সংগ্রহ করে। এবং সেই সঙ্গে আছেন বিভিন্ন গবেষক যাঁরা ঠাকুরের সংখ্যাহীন চিকিৎসকদের কীর্তিকথা ও শ্মশানঘাটে দাহকালে কী ঘটেছিল কিংবা কী হওয়া উচিত ছিল, তার বিবরণ বিভিন্ন বই এবং স্মৃতিকথায় লিপিবদ্ধ করেছেন। এক সময়ে আমিও জড়িয়ে পড়েছিলাম এই সন্ধানে ‘রামকৃষ্ণ রহস্যামৃত’ লিখতে গিয়ে, যেখানে বলতে চেয়েছিলাম—মহাশ্মশানে সে দিন বৃষ্টি হওয়ায় কিছু বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল এবং লুট হয়েছিল পরমহংসের চিতাভস্ম, যার কিছুটা আজও বোধহয় গোপনাবস্থায় রয়েছে অজানা ভক্তগৃহে, যার অর্থ মঠের ‘আত্মারামের কৌটা’র বাইরেও কোথাও কোথাও আজও থাকতে পারে উনিশ শতকের পরমপুরুষের চিতাভস্ম।

ইতিহাস-সচেতন বরুণ মহারাজ পরমহংসের শেষ অসুখ সম্বন্ধে যথেষ্ট হিসেব করেছেন, রোগাক্রান্ত হয়ে দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে সুচিকিৎসার জন্য ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের পরামর্শে বেরিয়ে পড়ে, কাশীপুর বাগানবাড়িতে ১১ ডিসেম্বর ১৮৮৫-তে উঠে এসে শ্রীরামকৃষ্ণ সেখানে ২৪৭ দিন অতিবাহিত করেছিলেন। ওই বছর জুলাই মাসে ধরা পড়ে তাঁর গলরোগের উপসর্গ এবং ডাক্তারের পরামর্শে বাগবাজারে বলরাম বসুর বাটীতে সাত দিন এবং শ্যামপুকুরে ৭০ দিন কাটিয়েছিলেন। দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে আসার দু’টি কারণ শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, ‘ওখানকার ঘর স্যাৎসেঁতে। বাহ্যে যাবার সুবিধা নেই।’

দক্ষিণেশ্বর ছাড়ার তিন দিন আগে তিনি তালতলায় ডা. দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেম্বারে গিয়েছিলেন। অনেকেই ভুল করেন, ইনিই বুঝি রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃদেব। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তাঁর দেহাবসান শ্রীরামকৃষ্ণের দেহাবসানের ১৫ বছর আগে। তাঁর ডাক্তার সম্বন্ধে ঠাকুরেরই স্মরণীয় মন্তব্য, ‘দুর্গাচরণ ডাক্তার, এ তো মাতাল, চব্বিশ ঘণ্টা মদ খেয়ে থাকতো, কিন্তু কাজের বেলায়, চিকিৎসা করবার সময় কোনো ভুল হবে না।’

বলরাম বসুর ভবন থেকে কাশীপুর উদ্যানবাটীর বিবরণ দিতে গিয়ে বরুণ মহারাজের দু’টি খণ্ড লেগে গিয়েছে। আমরা কাশীপুর পর্বেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখব। শ্যামপুকুরে স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি দেখে নরেন্দ্রনাথ নাকি চেয়েছিলেন, ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে চলুন, সেখানে কালী আছেন। ঠাকুরের ইচ্ছাও তা-ই, কিন্তু রানি রাসমণির পৌত্র ত্রৈলোক্যের অসহযোগিতায় তা সম্ভব হয়নি। অতএব কাশীপুর। এই উদ্যানবাটী ভক্ত ডা. রামচন্দ্র দত্ত খুঁজে পেয়েছিলেন মহিমাচরণ চক্রবর্তীর সাহায্যে, মাসিক ভাড়া ৮০ টাকা। এত টাকা ভাড়ায় চিন্তিত ঠাকুর প্রিয় শিষ্য সুরেন্দ্রনাথ মিত্রকে বলেছিলেন, ‘বাড়িভাড়াটা তুমি দিও।’ সুরেন্দ্রনাথ ন’মাস এই ভাড়ার দায়িত্ব নেন।

কাশীপুরের অন্ত্যলীলা পর্বে সেবকের অভাব হয়নি। তাঁদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথও রয়েছেন পুরোভাগে। তাঁদের অনেক কাজ—চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা, রোগীর পথ্য সংগ্রহ করা, হাটবাজার করা। পরবর্তী কালের স্বামী অভেদানন্দ তথা তখনকার কালীপ্রসাদ কিছু বর্ণনা রেখে গিয়েছেন—‘প্রথম প্রথম আমরা দুই তিনজন সেবা-শুশ্রূষা করিতাম, শ্রীমা শ্রীশ্রীঠাকুরের পথ্য রন্ধন করিতেন।’ পরে সেবকগণের সংখ্যা বাড়ায় একজন পাচক ব্রাহ্মণ নিয়োগ করতে হয়। সেবক লাটু মহারাজের বর্ণনা—‘লোরেন ভাই, রাখাল ভাই, শরোট ভাই, শশী ভাই, বুড়ো গোপাল দাদা, ছোট গোপাল ভাই, নিরঞ্জন ভাই, কালী ভাই, বাবুরাম ভাই—এরা সব বাড়ি ছেড়ে রয়ে গেলো।’ তার পর যোগ দেন যোগীন্দ্র ও তারক। সকলের নেতৃত্ব যে নরেন্দ্রনাথের, তা বিশ্বস্তসূত্রেই জানা যাচ্ছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব

ভক্ত পরিবৃত হয়েও খরচ নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের। কেরানি, ছাপোষা লোকেরা এত টাকা চাঁদা তুলতে পারবে কেন? ঠাকুরের কথায় বলরাম বসু পথ্যের খরচ দিতে রাজি হলেন। ‘যতদিন দক্ষিণেশ্বরের বাইরে থাকব, ততদিন আমার খাবারের খরচটা তুমিই দিও।’ লাটু মহারাজ জানাচ্ছেন, ‘রামবাবু হামাদের সব খরচখরচা দিতেন।’ মাস্টারমশাই ‘শ্রীম’ এই প্রসঙ্গে বলেছেন, টাকাপয়সা নেই। যত সব নড়েভোলা ভক্ত আসতেন বলে ঠাকুর হাসাহাসি করে জিজ্ঞেস করতেন, ‘ক’খানা গাড়ি এসেছে ?’ লাটু একদিন উত্তর দিলেন, উনিশখানা। তখন ঠাকুরের রসিকতা, ‘মোটে এই!’ খরচের বাড়াবাড়ি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে যে মন-কষাকষি হয়েছিল, তা শ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথিকারের দৃষ্টি এড়ায়নি।

‘করিতেছ অপব্যয় শোভা নাহি পায়
হিসাব রাখিতে হবে তুলিয়া খাতায়।’

এই হিসেব রাখার কথায় নরেন বেজায় চটে উঠেছিলেন, ‘এত হিসেব রাখারাখি কেন ? এখানে কেউ তো চুরি করতে আসেনি।’ দেখা যাচ্ছে, হিসেবপত্তর সম্বন্ধে নরেন্দ্রনাথের মতামত পরে বেশ পাল্টে গিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, দাতারা হিসেব চায় এবং মাছের টাকা শাকে এবং শাকের টাকা মাছে খরচ করতে হলে, দাতাদের আগাম জানাতে হবে। সেই সব কঠিন হিসেবি আইন আজও রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনকে উন্নতশির রাখতে বিশেষ সাহায্য করছে। ঠাকুর নিজেও বলতেন, গেরস্তর রক্ত জল করা অর্থের অপচয় চলবে না। কাশীপুরে খরচের হিসেব রাখার দায়িত্ব গোপাল দাদা না হুটকো গোপালের উপরে পড়েছিল, তা নিয়ে আজও একটু সন্দেহ আছে। তাপস সেবকেরা যে ব্যয় হ্রাসের প্রস্তাবে খুশি হননি, তা বরুণ মহারাজ বিস্তৃত ভাবেই লিখেছেন। কেউ কেউ চেয়েছিলেন, দু’-তিন জনই যথেষ্ট এবং সেবকেরা যে যার বাড়ি ফিরে যাক। বিরক্ত নরেন্দ্রনাথের ইচ্ছেয় সায় দিয়ে ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আমি যাব তোরা যাইবি যেথায়।’

নরেন্দ্রনাথ স্থির করেছিলেন, ভিক্ষা করেই খরচপত্র চালাবেন। সেই মতো নরেন্দ্রনাথ-সহ কয়েক জন ত্যাগী সন্তান শ্রীমায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ভিক্ষায় বার হয়েছিলেন এবং সেই পবিত্র ভিক্ষান্ন থেকে শ্রীমা তরল মণ্ড তৈরি করে ঠাকুরকে পথ্য দেন। শোনা যায়, এই সময়ে ভক্ত মাড়োয়ারিদের সাহায্যপ্রার্থী হওয়ার কথা উঠেছিল। তাঁরা টাকাকড়ি নিয়ে তৈরিও ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার প্রয়োজন হয়নি। এ ছাড়াও অর্থসাহায্যের জন্য নরেন্দ্রনাথকে ঠাকুর আরও দু’জনের কাছে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন পাইকপাড়ার জমিদার ইন্দ্রনারায়ণ সিংহ ও গিরিশচন্দ্র ঘোষ, যিনি সমস্ত খরচ চালানোর দায়িত্ব নিতে রাজি হয়ে বলেছিলেন, ‘আমিই সব খরচ দেবো। যখন পারবো না তখন বলব, তখন তোমরা অন্যত্র চেষ্টা করবে।’

এরই মধ্যে নমো নমো করে ঠাকুরের জন্মোৎসব পালন হয়েছিল কাশীপুরে এবং উল্লেখযোগ্য খবর, উপহার পাওয়া একজোড়া চটিজুতো চুরি যায়। তার বদলে যে চটিজুতো আনা হয়, তা যে এখনও বেলুড় মঠে পুজো হয়, তাও বরুণ মহারাজ লিখতে ভোলেননি। তিনি আরও একটি মূল্যবান সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। তখনও ‘ঠাকুর’ নামটা তেমন প্রচলিত হয়নি, সবাই শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘পরমহংসমশায়’ বা ‘পরমহংসদেব’ বলতেন।

সেবকদের দিবারাত্র সেবাকার্য সম্বন্ধে স্বামী শিবানন্দ পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, রান্না করার পাচক অসুস্থ হলে সেবকরাই পালা করে রাঁধত—ভাত ডাল রুটি চচ্চড়ি ঝোল। একদিন চচ্চড়িতে ফোড়ন দেওয়ার সময়ে গন্ধ পাওয়ায় ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রান্না হচ্ছে রে তোদের ? যা আমার জন্য একটু নিয়ে আয়।’ সেই চচ্চড়ির স্বাদ সে দিন তিনি নিয়েছিলেন। সেবকদের শরীর সম্বন্ধেও শ্রীরামকৃষ্ণের উদ্বেগ কম নয়। ‘সেবার ত্রুটি হবে বলে তোমরা নিজের শরীরের যত্ন নিচ্ছো না, তোমরা বাপু অসময়ে খাওয়াদাওয়া কোরো না।’

ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ায় কথামৃতকার শ্রীম খবর পান, ঠাকুরের অসুখ খুব বেড়েছে এবং তিনি রক্তবমি করছেন। ‘ডাবর ভরে যায় রক্তে। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান।’ এই সময়ে দুঃসাহসী নরেন্দ্রনাথের মুখে দেখা যায় গুরুর কণ্ঠনিঃসৃত টাটকা রক্ত! স্বামী গম্ভীরানন্দ লিখেছেন, ‘নরেন্দ্রনাথ একদিন ঠাকুরের পথ্য গ্রহণের পর তাঁহার নিষ্ঠীবন মিশ্রিত পথ্যের পাত্রটি হস্তে লইয়া অম্লানবদনে পান করিলেন।’ তাঁকে অনুসরণ করে নিরঞ্জন, শশী (পরে রামকৃষ্ণানন্দ) ও শরৎ (ভবিষ্যতে স্বামী সারদানন্দ) ওই রক্ত পান করেন।



শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মহাসমাধি

ঠাকুরের পেটের রোগের কথাও উঠতে পারে, এই রোগ কোনও দিন তাঁকে ছাড়েনি। বিখ্যাত হোমিয়োপ্যাথিক ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল দত্ত (ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের গুরু) শুধু ঠাকুরের চিকিৎসাই করেননি, রোগীর দুর্বল শরীরের কথা ভেবে কোমল চটি এনে নিজের হাতে রামকৃষ্ণদেবকে পরিয়ে দেন। তাঁর ওযুধ খেয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মাসাধিক কাল বেশ ভাল ছিলেন। এক সময়ে ঠান্ডা লেগে কাশি বেড়ে যাওয়ায় ডাক্তাররা পাঁঠার মাংসের সুরুয়া খেতে নির্দেশ দিলেন। ঠাকুর বললেন, ‘যে দোকানে কালীমূর্তি আছে সেখান থেকে মাংস আনবি।’ মা ঠাকরুন বলেছেন, ‘কাঁচা জলে মাংস দিতুম, কখনো তেজপাতা ও আলু মশলা দিতাম, তুলোর মতো সিদ্ধ হলে নামিয়ে নিতুম।’ এই সময়ে শ্রীরামপুর থেকে দৈব ওষুধও আনা হয়, যা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’র অমৃত কথাকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত। নানা ওষুধের সঙ্গে জনৈক কবিরাজ যে হরিতাল ভস্ম ওষুধ দিয়েছিলেন, তাও যন্ত্রণাতাড়িত ঠাকুর বিনা প্রতিবাদে খেতেন।

বরুণ মহারাজ অনেক খবর নিয়ে লিখেছেন, জানুয়ারির গোড়ার দিকে নরেন্দ্রনাথ একবার বাড়ি যান এবং তাঁর মা সেই সময়ে আদর করে ছেলেকে হরিণের মাংস খাওয়ান। একই সময় ডাক্তাররা পরমহংসদেবকে গুগলির ঝোল খেতে বলায় শ্রীমা একটু ইতস্তত করায় ঠাকুর তাঁর সহধর্মিণীকে বলেন, ‘ছেলেরা পুকুর থেকে গুগলি এনে তৈরি করে দেবে, তুমি রান্না করে দেবে।’ এই সময়ে খাওয়ার বড়ই কষ্ট, শ্রীমা বলেছেন, ‘এক একদিন নাক দিয়ে গলা দিয়ে সুজি বেরিয়ে পড়তো, অসহ্য কষ্ট হতো।’ রোগ নিরাময়ের জন্য রামকৃষ্ণের প্রায়শ্চিত্তের কথাও উঠেছিল। এক সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ও রামলাল, তুই ১০ টাকা নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে যা, মা কালীকে নিবেদন করে বামুনটামুনদের বিলিয়ে দে।’

মার্চ মাসের মাঝামাঝি আট মাস হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় তেমন ফল না হওয়ায় ভক্ত ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডাক্তার জে এম কোটসকে নিয়ে আসেন। এঁকে ঠাকুরের ভাল লাগেনি, চলে যাওয়ার পর ঠাকুরের নির্দেশে বিছানাপত্রে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এক ভক্ত (ভাই ভূপতি) ডাক্তারের বত্রিশ টাকা ভিজিট দেন। কেউ কেউ বলেন, ডা. কোটস টাকা নেননি।

এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি মোটেই ভাল নয়। ডা. রাজেন্দ্র দত্ত এক সময়ে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং ডাক্তার সরকার তার দিনলিপিতে লেখেন, ‘আগামী বৃহস্পতিবার অপরাহ্ণে তাঁকে দেখতে যাবো।’ ২২ এপ্রিল এঁরা দু’জনে একসঙ্গে ঠাকুরকে পরীক্ষা করেন—যখন তিনি বলেন, বড্ড খরচা হচ্ছে। রসিক মহেন্দ্রনাথ সে বার নরেনের সামনেই বলেন, ‘কাঞ্চন চাই। আবার কামিনীও চাই। ডাক্তার রাজেন্দ্র দত্তের পরিবার রেঁধে বেড়ে দিচ্ছেন।’ আর শ্রীমকে ঠাকুর বলেন, ‘ওরা কামিনী-কাঞ্চন না হলে চলে না বলছে, আমার যে কি অবস্থা জানে না।’ ২৩ মে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত কাশীপুরে এসেছিলেন ঠাকুরকে দেখতে। ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার অনেক দিন আসেন না, ডা. রাজেন্দ্র দত্তও রোজ আসছেন না। ঠাকুরের কী হবে ভেবে সবাই বেশ চিন্তিত।

১৫ অগস্ট আর দূরে নয়। স্বামী প্রভানন্দ লিখেছেন, মহাপ্রস্থানের দু’দিন আগে তিনি বলেন, ‘দেখ নরেন, তোর হাতে এদের সকলকে দিয়ে যাচ্ছি, কারণ তুই সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী। এদের খুব ভালোবেসে, যাতে আর ঘরে ফিরে না গিয়ে এক স্থানে থেকে খুব সাধন-ভজনে মন দেয়, তার ব্যবস্থা করবি।’

শনিবার, ৩০ শ্রাবণ, রাখিপূর্ণিমা। আগের দিন থেকে পরিস্থিতি ভাল না। ঠাকুরের ক্ষত পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রবল কষ্ট দেখে সেবক বুড়োগোপাল তাঁর কাজ বন্ধ করায় ঠাকুর বললেন, ‘না না, তুমি ধুইয়ে দাও।’ আসলে সকলের আশাদীপ স্তিমিত।
এ বার শ্রাবণের সেই শেষ দিন, রবিবার ১৫ অগস্ট। পরমহংসদেবের মহাপ্রয়াণ ১৫ না ১৬ অগস্ট, তা নিয়ে একটু ধন্দ আছে। স্বামী প্রভানন্দ লিখেছেন, ১৬ অগস্ট। কিন্তু সরকারি ডেথ রেজিস্টারে উল্লিখিত ১৫ অগস্ট। এর কারণ রবিবার মধ্যরাত্রে ব্যাপারটা ঘটলেও, রাত একটার আগে ব্যাপারটা পরিষ্কার নয়। ভক্তরা তখনও ভাবছেন, সমাধি এবং তাঁরা সকাল পর্যন্ত তাঁর সমাধিভঙ্গের জন্য বুকে পিঠে ঘি মালিশ করে যাচ্ছেন।

মহাসমাধিকে কেন্দ্র করে যে সব প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ রয়েছে, তার মধ্যে আমরা স্বামী অভেদানন্দ ও বৈকুণ্ঠনাথ সান্যালের বিবরণের উপর একটু নজর দেব। অভেদানন্দ ‘আমার জীবনকথা ১ম খণ্ড’য় বলেছেন, ‘রবিবার, পূর্ণিমা ৩১ শ্রাবণ তিনি মহাসমাধি লাভ করেন।... সেদিন রাত্রে ৬টার সময় আমরা সকলে তাঁহার নিকট বসিয়াছিলাম, সাধারণতঃ যেমন সমাধি হয় তেমনই হইল, তাঁহার দৃষ্টি নাসাগ্রের উপর স্থির হইয়া রহিল। নরেন্দ্রনাথ উচ্চৈঃস্বরে ওঁকার উচ্চারণ করিতে আরম্ভ করিল। আমরাও সমবেত স্বরে ওঁকার ধ্বনি করিতে লাগিলাম, সকলের মনে আশা ছিল যে, অল্পক্ষণ পরেই তাঁহার সমাধিভঙ্গ হইবে এবং শীঘ্রই তিনি চৈতন্যলাভ করিবেন।’

স্বামী প্রভানন্দ ১৫ অগস্টের সকাল ৮টা থেকে বিস্তারিত বর্ণনা শুরু করেছেন, যখন ঠাকুর চাইলেন পাঁজি থেকে পড়ে শোনাতে।

‘আজও বাগবাজারের রাখাল মুখার্জি এসেছেন।’ এই ভক্ত সাহেবি ধরনের মানুষ, শ্রীরামকৃষ্ণের জীর্ণ শরীর দেখে তিনি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছেন এবং জেনেছেন, মুরগির জুস খেলে ঠাকুরের শরীরে বল হবে। তিনি ঠাকুরকে মুরগির জুস খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলে ঠাকুর বললেন, ‘খেতে আপত্তি নেই, তবে লোকাচার। আচ্ছা, কাল দেখা যাবে।’
পরবর্তী দৃশ্যে তিনি সারদামণিকে বললেন, ‘এসেছো ? দ্যাখো আমি যেন কোথায় যাচ্ছি। জলের ভিতর দিয়ে অ-নে-ক দূরে।’ সারদামণিকে কাঁদতে দেখে বললেন, ‘তোমার ভাবনা কি ? যেমন ছিলে তেমন থাকবে। আর এরা আমায় যেমন করছে, তোমায় তেমন করবে।’

সে দিন আরও অলক্ষুনে ভাব। শ্রীমা যে খিচুড়ি রাঁধছিলেন তা ধরে গেল, একটা জলের কুঁজো চুরমার হয়ে গেল। বরুণ মহারাজ তথ্যসমুদ্র মন্থন করে বলছেন, সে দিন পথ্যের প্রায় সবটাই মুখের বাইরে পড়ে যায় এবং ঠাকুরের ক্ষুধা নিবৃত্তি না হওয়ায় তিনি বলেন, ‘পেটে হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ির ক্ষুধা, কিন্তু মহামায়া কিছুই খেতে দিচ্ছেন না।’

লাটু মহারাজের স্মৃতিকথা অনুযায়ী তিনি পাখার বাতাস করছিলেন, রাত প্রায় ১১টা, শ্রীরামকৃষ্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার পরেই মনে হল, যেন তাঁর সমাধি হয়েছে। শশী মহারাজ (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, মহাপ্রস্থানের পূর্বে তিনি এক গ্লাস পায়সম পান করে তৃপ্তি পেয়েছিলেন। পথ্য সেবনের পর নরেন্দ্রনাথ যখন তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, তখন তিনি বারংবার নরেনকে বলেন, ‘এসব ছেলেদের তুই দেখিস।’

বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল জীবনসায়াহ্নে রচিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলামৃত’ বইতে শেষ সময়ের অনেক খবরাখবর দিয়েছেন। দুঃসহ বেদনায় যখন কোনও কিছু গলাধঃকরণ প্রায় অসম্ভব, তখন তিনি নাকি বলেছিলেন—‘ভেতরে এত ক্ষিধে যে, হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি খাই, কিন্তু মহামায়া কিছুই খেতে দিচ্ছেন না।’ বৈকুণ্ঠনাথের মন্তব্য, এই দৃশ্য থেকেই নরেন্দ্রনাথ পরবর্তী কালে প্রভুর জন্মোৎসবে খিচুড়ি ভোগের ব্যবস্থা করেন, ‘যাহা ভারতে কেন, জগতের কোনো প্রদেশেই দেখা যায় না।’

আবার ফেরা যাক স্বামী অভেদানন্দের স্মৃতিকথায়, ‘সমস্ত রাত্রি কাটিয়া গেল, শ্রীশ্রীঠাকুরের বাহ্যজ্ঞান আর ফিরিয়া আসিল না। তখন সকলেই আমরা হতাশ হইয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলাম। প্রাতঃকালে মাতাঠাকুরানিকে সংবাদ দেওয়া হইল। শ্রীমা উপরে আসিয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের পার্শ্বে বসিয়া ‘মা কোথায় গেলি গো’ বলিয়া কাঁদিতে লাগিলেন... প্রকৃতপক্ষে শ্রীশ্রীঠাকুর সহধর্মিণী শ্রীমাকে শ্রীশ্রীভবতারিণীর জীবন্ত মূর্তি বলিয়া মনে করিতেন এবং শ্রীমাও শ্রীশ্রীঠাকুরকে মা কালী বলিয়া সম্বোধন করিতেন।’

আরও খবর সংগৃহীত রয়েছে বরুণ মহারাজের বিখ্যাত বইয়ের শেষ অধ্যায়ে। ঠাকুরের জ্ঞান হারানোর পরে কারও জন্য অপেক্ষা না করে শশী ছুটে যান ডাক্তারের খোঁজে এবং কয়েক মাইল দৌড়ে ডাক্তারের বাড়ি পৌঁছে জানেন, ডাক্তার নবীন পাল অন্যত্র রোগী দেখতে গিয়েছেন। ঠিকানা জেনে শশী আবার ছুটতে থাকেন, পথে ডাক্তারের দেখা পান এবং তাঁকে নিয়ে ফিরলেন উদ্যানবাটীতে। ঠাকুর তখনও নাকি বলেছিলেন, ‘আজ আমার বড্ড ক্লেশ হইতেছে। দুইটি পার্শ্ব যেন জ্বলিয়া উঠিতেছে।’

বিশিষ্ট ভেষজ বিজ্ঞানী নবীন পাল ঠাকুরের শেষ সময়ের চিকিৎসক। তিনি ঠিক কোন সময়ে ১৫ অগস্ট শ্রীরামকৃষ্ণের পাশে এসেছিলেন, তা কিছুটা ধোঁয়াশায় ভরা। বরুণ মহারাজের মতে, সেটি ছিল চন্দ্রালোকিত রাত। পাইকপাড়ার রাজাদের কাঙালি বিদায় থাকায় সারারাত ধরে রাস্তায় লোকজনের যাতায়াত ছিল।

এর পরেই আসা যেতে পারে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের বিখ্যাত দিনলিপিতে। সোমবার সকালবেলাতেই তাঁকে খবর দেওয়া হয়েছিল, তিনি এলেন প্রায় একটার সময়ে, ডাফ স্ট্রিটের এক রোগিণীকে দেখে। তাঁর দিনলিপি—আমি তাকে মৃত দেখলাম—রাত একটায় তাঁর দেহাবসান ঘটেছে। তিনি বাম পাশ ফিরে শুয়ে ছিলেন। পদদ্বয় গুটানো, চক্ষুদ্বয় উন্মীলিত, মুখ কিঞ্চিৎ উন্মুক্ত। যাঁরা তখনও সমাধিভঙ্গের চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করে ডা. সরকার বললেন, একটা ছবি নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাক এবং সেই জন্যে নিজের ব্যাগ থেকে দশ টাকা বার করে দিলেন। সে দিন তোলা বেঙ্গল ফোটোগ্রাফারের দু’খানি ছবির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। কে সেখানে উপস্থিত এবং উপস্থিত নন, সে বিষয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধান হয়েছে। অন্তিম শয়ানে রামকৃষ্ণের দু’টি ছবি নিয়ে এখনও বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। বিদেশি সন্ন্যাসী গবেষক স্বামী বিদ্যাত্মানন্দের টীকা— ‘শ্রীরামকৃষ্ণের পার্থিব শরীর একটি সুসজ্জিত খাটের উপর শয়ান। কিঞ্চিৎ বাম দিকে কাত হয়ে। মুখমণ্ডল অতীব শীর্ণ। চক্ষুদ্বয় অর্ধনিমীলিত এবং বাহুদ্বয় দেহের উপর স্থাপিত। দক্ষিণপদ বামপদের উপর ন্যস্ত। ললাটের উপর চন্দনের প্রলেপ এবং কণ্ঠে মাল্যরাজি। খাটটি ফুল ও মালা দিয়ে ঢাকা, খাটের চারকোণে মশারি টাঙানোর চারটি ছতরি। পশ্চাতে কাশীপুর উদ্যানটির কিয়দংশ দৃশ্যমান। বাঁ দিকে বিছানার একটা স্তূপ দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত ঠাকুরের ব্যবহৃত, রৌদ্রে দেওয়া হয়েছে। প্রায় পঞ্চাশের বেশি ভক্ত ও সুহৃদ খাটের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন।’

বেঙ্গল ফোটোগ্রাফার্সের দু’টি ছবিই অনুরূপ। প্রভেদ এই যে, কয়েক জন ভক্ত তাঁদের স্থান পরিবর্তন করেছেন। একটিতে নরেন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বশরীরে একটি চাদর রয়েছে, অন্যটিতে তাঁর ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত।

স্বামী বিদ্যাত্মানন্দের টীকা— ‘প্রায় পাঁচটার সময় তাঁর পূতদেহ নীচের তলায় নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সেই সময়ে ফোটোগ্রাফ নেওয়া হয়েছিল। এক ঘণ্টা পরে শ্মশানযাত্রা। চিতার উপর দেহ স্থাপিত হল। ত্রৈলোক্য সান্যাল সুন্দর কয়েকটি ভজন গাইলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল।’ এই ত্রৈলোক্যনাথ (১৮৪০-১৯১৬) খ্যাতনামা গীতিকার ও গায়ক। ঠাকুরের প্রিয় গান ‘আমায় দে মা পাগল করে’, ‘গভীর সমাধিসিন্ধু অনন্ত অপার’ এঁরই রচনা। ছদ্মনামে রচিত এঁর ‘নববৃন্দাবন’ নাটকে নরেন্দ্রনাথ কয়েক বার অভিনয় করেন।

‘শ্মশানযাত্রার সময়ে একখণ্ড মেঘ থেকে বড় বড় দানার বৃষ্টি ঝরে পড়লো।’ দাহকার্য কতক্ষণে সম্পন্ন হয়েছিল তা নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন দু’ঘণ্টা, কেউ এক ঘণ্টা। কাশীপুর পুলিশ স্টেশনের ডেথ রেজিস্টারে খবর লেখাতে গিয়েছিলেন স্বামী অদ্বৈতানন্দ ১৯ অগস্ট ১৮৮৬। সেখানে মৃতের নাম—রামকৃষ্ট পরমহংস। বয়স ৫২। পেশা ‘প্রিচার’। মৃত্যুর কারণ—গলায় আলসার। খবর এনেছেন— গোপালচন্দ্র ঘোষ, ফ্রেন্ড। ইনিই পরবর্তী কালে স্বামী অদ্বৈতানন্দ।

শ্মশানে সাধকের দেহদাহ যে ত্যাগী ভক্তদের ইচ্ছায় হয়নি, তার ইঙ্গিত পরবর্তী কালে স্বামীজির চিঠিতেই পাওয়া যাচ্ছে। চার বছর পরে (২৬ মে ১৮৯০) তিনি প্রমদাদাস মিত্রকে লিখছেন, ‘ভগবান রামকৃষ্ণের শরীর নানা কারণে অগ্নি সমর্পণ করা হইয়াছিল। এই কার্য যে অতি গর্হিত তাহার আর সন্দেহ নাই। এক্ষণে তাঁহার ভস্মাবশেষ অস্থি সঞ্চিত আছে, উহা গঙ্গাতীরে কোন স্থানে সমাহিত করিয়া দিতে পারিলে উক্ত মহাপাপ হইতে কথঞ্চিৎ বোধ হয় মুক্ত হইব।’

এই দুঃখ থেকেই যে গঙ্গাতীরে বেলুড় মঠের সৃষ্টি ও রামকৃষ্ণমন্দিরে ‘আত্মারামের কৌটা’র সযত্ন সংরক্ষণ, তা বুঝতে কষ্ট হওয়া উচিত নয়।

তথ্যসূত্র :
স্বামী বিবেকানন্দ : পত্রাবলী, স্বামী অভেদানন্দ : আমার জীবনকথা, বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল : শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলামৃত, স্বামী প্রভানন্দ : শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ অন্ত্যলীলা, কালীজীবন দেবশর্মা : শ্রীরামকৃষ্ণ পরিক্রমা
সংগ্রহ
=======================

===========================================


শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীযুক্ত বঙ্কিম (১ম পর্ব)


প্রথম পরিচ্ছেদ

------------------------


1=শ্রীযুক্ত অধরলাল সেনের বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তসঙ্গে কীর্তনানন্দ ও

শ্রীযুক্ত বঙ্কীমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদির সঙ্গে কথোপকথন

----------------------------------------------------------------


আজ ঠাকুর অধরের বাড়িতে আসিয়াছেন; ২২শে অগ্রহায়ণ, কৃষ্ণা চতুর্থী তিথি, শনিবার, ইংরেজী ৬ই ডিসেম্বর, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দ। ঠাকুর পুষ্যানক্ষত্রে আগমন করিয়াছেন।


অধর ভারী ভক্ত, তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বয়ঃক্রম ২৯/৩০ বৎসর হইবে। ঠাকুর তাঁহাকে অতিশয় ভালবাসেন। অধরের কি ভক্তি! সমস্ত দিন অফিসের খাটুনির পর মুখে ও হাতে একটু জল দিয়াই প্রায় প্রত্যহই সন্ধ্যার সময় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করিতে যাইতেন। তাঁহার বাড়ি শোভাবাজার বেনেটোলা। সেখান হইতে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে ঠাকুরের কাছে গাড়ি করিয়া যাইতেন। এইরূপ প্রত্যহ প্রায় দুই টাকা গাড়িভাড়া দিতেন। কেবল ঠাকুরকে দর্শন করিবেন, এই আনন্দ। তাঁহার শ্রীমুখের কথা শুনিবেন, এমন সুবিধা প্রায় হইত না। পৌঁছিয়াই ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিতেন; কুশল প্রশ্নাদির পর তিনি মা-কালীকে দর্শন করিতে যাইতেন। পরে মেঝেতে মাদুর পাতা থাকিত সেখানে বিশ্রাম করিতেন। অধরের শরীর পরিশ্রমের জন্য এত অবসন্ন থাকিত যে, তিনি অল্পক্ষণমধ্যে নিদ্রাভিভূত হইতেন। রাত্রে ৯/১০টা সময় তাঁহাকে উঠাইয়া দেওয়া হইত। তিনিও উঠিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া আবার গাড়ীতে উঠিতেন। তৎপরে বাড়িতে ফিরিয়া যাইতেন।


অধর ঠাকুরকে প্রায়ই শোভাবাজারের বাড়িতে লইয়া যাইতেন। ঠাকুর আসিলে তথায় উৎসব পড়িয়া যাইত। ঠাকুর ও ভক্তদের লইয়া অধর খুব আনন্দ করিতেন ও নানারূপে তাঁহাদিগকে পরিতোষ করিয়া খাওয়াইতেন।


একদিন তাঁহার বাড়িতে গিয়াছেন। অধর বলিলেন, আপনি অনেকদিন এ-বাড়িতে আসেন নাই, ঘর মলিন হইয়াছিল; যেন কি একরকম গন্ধ হইয়াছিল; আজ দেখুন, ঘরের কেমন শোভা হইয়াছে! আর কেমন একটি সুগন্ধ হইয়াছে। আমি আজ ঈশ্বরকে ভারি ডেকেছিলাম। এমন কি চোখ দিয়ে জল পড়েছিল। ঠাকুর বলিলেন, “বল কি গো!” ও অধরের দিকে সস্নেহে তাকাইয়া হাসিতে লাগিলেন।


আজও উৎসব হইবে। ঠাকুরও আনন্দময় ও ভক্তেরা আনন্দে পরিপূর্ণ। কেননা যেখানে ঠাকুর উপস্থিত, সেখানে ঈশ্বরের কথা বৈ আর কোন কথাও হইবে না। ভক্তেরা আসিয়াছেন ও ঠাকুরকে দেখিবার জন্য অনেকগুলি নূতন নূতন লোক আসিয়াছে। অধর নিজে ডেপুটী ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি তাঁহার কয়েকটি বন্ধু ডেপুটী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছেন। তাঁহারা নিজে ঠাকুরকে দেখিবেন ও বলিবেন, যথার্থ তিনি মহাপুরুষ কিনা।


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যবদনে ভক্তদের সহিত কথা কহিতেছেন। এমন সময় অধর কয়েকটি বন্ধু লইয়া ঠাকুরের কাছে আসিয়া বসিলেন।


অধর (বঙ্কিমকে দেখাইয়া ঠাকুরের প্রতি) -- মহাশয়, ইনি ভারি পণ্ডিত, অনেক বই-টই লিখেছেন। আপনাকে দেখতে এসেছেন। ইঁহার নাম বঙ্কিমবাবু।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- বঙ্কিম! তুমি আবার কার ভাবে বাঁকা গো!


বঙ্কিম (হাসিতে হাসিতে) -- আজ্ঞে মহাশয়! জুতোর চোটে। (সকলের হাস্য) সাহেবের জুতোর চোটে বাঁকা।

========================================


2=ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ২য় পর্ব

--------------------------------------------------


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — বঙ্কিম! তুমি আবার কার ভাবে বাঁকা গো!


বঙ্কিম (হাসিতে হাসিতে) — আর মহাশয়! জুতোর চোটে। (সকলের হাস্য) সাহেবের জুতোর চোটে বাঁকা।


[বঙ্কিম ও রাধাকৃষ্ণ -- যুগলরূপের ব্যাখ্যা ]


শ্রীরামকৃষ্ণ — না গো, শ্রীকৃষ্ণ বঙ্কিম হয়েছিলেন। শ্রীমতীর প্রেমে ত্রিভঙ্গ হয়েছিলেন। কৃষ্ণরূপের ব্যাখ্যা কেউ কেউ করে, শ্রীরাধার প্রেমে ত্রিভঙ্গ। কালো কেন জানো? আর চৌদ্দপো, অত ছোট কেন? যতক্ষণ ঈশ্বরদূরে, ততক্ষণ কালো দেখায়, যেমন সমুদ্রের জল দূর থেকে নীলবর্ণ দেখায়। সমুদ্রের জলের কাছে গেলে ও হাতে করে তুললে আর কালো থাকে না, তখন খুব পরিষ্কার, সাদা। সূর্য দূরে বলে খুব ছোট দেখায়; কাছে গেলে আর ছোট থাকে না। সে অনেক দূরের কথা সমাধিস্থ না হলে হয় না। যতক্ষণ আমি তুমি আছে, ততক্ষণ নাম-রূপও আছে। তাঁরই সব লীলা। আমি তুমি যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ তিনি নানারূপে প্রকাশ হন।


“শ্রীকৃষ্ণ পুরুষ, শ্রীমতী তাঁর শক্তি — আদ্যাশক্তি। পুরুষ আর প্রকৃতি। যুগলমূর্তির মানে কি? পুরুষ আর প্রকৃতি অভেদ, তাঁদের ভেদ নাই। পুরুষ, প্রকৃতি না হলে থাকতে পারে না; প্রকৃতিও পুরুষ না হলে থাকতে পারে না। একটি বললেই আর একটি তার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে হবে। যেমন অগ্নি আর দাহিকাশক্তি। দাহিকাশক্তি ছাড়া অগ্নিকে ভাবা যায় না। আর অগ্নি ছাড়া দাহিকাশক্তি ভাবা যায় না। তাই যুগলমূর্তিতে শ্রীকৃষ্ণের দৃষ্টি শ্রীমতীর দিকে, ও শ্রীমতীর দৃষ্টি কৃষ্ণের দিকে। শ্রীমতীর গৌর বর্ণ বিদ্যুতের মতো, তাই কৃষ্ণ পীতাম্বর পরেছেন। শ্রীকৃষ্ণের বর্ণ নীল মেঘের মতো; তাই শ্রীমতী নীলাম্বর পরেছেন। আর শ্রীমতী নীলকান্ত মণি দিয়ে অঙ্গ সাজিয়েছেন। শ্রীমতীর পায়ে নূপুর, তাই শ্রীকৃষ্ণ নূপুর পরেছেন; অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের অন্তরে-বাহিরে মিল।”


এই কথাগুলি সমস্ত সাঙ্গ হইল, এমন সময়ে অধরের বঙ্কিমাদি বন্ধুগণ পরস্পর ইংরেজীতে আস্তে আস্তে কথা কহিতে লাগিলেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে বঙ্কিমাদির প্রতি) — কি গো। আপনারে ইংরাজীতে কি কথাবার্তা করছো? (সকলের হাস্য)


অধর — আজ্ঞে, এই বিষয় একটুকথা হচ্ছিল, কৃষ্ণরূপের ব্যাখ্যার কথা।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য সকলের প্রতি) — একটা কথা মনে পড়ে আমার হাসি পাচ্ছে। শুন, একটা গল্প বলি। একজন নাপিত কামাতে গিয়েছিল। একজন ভদ্রলোককে কামাচ্ছিল। এখন কামাতে কামাতে তার একটু লেগেছিল। আর সে লোকটি ড্যাম (Damn) বলে উঠেছিল। নাপিত কিন্তু ড্যামের মানে জানে না। তখন সে ক্ষুর-টুর সব সেখানে রেখে, শীতকাল, জামার আস্তিন গুটিয়ে বলে, তুমি আমায় ড্যাম বললে, এর মানে কি, এখন বল। সে লোকটি বললে, আরে তুই কামা না; ওর মানে এমন কিছু নয়, তবে একটু সাবধানে কামাস। নাপিত, সে ছাড়বার নয়, সে বলতে লাগল, ড্যাম মানে যদি ভাল হয়, তাহলে আমি ড্যাম, আমার বাপ ড্যাম, আমার চৌদ্দপুরুষ ড্যাম। (সকলের হাস্য) আর ড্যাম মানে যদি খারাপ হয়, তাহলে তুমি ড্যাম, তোমার বাবা ড্যাম, তোমার চৌদ্দপুরুষ ড্যাম। (সকলের হাস্য) আর শুধু ড্যাম নয়। ড্যাম ড্যাম ড্যাম ড্যা ড্যাম ড্যাম। (সকলের উচ্চ হাস্য)



=====================================


3>শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ৩য় পর্ব

------------------------------------


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও প্রচারকার্য


সকলের হাস্য থামিলে পর, বঙ্কিম আবার কথা আরম্ভ করিলেন।


বঙ্কিম — মহাশয়, আপনি প্রচার করেন না কেন?


শ্রীরামকৃষ্ণ (হাসিতে হাসিতে) — প্রচার! ওগুলো অভিমানের কথা। মানুষ তো ক্ষুদ্র জীব। প্রচার তিনিই করবেন, যিনি চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করে এই জগৎ প্রকাশ করেছেন। প্রচার করা কি সামান্য কথা? তিনি সাক্ষাৎকার হয়ে আদেশ না দিলে প্রচার হয় না। তবে হবে না কেন? আদেশ হয়নি তুমি বকে যাচ্ছ; ওই দুদিন লোকে শুনবে তারপর ভুলে যাবে। যেমন একটা হুজুক আর কি! যতক্ষণ তুমি বলবে ততক্ষণ লোকে বলবে, আহা ইনি বেশ বলছেন। তুমি থামবে, তারপর কোথাও কিছুই নাই!


“যতক্ষণ দুধের নিচে আগুন জ্বাল রয়েছে, ততঁন দুধটা ফোঁস করে ফুলে উঠে। জ্বালও টেনে নিলে, আর দুধও যেমন তেমনি! কমে গেল।


“আর সাধন করে নিজের শক্তি বাড়াতে হয়। তা না হলে প্রচার হয় না। ‘আপনি শুতে স্থান পায় না, শঙ্করাকে ডাকে।’ আপনারই শোবার জায়গা নাই, আবার ডাকে ওরে শঙ্করা আয়, আমার কাছে শুবি আয়। (হাস্য)


“ও-দেশে হালদার পুকুরের পাড়ে রোজ বাহ্যে করে যেত, লোকে সকালে এসে দেকে গালাগালি দিত। লোক গালাগালি দেয় তবু বাহ্যে আর বন্ধ হয় না। শেষে পাড়ার লোক দরখাস্ত করে কোম্পানিকে জানালে। তারা একটি নোটিশ মেরে দিলে — ‘এখানে বাহ্যে, প্রস্রাব করিও না; তা করিলে শাস্তি পাইবে।’ তখন একেবারে সব বন্ধ। আর কোনও গোলযোগ নাই। কোম্পানির হুকুম — সকলের মানতে হবে।


“তেমনি ঈশ্বর সাক্ষাৎকার হয়ে যদি আদেশ দেন, তবেই প্রচার হয়; লোকশিক্ষা হয়, তা না হলে কে তোমার কথা শুনবে?”


এই কথাগুলি সকলে গম্ভীরভাবে স্থির হইয়া শুনিতে লাগিলেন।

==================================


4>শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ৪র্থ পর্ব

-----------------------------------------


[শ্রীযুক্ত বঙ্কিম ও পরকাল ]

[Life after Death -- argument from analogy]
----------------------------------------------------------


শ্রীরামকৃষ্ণ (বঙ্কিমের প্রতি) — আচ্ছা, আপনি তো খুব পণ্ডিত, আর কত বই লিখেছ; আপনি কি বলো, মানুষের কর্তব্য কি? কি সঙ্গে যাবে? পরকাল তো আছে?


বঙ্কিম — পরকাল! সে আবার কি?


শ্রীরামকৃষ্ণ — হাঁ, জ্ঞানের পর আর অন্যলোকে যেতে হয় না, — পুনর্জন্ম হয় না। কিন্তু যতক্ষণ না জ্ঞান হয়, ঈশ্বরলাভ হয়, ততক্ষণ সংসারে ফিরে আসতে হয়, কোনমতে নিস্তার নাই। ততক্ষণ পরকালও আছে। জ্ঞানলাভ হলে, ঈশ্বরদর্শন হলে মুক্তি হয়ে যায় — আর আসতে হয় না। সিধোনো-ধান পুঁতলে আর গাছ হয় না। জ্ঞানাগ্নিতে সিদ্ধ যদি কেহ হয় তাকে নিয়ে আর সৃষ্টির খেলা হয় না। সে সংসার করতে পারে না, তার তো কামিনী-কাঞ্চনে আসক্তি নাই। সিধোনো-ধান আর ক্ষেতে পুতলে কি হবে?


বঙ্কিম (হাসিতে হাসিতে) — মহাশয়, তা আগাছাতেও কোন গাছের কাজ হয় না।


শ্রীরামকৃষ্ণ — জ্ঞানী তা বলে আগাছা নয়। যে ঈশ্বরদর্শন করেছে, সে অমৃত ফল লাভ করেছে — লাউ, কুমড়া ফল নয়! তার পুনর্জন্ম হয় না। পৃথিবী বল, সূর্যলোক বল, চন্দ্রলোক — কোনও জায়গায় তার আসতে হয় না।


“উপমা — একাদেশী। তুমি তো পণ্ডিত, ন্যায় পড় নাই? বাঘের মতো ভয়ানক বললে যে বাঘের মতো একটা ভয়ানক ন্যাজ কি হাঁড়ি মুখ থাকবে তা নয়। (সকলের হাস্য)


“আমি কেশব সেনকে ওই কথা বলেছিলাম। কেশব জিজ্ঞাসা করলে — মহাশয়, পরকাল কি আছে? আমি না এদিক না ওদিক বললাম! বললাম, কুমোররা হাঁড়ি শুকোতে দেয়, তার ভিতর পাকা হাঁড়িও আছে, আবার কাঁচা হাঁড়িও আছে। কখনও গরুটরু এলে হাঁড়ি মাড়িয়ে দেয়। পাকা হাঁড়ি ভেঙে গেলে কুমোর সেগুলোকে ফেলে দেয়। কিন্তু কাঁচা হাঁড়ি ভেঙে গেলে সেগুলি কুমোর আবার ঘরে আনে; এনে জল দিয়ে মেখে আবার চাকে দিয়ে নূতন হাঁড়ি করে, ছাড়ে না। তাই কেশবকে বললুম, যতক্ষণ কাঁচা থাকবে কুমোর ছাড়বে না; যতক্ষণ না জ্ঞানলাভ হয়, যতক্ষণ না ঈশ্বর দর্শন হয়, ততক্ষণ কুমোর আবার চাকে দেবে; ছাড়বে না, অর্থাৎ ফিরে ফিরে এ সংসারে আসতে হবে, নিস্তার নাই। তাঁকে লাভ করলে তবে মুক্তি হয়, তবে কুমোর ছাড়ে, কেননা, তার দ্বারা মায়ার সৃষ্টির কোন কাজ আসে না। জ্ঞানী মায়াকে পার হয়ে গেছে। সে আর মায়ার সংসারে কি করবে।


“তবে কারুকে কারুকে তিনি রেখে দেন, মায়ার সংসারে লোকশিক্ষার জন্য। লোকশিক্ষা দিবার জন্য জ্ঞানী বিদ্যামায়া আশ্রয় করে থাকে। সে তাঁর কাজের জন্য তিনিই রেখে দেন; যেমন শুকদেব, শঙ্করাচার্য।


(বঙ্কিমের প্রতি) — “আচ্ছা, আপনি কি বল, মানুষের কর্তব্য কি?”


বঙ্কিম (হাসিতে হাসিতে) — আজ্ঞা, তা যদি বলেন, তাহলে আহার, নিদ্রা ও মৈথুন।
===================================


5=শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ৫ম পর্ব

-----------------------------------------


(বঙ্কিমের প্রতি) — “আচ্ছা, আপনি কি বল, মানুষের কর্তব্য কি?”


বঙ্কিম (হাসিতে হাসিতে) — আজ্ঞা, তা যদি বলেন, তাহলে আহার, নিদ্রা ও মৈথুন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া) — এঃ! তুমি তো বড় ছ্যাঁচড়া! তুমি যা রাতদিন কর, তাই তোমার মুখে বেরুচ্ছে। লোকে যা খায়, তার ঢেকুর উঠে। মূলো খেলে মূলোর ঢেকুর উঠে। ডাব খেলে ডাবের ঢেকুর উঠে। কামিনী-কাঞ্চনের ভিতর রাতদিন রয়েছো আর ওই কথাই মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে! কেবল বিষয়চিন্তা করলে পাটোয়ারি স্বভাব হয়, মানুষ কপট হয়। ঈশ্বরচিন্তা করলে সরল হয়, ঈশ্বর সাক্ষাৎকার হলে ও-কথা কেউ বলবে না।


[শ্রীযুক্ত বঙ্কিম -- শুধু পাণ্ডিত্য ও কামিনী-কাঞ্চন ]


(বঙ্কিমের প্রতি) — “শুধু পাণ্ডিত্য হলে কি হবে, যদি ঈশ্বরচিন্তা না থাকে? যদি বিবেক-বৈরাগ্য না থাকে? পাণ্ডিত্য কি হবে, যদি কামিনী-কাঞ্চনে মন থাকে?


“চিল শকুনি খুব উঁচুতে উঠে, কিন্তু ভাগাড়ের কদিকে কেবল নজর! পণ্ডিত অনেক বই শাস্ত্র পড়েছে, শোলোক ঝাড়তে পারে, কি বই লিখেছে, কিন্তু মেয়েমানুষে আসক্ত, টাকা, মান সার বস্তু মনে করেছে; সে আবার পণ্ডিত কি? ঈশ্বরে মন না থাকলে পণ্ডিত কি?


“কেউ কেউ মনে করে এরা কেবল ঈশ্বর ঈশ্বর করছে, পাগলা। এরা বেহেড হয়েছে। আমরা কেমন স্যায়না, কেমন সুখভোগ করছি; টাকা, মান, ইন্দ্রিয়সুখ। কাকও মনে করে, আমি বড় স্যায়না, কিন্তু সকালবেলা উঠেই পরের গু খেয়ে মরে। কাক দেখো না কত উড়ুর পুড়ুর করে, ভারী স্যায়না! (সকলে স্তব্ধ)


“যারা কিন্তু ঈশ্বরচিন্তা করে, বিষয়ে আসক্তি, কামিনী-কাঞ্চনে ভালবাসা চলে যাবার জন্য রাতদিন প্রার্থনা করে, যাদের বিষয়রস তেঁতো লাগে, হরিপাদপদ্মের সুধা বই আর কিছু ভাল লাগে না, তাদের স্বভাব যেমন হাঁসের স্বভাব। হাঁসের সুমুখে দুধেজলে দাও, জল ত্যাগ করে দুধ খাবে। আর হাঁসের গতি দেখেছো? একদিকে সোজা চলে যাবে। শুদ্ধভক্তের গতিও কেবল ঈশ্বরের দিকে। সে আর কিছু চায় না; তার আর কিছু ভাল লাগে না।


(বঙ্কিমের প্রতি কোমলভাবে) — “আপনি কিছু মনে করো না।”


বঙ্কিম — আজ্ঞা, মিষ্টি শুনতে আসিনি।
======================================


6=শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ৬ষ্ঠ পর্ব

-----------------------------------------


চতুর্থ পরিচ্ছেদ


আগে বিদ্যা (Science) না আগে ঈশ্বর

---------------------------------------


শ্রীরামকৃষ্ণ (বঙ্কিমের প্রতি) — কেউ কেউ মনে করে শাস্ত্র না পড়লে, বই না পড়লে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না। তারা মনে করে, আগে জগতের বিষয়, জীবের বিষয় জানতে হয়, আগে সায়েন্স পড়তে হয়। (সকলের হাস্য) তারা বলে ঈশ্বরের সৃষ্টি এ-সব না বুঝলে ঈশ্বরকে জানা যায় না। তুমি কি বল? আগে সায়েন্স না আগে ঈশ্বর?


বঙ্কিম — হাঁ, আগে পাঁচটা জানতে হয়, জগতের বিষয়। একটু এ দিককার জ্ঞান না হলে, ঈশ্বর জানব কেমন করে? আগে পড়াশুনা করে জানতে হয়।


শ্রীরামকৃষ্ণ — ওই তোমাদের এক। আগে ঈশ্বর, তারপর সৃষ্টি। তাঁকে লাভ করলে, দরকার হয়তো সবই জানতে পারবে।


“যদি যদু মল্লিকের সঙ্গে আলাপ করতে পারো জো-সো করে, তাহলে যদি তোমার ইচ্ছা থাকে, যদু মল্লিকের কখানা বাড়ি, কত কোম্পানির কাগজ, কখানা বাগান, এও জানতে পারবে। যদু মল্লিকই বলে দেবে। কিন্তু তার সঙ্গে যদি আলাপ না হয়, বাড়ি ঢুকতে গেলে দারোয়ানেরা যদি না ঢুকতে দেয়, তাহলে কখানা বাড়ি, কত কোম্পানির কাগজ, কখানা বাগান, এ-সব ঠিক খবর কেমন করে যানবে? তাঁকে জানলে সব জানা যায়, কিন্তু সামান্য বিষয় জানবার আকাঙ্ক্ষা থাকে না। বেদেও এ-কথা আছে। যতক্ষণ না লোকটিকে দেখা যায়, ততক্ষণ তার গুণের কথা কওয়া যায়; সে যেই সামনে আসে, তখন ও-সব কথা বন্ধ হয়ে খায়। লোকে তাকে নিয়েই মত্ত হয়, তার সঙ্গে আলাপ করে বিভোর হয়, তখন আর অন্য কথা থাকে না।


“আগে ঈশ্বরলাভ, তারপর সৃষ্টি বা অন্য কথা। বাল্মীকিকে রামমন্ত্র জপ করতে দেওয়া হল, কিন্তু তাকে বলা হল, ‘মরা’ ‘মরা’ জপ করো। ‘ম’ মানে ঈশ্বর আর ‘রা’ মানে জগৎ। আগে ঈশ্বর তারপর জগৎ, এককে জানলে সব জানা যায়। ১-এর পর যদি পঞ্চাশটা শূন্য থাকে অনেক হয়ে যায়। ১কে পুছে ফেললে কিছুই থাকে না। ১কে নিয়েই অনেক। এক আগে, তারপর অনেক; আগে ঈশ্বর[3] তারপর জীবজগৎ।


“তোমার দরকার ঈশ্বরকে লাভ করা! তুমি অত জগৎ, সৃষ্টি, সায়েন্স, ফায়েন্স এ-সব করছো কেন? তোমার আম খাবার দরকার। বাগানে কত শ আমগাছ, কত হাজার ডাল, কত লক্ষ কোটি পাতা, এ-সব খবরে তোমার কাজ কি? তুই আম খেতে এসেছিস আম খেয়ে যা। এ-সংসারে মানুষ এসেছে ভগবানলাভের জন্য। সেটি ভুলে নানা বিষয়ে মন দেওয়া ভাল নয়। আম খেতে এসেছিস আম খেয়েই যা।”

============================================


7th is phoyos
=============================================

8=শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ৮ম পর্ব

---------------------------------------------


শ্রীযুক্ত বঙ্কিম ও ভক্তিযোগ — ঈশ্বরপ্রেম


বঙ্কিম (ঠাকুরের প্রতি) — মহাশয়, ভক্তি কেমন করে হয়?


শ্রীরামকৃষ্ণ — ব্যাকুলতা। ছেলে যেমন মার জন্য মাকে না দেখতে পেয়ে দিশেহারা হয়ে কাঁদে, সেই রকম ব্যাকুল হয়ে ঈশ্বরের জন্য কাঁদলে ঈশ্বরকে লাভ করা পর্যন্ত যায়।


“অরুণোদয় হলে পূর্বদিক লাল হয়, তখন বোঝা যায় যে, সূর্যোদয়ের আর দেরি নাই। সেইরূপ যদি কারও ঈশ্বরের জন্য প্রাণ ব্যাকুল হয়েছে দেখা যায়, তখন বেশ বুঝতে পারা যায় যে, এ ব্যক্তির ঈশ্বরলাভের আর বেশি দেরি নাই।


“একজন গুরুকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মহাশয়, বলে দিন ঈশ্বরকে কেমন করে পাব। গুরু বললে, এসো আমি তোমায় দেখিয়ে দিচ্ছি। এই বলে তাকে সঙ্গে করে একটি পুকুরের কাছে নিয়ে গেল। দুই জনেই জলে নামল, এমন সময় হঠাৎ গুরু শিষ্যকে ধরে জলে চুবিয়ে ধরলে। খানিক পরে ছেড়ে দিবার পর শিষ্য মাথা তুলে দাঁড়াল। গুরু জিজ্ঞাসা করলে, তোমার কি রকম বোধ হচ্ছিল? শিষ্য বললে, প্রাণ যায় যায় বোধ হচ্ছিল, প্রাণ আটু-পাটু করছিল। তখন গুরু বললে, ঈশ্বরের জন্য যখন প্রাণ ওইরূপ আটু-পাটু করবে, তখন জানবে যে, তাঁর সাক্ষাৎকারের দেরি নাই।


“তোমায় বলি, উপরে ভাসলে কি হবে? একটু ডুব দাও। গভীর জলের নিচে রত্ন রয়েছে, জলের উপর হাত-পা ছুঁড়লে কি হবে? ঠিক মাণিক ভারী হয়, জলে ভাসে না; তলিয়ে গিয়ে জলের নিচে থাকে। ঠিক মাণিক লাভ করতে গেলে জলের ভিতর ডুব দিতে হয়।”


বঙ্কিম — মহাশয়, কি করি, পেছনে শোলা বাঁধা আছে। (সকলের হাস্য) ডুবতে দেয় না।


শ্রীরামকৃষ্ণ — তাঁকে স্মরণ করলে সব পাপ পেটে যায়। তাঁর নামেতে কালপাথ কাটে। ডুব দিতে হবে, তা না হলে রত্ন পাওয়া যাবে না। একটা গান শোন:


ডুব্‌ ডুব্‌ ডুব্‌ রূপ-সাগরে আমার মন।

তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবে রে প্রেমরত্নধন ৷৷

খুঁজ খুঁজ খুঁজলে পাবি হৃদয়মাঝে বৃন্দাবন।

দীপ্‌ দীপ্‌ দীপ্‌ জ্ঞানের বাতি জ্বলবে হৃদে অনুক্ষণ ৷৷

ড্যাং ড্যাং ড্যাং ড্যাঙ্গায় ডিঙে চালায় আবার সে কোন্‌ জন।

কুবীর বলে শোন্‌ শোন্‌ শোন্‌ ভাব গুরুর শ্রীচরণ ৷৷


ঠাকুর তাঁহার সেই দেবদুর্লভ মধুর কণ্ঠে এই গানটি গাইলেন। সভাসুদ্ধ লোক আকৃষ্ট হইয়া একমনে এই গান শুনিতে লাগিলেন। গান সমাপ্ত হইলে আবার কথা আরম্ভ হইল।

==========================================


9=ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - ৯ম পর্ব


['কেশব কেশব' 'গোপাল গোপাল']

---------------------------------------


শ্রীরামকৃষ্ণ (বঙ্কিমের প্রতি) -- কেউ কেউ ডুব দিতে চায় না। তারা বলে, ঈশ্বর ঈশ্বর করে বাড়াবাড়ি করে শেষকালে কি পাগল হয়ে যাব? যারা ঈশ্বরের প্রেমে মত্ত, তাদের তারা বলে, বেহেড হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই সব লোক এটি বোঝে না যে সচ্চিদানন্দ অমৃতের সাগর।


আমি নরেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মনে কর যে, এক খুলি রস আছে, আর তুই মাছি হয়েছিস; তুই কোন্‌খানে বসে রস খাবি? নরেন্দ্র বললে, আড়ায় (কিনারায়) বসে মুখ বাড়িয়ে খাব। আমি বললুম, কেন? মাঝখানে গিয়ে ডুবে খেলে কি দোষ? নরেন্দ্র বললে, তাহলে যে রসে জড়িয়া মরে যাব। তখন আমি বললুম, বাবা সচ্চিদানন্দ-রস তা নয়, এ-রস অমৃত রস, এতে ডুবলে মানুষ মরে না; অমর হয়। “তাই বলছি ডুব দাও। কিছু ভয় নেই, ডুবলে অমর হয়।”


এইবার বঙ্কিম ঠাকুরকে প্রণাম করিলেন -- বিদায় গ্রহণ করিবেন।


বঙ্কিম -- মহাশয়, যত আহাম্মক আমাকে ঠাওরেছেন তত নয়। একটি প্রার্থনা আছে -- অনুগ্রহ করে কুটিরে একবার পায়ের ধুলা --


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তা বেশ তো, ঈশ্বরের ইচ্ছা।


বঙ্কিম -- সেখানেও দেখবেন, ভক্ত আছে।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- কি গো! কি রকম সব ভক্ত সেখানে? যারা গোপাল গোপাল, কেশব কেশব বলেছিল, তাদের মতো কি? (সকলের হাস্য)


একজন ভক্ত -- মহাশয়, গোপাল, গোপাল, ও গল্পটি কি?


শ্রীরামকৃষ্ণ (হাসিতে হাসিতে) -- তবে গল্পটি বলি শোন। এক জায়গায় একটি স্যাকরার দোকান আছে। তারা পরম বৈষ্ণব, গলায় মালা, তিলক সেবা, প্রায় হাতে হরিনামের ঝুলি আর মুখে সর্বদাই হরিনাম। সাধু বললেই হয়, তবে পেটের জন্য স্যাকরার কর্ম করা; মাগছেলেদের তো খাওয়াতে হবে। পরম বৈষ্ণব, এই কথা শুনে অনেক খরিদ্দার তাদেরই দোকানে আসে; কেননা, তারা জানে যে, এদের দোকানে সোনা-রূপা গোলমাল হবে না। খরিদ্দার দোকানে গিয়ে দেখে যে, মুখে হরিনাম, করছে, আর বসে বসে কাজকর্ম করছে। খরিদ্দার যাই গিয়ে বসল, একজন বলে উঠল, ‘কেশব! কেশব! কেশব!’ খানিকক্ষণ পরে আর-একজন বলে উঠল, ‘গোপাল! গোপাল! গোপাল!’ আবার একটু কতাবার্তা হতে না হতেই আর-একজন বলে উঠল -- ‘হরি! হরি! হরি!’ গয়না গড়বার কথা যখন একরকম ফুরিয়ে এল, তখন আর-একজন বলে উঠলো -- ‘হর! হর! হর! হর!’ কাজে কাজেই এত ভক্তি প্রেম দেখে তারা স্যাকরাদের কাছে টাকাকড়ি দিয়ে নিশ্চিন্ত হল; জানে যে এরা কখনও ঠকাবে না।


“কিন্তু কথা কি জানো? খরিদ্দার আসবার পর যে বলেছিল ‘কেশব! কেশব!’ তার মানে এই, এরা সব কে? অর্থাৎ যে খরিদ্দারেরা আসলো এরা সব কে? যে বললে, ‘গোপাল! গোপাল!’ তার মানে এই, এরা দেখছি গোরুর পাল, গোরুর পাল। যে বললে, ‘হরি! হরি!’ তার মানে এই, যেকালে দেখছি গোরুর পাল, সে স্থলে তবে ‘হরি’ অর্থাৎ হরণ করি। আর যে বললে, ‘হর! হর!’ তার মানে এই যেকালে গোরুর পাল দেখছো, সেকালে সর্বস্ব হরণ কর।’ এই তারা পরমভক্ত সাধু।” (সকলের হাস্য)


বঙ্কিম বিদায় গ্রহণ করিলেন। কিন্তু একাগ্র হয়ে কি ভাবিতেছিলেন। ঘরের দরজার কাছে আসিয়া দেখেন, চাদর ফেলিয়া আসিয়াছেন। গায়ে শুধু জামা। একটি বাবু চাদরখানি কুড়াইয়া লইয়া ছুটিয়া আসিয়া চাদর তাঁহার হস্তে দিলেন। বঙ্কিম কি ভাবিতেছিলেন?


রাখাল আসিয়াছেন। তিনি বৃন্দাবনধামে বলরামের সঙ্গে গিয়াছিলেন। সেখান হইতে কিছুদিন ফিরিয়াছিলেন। ঠাকুর তাঁহার কথা শরৎ ও দেবেন্দ্রের কছে বলিয়াছিলেন ও তাঁহার সহিত আলপা করিতে তাঁহাদের বলিয়াছিলেন। তাই তাঁহারা রাখালের সঙ্গে আলাপ পরিতে উৎসুক হইয়া আসিয়াছিলেন। শুনিলেন, এঁরই নাম রাখাল।


শরৎ ও সান্যাল এঁরা ব্রাহ্মণ, অধর সুবর্ণবণিক। পাছে গৃহস্বামী খাইতে ডাকেন, তাই তাড়াতাড়ি পলাইয়া গেলেন। তাঁহারা নূতন আসিতেছেন; এখনও জানেন না, ঠাকুর অধরকে কত ভালবাসেন। ঠাকুর বলেন, “ভক্ত একটি পৃথক জাতি। সকলেই এক জাতীয়।”


অধর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে ও সমবেত ভক্তদের অতি যত্নপূর্বক আহ্বান করিয়া পরিতোষ করিয়া খাওয়াইলেন। ভোজনানন্তে ভক্তগণ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মধুর কথাগুলি স্মরণ করিতে করিতে তাঁহার অদ্ভুত প্রেমের ছবি হৃদয়ে গ্রহণপূর্বক গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন।


অধরের বাটীতে শুভাগমনের দিনে শ্রীযুক্ত বঙ্কিম শ্রীরামকৃষ্ণকে তাঁহার বাটীতে যাইবার জন্য অনুরোধ করাতে তিনি কিছুদিন পরে শ্রীযুক্ত গিরিশ ও মাস্টারকে তাঁহার সান্‌কীভাঙার বাসায় পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাঁহাদের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে অনেক কথা হয়। ঠাকুরকে আবার দর্শন করিতে আসিবার ইচ্ছা বঙ্কিম প্রকাশ করেন, কিন্তু কার্যগতিকে আর আসা হয় নাই।
==================================

10=ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও বঙ্কিমচন্দ্র - সমাপ্তি পর্ব।


---------------------------------------------------


[দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চবটীমূলে ‘দেবী চৌধুরানী’ পাঠ ]


৬ই ডিসেম্বর, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে শ্রীযুক্ত অধরের বাটীতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শুভাগমন করিয়াছিলেন ও শ্রীযুক্ত বঙ্কিমবাবুর সহিত আলাপ করিয়াছিলেন। প্রথম হইতে ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে এই সব কথা বিবৃত হইল।


এই ঘটনার কিছুদিন পরে অর্থাৎ ২৭শে ডিসেম্বর, শনিবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পঞ্চবটীমূলে দক্ষিণেশ্বরে ভক্তসঙ্গে বঙ্কিম প্রণীত দেবী চৌধুরাণীর কতক অংশ পাঠ শুনিয়াছিলেন ও গীতোক্ত নিষ্কাম কর্মের বিষয় অনেক কথা বলিয়াছিলেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ পঞ্চবটীমূলে চাতালের উপর অনেক ভক্তসঙ্গে বসিয়াছিলেন। মাস্টারকে পাঠ করিয়া শুনাইতে বলিলেন। কেদার, রাম, নিত্যগোপাল, তারক (শিবানন্দ), প্রসন্ন (ত্রিগুণাতীত), সুরেন্দ্র প্রভৃতি অনেকে উপস্থিত ছিলেন। (সমাপ্ত)

-----------------------------------------------------------------
===========================================

শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ দেব — দুটি জ্ঞানের লক্ষণ।
প্রথম কূটস্থ বুদ্ধি। হাজার দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-বিঘ্ন হোক — নির্বিকার, যেমন কামারশালের লোহা, যার উপর হাতুড়ি দিয়ে পেটে।

আর, দ্বিতীয়, পুরুষকার — খুব রোখ। কাম-ক্রোধে আমার অনিষ্ট কচ্ছে তো একেবারে ত্যাগ! কচ্ছপ যদি হাত-পা ভিতরে সাঁদ করে, চারখানা করে কাটলেও আর বার করবে না।"

বৈরাগ্য--------তিন প্রকার

তীব্র বৈরাগ্য, মন্দা বৈরাগ্য ও মর্কট বৈরাগ্য,

— “বৈরাগ্য দুইপ্রকার। তীব্র বৈরাগ্য আর মন্দা বৈরাগ্য।
মন্দা বৈরাগ্য — হচ্ছে হবে — ঢিমে তেতালা।
তীব্র বৈরাগ্য — শাণিত ক্ষুরের ধার — মায়াপাশ কচকচ করে কেটে দেয়।"

“কোনও চাষা কতদিন ধরে খাটছে — পুষ্করিণীর জল ক্ষেতে আসছে না। মনে রোখ নাই। আবার কেউ দু-চারদিন পরেই — আজ জল আনব তো ছাড়ব, প্রতিজ্ঞা করে। নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ। সমস্ত দিন খেটে সন্ধ্যার সময় যখন জল কুলকুল করে আসতে লাগল, তখন আনন্দ। তারপর বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে বলে — ‘দে এখন তেল দে নাইব।’ নেয়ে খেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নিদ্রা।"

“একজনের পরিবার বললে, ‘অমুক লোকের ভারী বৈরাগ্য হয়েছে, তোমার কিছু হল না!’ যার বৈরাগ্য হয়েছে, সে লোকটির ষোলজন স্ত্রী, — এক-একজন করে তাদের ত্যাগ করছে।"

“সোয়ামী নাইতে যাচ্ছিল, কাঁধে গামছা, — বললে, ‘ক্ষেপী! সে লোক ত্যাগ করতে পারবে না, — একটু একটু করে কি ত্যাগ হয়! আমি ত্যাগ করতে পারব। এই দেখ, — আমি চললুম!’"

 "সে বাড়ির গোছগাছ না করে — সেই অবস্থায় — কাঁধে গামছা — বাড়ি ত্যাগ করে, চলে গেল। — এরই নাম তীব্র বৈরাগ্য।"

 "আর-একরকম বৈরাগ্য তাকে বলে মর্কট বৈরাগ্য। সংসারের জ্বালায় জ্বলে গেরুয়া বসন পরে কাশী গেল। অনেকদিন সংবাদ নাই। তারপর একখানা চিঠি এল — ‘তোমরা ভাবিবে না, আমার এখানে একটি কর্ম হইয়াছে।’"

“সংসারের জ্বালা তো আছেই! মাগ অবাধ্য, কুড়ি টাকা মাইনে, ছেলের অন্নপ্রাশন দিতে পারছে না, ছেলেকে পড়াতে পারছে না — বাড়ি ভাঙা, ছাত দিয়ে জল পড়ছে; — মেরামতের টাকা নাই।"

“তাই ছোকরারা এলে আমি জিজ্ঞাসা করি, তোর কে কে আছে?"

—ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত থেকে।
======================

    ভুতুড়ে  কারবার  

                                     ( ১ )

                   স্বামীজী ভূত বিশ্বাস করতেন না ।  ঠাকুরকে বললেন, " যদি দেখাতে পারেন তো ভূত বিশ্বাস করব ।"  ঠাকুর একটা স্থানে স্বামীজীকে যেতে বললেন ।  স্বামীজী সেখানে গিয়ে ফিরে এসে বললেন, " ও বাবা, সেখানে যে একেবারে ভূতের টোলা !"

                     বরাহনগর মঠটি ছিল ভূতের বাড়ি ।  গাঙ্গুলী রাঁধুনি নিচে একটু অন্ধকার অন্ধকার রান্নাঘরে ইলিশ মাছ ভাজছে ।  দেখে কী ------- পাশে একটা ছায়াময় মূর্তি দাঁড়িয়ে ।  সে আবার মাছের জন্য হাত বাড়াচ্ছে ।  আর যায় কোথায় !  'মশাই গো' বলে গাঙ্গুলী চিৎকার করে উঠল ।  " মশাই গো, এসব কী ?  আমি আর এখানে থাকব না " ------- বলে পলায়ন ।

গোপাললাল শীলের বাগানে স্বামীজী বাথরুমে গিয়েছেন আর শুনছেন চিৎকার ------ " ওগো কে আছ, আমায় রক্ষা করো । "   দেখলেন একটি প্রেতমূর্তি ।  অনুসন্ধানে একজন পুরাতন কর্মচারী জানাল যে, আগে এখানে বিলাসখানার আবাস ( বাগানবাড়ি ) ছিল ।  তখন নাকি একটি মেয়েকে মেরে রাতারাতি দেয়ালে গেঁথে ফেলা হয় ।

              --------- স্বামী অম্বিকানন্দ ।

====================

ঠাকুরের ডাক্তার
****************
শ্রীরামকৃষ্ণের ডাক্তার, ঘোর নাস্তিক, দুর্মুখ, দুঃসাহসী! শ্রীরামকৃষ্ণকে ধমকাতেন আর 'তুমি' করে কথা বলতেন একজনই। তিনি হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'দ্বিতীয় এম.ডি ডাক্তার, ধন্বন্তরি'। লোকে মরা মানুষ কাঁধে করে নিয়ে এসে বলতো, ডাক্তারবাবু আপনি বাঁচিয়ে দিন। এমন ডাক্তারের ফি ছিল সর্বকালীন রেকর্ড! কত? 

১৮৬৫ সালে তাঁর ফি ছিল ৩২ টাকা! তখন সাহেব ডাক্তারের সর্বোচ্চ ফি ছিল ১৬ টাকা। তাহলে  বুঝতেই পারছেন কত বড় ডাক্তার ছিলেন!
তাহলে তাঁর নামটা এবার বলি। তিনি হলেন 'ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার!' একটি নাম! একটি আলোকবর্তিকা! 

"আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর... "

আনন্দলোকে জন্ম নিলেন মহেন্দ্রলাল সরকার (১৮৩৩- ১৯০৪)। হাওড়া জেলার পাইকপাড়ায়। স্কুল হেয়ার। সেখান থেকে দারুণ রেজাল্ট করে হিন্দু কলেজ (এখন প্রেসিডেন্সি)। সেখান থেকে দারুণ রেজাল্ট করে এলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়তে। সেখানেই তাঁর প্রতিভা দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন শিক্ষকরা।  তিনি যখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র তখন মেডিকেল শিক্ষকরা তাঁকে মাঝেমধ্যে সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসে ছাত্রদের লেকচার দিতে পাঠাতেন। এটা রেকর্ড!
১৮৬০ সালে মেডিকেল কলেজ থেকে সসম্মানে মেডিসিন, সার্জারি, মিডওয়াইফেরিতে (গাইনোকলজি বিষয়ক) অনার্স নিয়ে পাস করলেন। এরপর ১৮৬৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.ডি করলেন। তিনিই হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় এম.ডি। 

এরপর প্র্যাকটিস। ফি হলো ৩২ টাকা। আজ পর্যন্ত এতো ফি কোন ডাক্তারের হয়নি। সালটা হলো ১৮৬৫ ৷
দারুণ মেজাজ। কঠোর নিয়ম মেনে চলেন। লোকে ভয় পেতো। নাম হলো দুর্মুখ ডাক্তার।
পুরো প্রফেশনাল। বড়লোকদের ১ টাকাও ছাড় নেই।  আবার গরীবদের ভগবান, বিনাপয়সায়।
চিরকাল হোমিওপ্যাথিকে নিয়ে মজা করে এসেছেন। হঠাৎ হোমিওপ্যাথি লাইনে এলেন। হয়ে গেলেন এ্যালোপ্যাথি থেকে ১ নম্বর হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। ফিস সেই ৩২ টাকা। কম নেই।

"আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি - আমার যতো বিত্ত প্রভু, আমার যতো বাণী।"

ঠিক তাই। তাঁর যে সমাজকে অনেক কিছু দিতে হবে, সেজন্যই তো পৃথিবীতে আসা। গড়ে তুললেন ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচীনতম গবেষণা কেন্দ্র  "Indian association for the cultivation of science, 1876."

অনেক লড়াই করে শেষপর্যন্ত মেয়েদের বিয়ের বয়েস ঠিক করতে পারলেন ১৬ বছর।
আসামে চা শ্রমিকদের দুরাবস্থা নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। শ্রমিকদের 'কুলী' বলে ডাকা নিয়ে চরম আপত্তির কথা জানালেন সরকারকে।

তিনি অনুভব করলেন মহিলারা লেডি ডাক্তারদের কাছে তাদের সমস্যা যতোটা খুলে বলতে পারে ততোটা পুরুষ চিকিৎসকদের কাছে নয়।
তাই তাঁর ও দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতবর্ষের দ্বিতীয় এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিলেত ফেরত মহিলা ডাক্তার হলেন কাদম্বিনি গঙ্গোপাধ্যায় (বসু)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট।
আর দুর্ভাগ্য, আর একজন মহিলা ডাক্তার হতে পারলেন না। চেন্নাই গেছলেন ডাক্তারি পড়তে। অসুস্থ হয়ে মাঝপথে ডাক্তারি পড়া কমপ্লিট করতে পারলেন না। তিনি হলেন স্যার জগদীশ বসুর সহধর্মিণী লেডি অবলা বসু।

*এবার  সেই যুগান্তকারী ঘটনা!

"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।
এ জীবন পূণ্য করো দহন - দানে।"

অনেক টাকাকড়ি, নাম সুখ্যাতি তো হলো। এ জীবন তবু পূর্ণ হলো না! 
একদিন কাশীপুর থেকে আচমকা ডাক এলো!

শ্রীরামকৃষ্ণের  কর্কট রোগ ধরা পড়েছে। মহেন্দ্রলাল সরকার এলেন! এসেই রোগীকে চোটপাট। ঠাকুরের বিছানায় সটান বসে পড়ে, 'তুমি' করে ধমকাতে লাগলেন। তুমি নাকি আজকাল পরমহংসগিরি করছো? চারপাশে সব আগামীদিনের বিখ্যাত হবেন সব মানুষরা দাঁড়িয়ে পড়েছেন। শ্রী মা ও আছেন।
জিভ টেনে ধরলেন।

কথামৃতে ঠাকুর বলছেন, যেন গরুর জিভ টেনে ধরলো,  কি যন্ত্রণা, কি যন্ত্রণা! ... এইসব মোটামুটি।
এদিকে শ্রীরামকৃষ্ণকে ধমকাচ্ছেন আর ঠাকুর হাসছেন। হয়তো মনে মনে বলছেন, ওরে দাঁড়া, দেখবো তুই কতোবড় নাস্তিক। কেশব সেন, বঙ্কিম, মাইকেল, বিদ্যাসাগর, গিরীশ, নরেন সব এখানে ড্রাইভ মারলো। এবার দেখি মহেন্দ্র ডাক্তার তোমার দৌড়!

যাবার আগে মহেন্দ্রলাল বলে গেলেন, কথা বলা, নাচা গানা এসব চলবে না। তাহলে রোগ বেড়ে যাবে।
ডাক্তার সরকার নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে এলেই কেমন যেন দ্রবীভূত হয়ে যান। চেম্বার ফেলে ৩২ টাকার ডাক্তার ছুটে আসছেন শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে। 
বলছেন, শোনো তুমি শুধু আমার সঙ্গে কথা বলবে।  কোন ধর্মের কথা একবারও কেউ বলছেন না। অথচ মহেন্দ্রলাল চেম্বার ফেলে ঘন্টার পর ঘন্টা শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে গল্প করছেন। আসছেন প্রায়ই চেম্বার ফেলে। ঠাকুর হাসেন। ঠাকুর হেসে বলেন, কি ডাক্তার চেম্বারে যাবেন না? ডাক্তার রাগ দেখিয়ে বলেন, সে তোমায় অতো ভাবতে হবে না। ঠাকুর হাসেন, এ তো রাগ নয়,  এ যে অনুরাগ!

এবার শ্রীরামকৃষ্ণ বিদায় নিলেন। মহেন্দ্রলাল সরকার খবর পেয়ে এলেন। দেখলেন। বললেন, প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেছে।
নিঃশব্দে নেমে এলেন। একজনকে বললেন, শোনো একটা ফটো তোলার ব্যবস্থা কর। এই রইলো আমার ১০ টাকা চাঁদা।

ডাক্তারকে কাঁদতে নেই। আবার যে সে ডাক্তার নয়। চরম নাস্তিক ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার! লোকে কি বলবে! নাস্তিক মহেন্দ্রলাল কাঁদছেন!
কিন্তু 'ভালোবাসি' কি শুধু মুখে বললেই ভালোবাসা বলা হয়? হৃদয়ের ভাষা কি সবাই পড়তে পারে?
ভালোবাসা মুখে বলা হয়নি। হৃদয় শুধু বলেছিল!

"আমি তোমায় ভালোবাসি, ভালোবাসি, হে শ্রীরামকৃষ্ণ!"

আমি নাস্তিক। কিন্তু মানুষ চিনি। তুমি মানুষটা একেবারে খাঁটি। মহেন্দ্রলাল সরকার চলে গেলেন নিঃশব্দে। আজ তাঁর নিজের একটা ওষুধ চাই, বুকের ভেতরটা এমন আনচান করছে কেন! ৩২ টাকার ডাক্তারকে কে এখন ব্যথা জুড়োনোর ওষুধ দেবে?
...................................
"জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই... "

সংগৃহিত
======================

যাত্রাওয়ালা ও সংসারে সাধনা — ঈশ্বরদর্শনের (আত্মদর্শনের) উপায়

শ্রীরামকৃষ্ণ (বিদ্যা অভিনেতার প্রতি) — আত্মদর্শনের উপায় ব্যাকুলতা। কায়মনোবাক্যে তাঁকে পাবার চেষ্টা। যখন অনেক পিত্ত জমে তখন ন্যাবা লাগে; সকল জিনিস হলদে দেখায়। হলদে ছাড়া কোন রঙ দেখা যায় না।

“তোমাদের যাত্রাওয়ালাদের ভিতর যারা কেবল মেয়ে সাজে তাদের প্রকৃতি ভাব হয়ে যায়। মেয়েকে চিন্তা করে মেয়ের মতো হাবভাব সব হয়। সেইরূপ ঈশ্বরকে রাতদিন চিন্তা করলে তাঁরই সত্তা পেয়ে যায়।"

“মনকে যে রঙে ছোপাবে সেই রঙ হয়ে যায়। মন ধোপাঘরের কাপড়।”

বিদ্যা — তবে একবার ধোপাবাড়ি দিতে হবে।

শ্রীরামকৃষ্ণ — হ্যাঁ, আগে চিত্তশুদ্ধি; তারপর মনকে যদি ঈশ্বরচিন্তাতে পেলে রাখ তবে সেই রঙই হবে। আবার যদি সংসার করা, যাত্রাওয়ালার কাজ করা — এতে ফেলে রাখো, তাহলে সেই রকমই হয়ে যাবে।

—ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত থেকে।

=======================

অমৃতকথা
স্বামী ভূতেশানন্দ

    প্রশ্নঃ   জপ-ধ্যান করে যদি তার ফল আমরা ভগবানকে অর্পণ করি , তাহলে আমাদের সেই ফলের প্রাপ্তি কি করে হবে মহারাজ ?
      উত্তরঃ  হবে না । বিশ্বাস রাখতে হবে । ঠাকুরের গল্প -- লঙ্কা থেকে একজন সমুদ্রের উপর হেঁটে আসছে , বিভীষণ কাগজে কি লিখে দিয়েছেন--- তাই নিয়ে । বেশ আসছে , হঠাৎ মনে হলো এর ভিতরে কি লেখা আছে দেখি তো ! খুলে দেখে তাতে কেবল ' রাম ' নাম লেখা আছে । তার মনে হলো --- এই ! মনে একটু সন্দেহ হতেই ডুবে গেল ; যতক্ষণ বিশ্বাস ছিল সমুদ্রের উপর দিয়ে সে বেশ হেঁটে আসছিল ।
====================

মায়ের পছন্দের খাবার প্রসঙ্গে*

শ্রীমাসারদা দেবী র আহার প্রসঙ্গে মা আম বেশি মিষ্ট অপেক্ষা অম্লমধুর --- টক টক, মিষ্টি মিষ্টি----আমই বেশি ভালোবাসিতেন।  তিনি বোম্বাইয়ের আলফানসো, পেয়ারাফুলি ও ছোট ল্যাংড়া আম ভালোবাসিতেন, তবে ভক্তির সহিত কেউ খুব টক আম দিলে পরম প্রিয় বোধে আহার করিতেন ।

শাকের মধ্যে ছোলা শাক, মূলোশাক, আমরুল শাক ভালোবাসিতেন।

ফুটকড়াই, মুড়ি, বেগুনি, ফুলুরি, ঝালবড়া, আলুরচপ এই সব তেলেভাজা জিনিস খুব পছন্দ করিতেন।

মুগের নাড়ু, ঝুরিভাজা ইত্যাদিও তাঁহার প্রিয় ছিল।

রাতাবি সন্দেশ এবং রাঙা আলুর রসপুলি পিঠও ভালোবাসিতেন।

কলাইএর পাতলা ডাল ও পোস্ত বড়াও মায়ের খুব প্রিয় ছিল।

পান খাইতেন ও গুল মা দাঁতে দিতেন ।

সূত্র শ্রীশ্রীমায়ের কথা

অন্নপূর্ণে সদাপূর্ণে শঙ্করপ্রাণবল্লভে ।
জ্ঞানবৈরাগ্যাসিদ্ধ্যর্থং ভিক্ষাং দেহি চ পার্বতী ।।
জয় মা...

আমাদের মা ই স্বয়ং অন্নপূর্ণা

কপট সাধনাও ভাল — জীবন্মুক্ত সংসারে থাকতে পারে 

“এক জেলে রাত্রে এক বাগানে জাল ফেলে মাছ চুরি করছিল। গৃহস্থ জানতে পেরে, তাকে লোকজন দিয়ে ঘিরে ফেললে। মশাল-টশাল নিয়ে চোরকে খুঁজতে এল। এদিকে জেলেটা খানিকটা ছাই মেখে, একটা গাছতলায় সাধু হয়ে বসে আছে। ওরা অনেক খুঁজে দেখে, জেলে-টেলে কেউ নেই, কেবল গাছতলায় একটি সাধু ভস্মমাখা ধ্যানস্থ। পরদিন পাড়ায় খবর হল, একজন ভারী সাধু ওদের বাগানে এসেছে। এই যত লোক ফল ফুল সন্দেশ মিষ্টান্ন দিয়ে সাধুকে প্রণাম করতে এল। অনেক টাকা-পয়সাও সাধুর সামনে পড়তে লাগল। জেলেটা ভাবল কি অশ্চর্য! আমি সত্যকার সাধু নই, তবু আমার উপর লোকের এত ভক্তি। তবে সত্যকার সাধু হলে নিশ্চয়ই ভগবানকে পাব, সন্দেহ নাই।"

“কপট সাধনাতেই এতদূর চৈতন্য হল। সত্য সাধন হলে তো কথাই নাই। কোন্‌টা সৎ কোন্‌টা অসৎ বুঝতে পারবে। ঈশ্বরই সত্য, সংসার অনিত্য।”

একজন ভক্ত ভাবিতেছেন, সংসার অনিত্য? জেলেটো তো সংসারত্যাগ করে গেল। তবে যারা সংসারে আছে, তাদের কি হবে? তাদের কি ত্যাগ করতে হবে? শ্রীরামকৃষ্ণ অহেতুক কৃপাসিন্ধু — অমনি বলিতেছেন, “যদি কেরানিকে জেলে দেয়, সে জেল খাটে বটে, কিন্তু যখন জেল থেকে তাকে ছেড়ে দেয়, তখন সে কি রাস্তায় এসে ধেই ধেই করে নেচে বেড়াবে? সে আবার কেরানিগিরি জুটিয়ে লেয়, সেই আগেকার কাজই করে। গুরুর কৃপায় জ্ঞানলাভের পরেও সংসারে জীবনন্মুক্ত হয়ে থাকা যায়।”

এই বলিয়া ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সংসারী লোকদের অভয় দিলেন।

—ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত থেকে।

=====================

প্রকৃত ভক্ত হলে ভগবান  তাঁর  আচার রীতি   দেখেন না। তিনি দেখেন ভক্ত তাঁর জন্য কতটা ভাবেন! মনের ভক্তি, ব্যাকুলতাই হলো আসল-------  

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার ঠাকুরকে খুব ভক্তি করতেন। তাই প্রায়শ দক্ষিনেশ্বর  আসতেন। একবার দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার  আদালতের নথিপত্র, দলিল ইত্যাদি সমেত দক্ষিনেশ্বরে ঠাকুরের  সাথে দেখা করতে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কারন এই বিষয় সম্পত্তির কালিমা লিপ্ত কাগজ তিনি  ঠাকুরের সামনে আনতে চান নি।  ঠাকুর কিন্তু  তাঁকে দেখতে পেয়ে ভেতরে ডেকে পাঠালেন। তিনি প্রবল আপত্তি জানলে বললেন----" তোমাদের ওতে দোষ  হবে না, তুমি ভেতরে এস।"

   
আবার তিনি একদিন অশুচি বস্ত্রে হঠাত দক্ষিনেশ্বর   আসেন। সেদিন তিনি ঠিক করেন ঠাকুরকে স্পর্শ করবেন না। সেদিনও কিন্তু তাঁকে দেখে ঠাকুর বললেন ------"এস, আমার কাছে এসে বসো।"

   আবার একদিন তিনি ঠাকুরের জন্য  পরম যত্ন করে গরম মিহিদানা   নিয়ে আসছিলেন। এদিকে আসার সময় তাঁর পাশে অন্য ধর্মের , বড়ো বড়ো দাড়ি  ওয়ালা  এক ব্যক্তি বসেছিলেন। তিনি দেবেন্দ্রর  সাথে খুব গল্প করতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে  দেবেন্দ্র লক্ষ্য করলেন তাঁর মুখ  থেকে সমানে  থু থু নির্গত হয়ে মিহিদানার প্যাকেটে পড়ছে। খুব মনটা খারাপ হয়ে গেল তাঁর। ঠাকুরের জন্য হাতে করে নিয়ে এলেন, আর তা অপবিত্র হয়ে গেল!  কি আর করবেন! এইসব সাত পাঁচ  ভাবতে লাগলেন।

   দক্ষিনেশ্বর  পৌঁছে তিনি প্যাকেটটি এক কোণে  রেখে দিলেন। এদিকে অবাক কান্ড! কিছুক্ষণ পরেই  ঠাকুরের খুব  খিদে পেয়ে উঠল। খাবারের খোঁজে তিনি নিজের ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই সেই প্যাকেটটি ঠাকুর দেখতে পেলেন। দেখেই প্যাকেট খুলে একেবারে বালকের মত  সেই গরম মিহিদানা পরম তৃপ্তি করে খেতে শুরু করলেন ।

ধন্য ভক্তি দেবেন্দ্র বাবুর। তিনি কৃপা পেয়েছিলেন ঠাকুরের। তাই তো ঠাকুর কোনো  দোষ  ধরেন নি। প্রণাম নাও ঠাকুর। কৃপা কর সকলকে🙏
=====================
১লা মে, ১৮৯৭ সালে যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ আজকের শুভদিনে রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড়মঠের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেছিলেন বর্তমান বলরাম মন্দিরে অনুষ্ঠিত সভায়। সেই সূত্রেই আজকের এই বিশেষ দিনটিকে বেলুড় মঠের প্রতিষ্ঠা দিবস বা শুভ সংকল্প দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়। এর প্রায় এক বছর পর বেলুড় মঠের সার্বিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল,কিন্তু যুগনায়ক স্বামী বিবেকান্দের এই আমোঘ সিদ্ধান্তের দিনটিকে মনে রাখতে আজকের দিনের তাৎপর্য অপরিসীম ও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বামীজী ১৮৯৭ সালের ১লা মে, রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন। ১লা মে স্বামীজী তাঁর ভাষণে বলেন, “আমরা যার নামে সন্ন্যাসী হয়েছি, আপনারা যাকে জীবনের আদর্শ করে সংসারাশ্রমে কার্যক্ষেত্রে রয়েছেন, তাঁর দেহাবসানের বিশ বছরের মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য জগতে তাঁর পুণ্য নাম ও অদ্ভুত জীবনের আশ্চর্য প্রসার হয়েছে, এই সংঘ তাঁরই নামে প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা প্রভুর দাস, আপনারা এ কাজে সহায় হোন।” স্বামীজির প্রস্তাব সানন্দে গৃহীত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর শিক্ষার প্রতি যাদের শ্রদ্ধা ও প্রীতি বর্তমান তাঁদের নিয়ে গঠিত হয় একটি সাধারণ সমিতি বা আস্যোসিয়েশন। সমিতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি পরিচালন সমিতি নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী বুধবার, ৫ই মে, অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সভাতে আস্যোসিয়েশনের নামকরণ হয় ‘রামকৃষ্ণ মিশন’। মিশনের সাধারণ সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন স্বামী বিবেকানন্দ। স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী যোগানন্দ যথাক্রমে মিশনের কলকাতার কেন্দ্রের সভাপতি ও সহসভাপতি এবং নরেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদক নিযুক্ত হন।

স্বামী বিবেকানন্দ পরিকল্পিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতীকের ব্যাখাঃ --

•••চিত্রের তরঙ্গসঙ্কুল জলরাশি কর্ম,
•••পদ্মফুল ভক্তি,
•••উদীয়মান সূর্য জ্ঞান এবং
•••সর্প পরিবেষ্টিত সুপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তি ও যোগের প্রকাশক।
•••হংসটি পরমাত্মার প্রতীক।
•••অর্থাৎ কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান যোগের সাথে সমম্বিত হলেই পরমাত্মার দর্শনলাভ বা উপলদ্ধি হয়।
•••সরোবরটি হৃদয়ের প্রতীক।
•••সংস্কৃত লেখাটির অর্থ --'সেই পরমাত্মা আমাদের অনুপ্রাণিত করুন।'

ঈশ্বরের ইচ্ছা আর ভক্তের ইচ্ছা এক না হলে - মনিকাঞ্চণের যে যোগ হয়ে ওঠে না - যোগে যুক্ত হয়েই সবকিছু এক-তে রূপান্তরিত - আর সেই ইচ্ছায় প্রস্ফুটিত হয় জগদ্ধিতায় চ এর সুনির্মল প্রাপ্তির কল্যানকারীতে।

বোধহয় একেই বলে ঠাকুরের ইচ্ছে। এমনই তাঁর মাহাত্ম্য। আজ যে বিস্তৃত ভূখণ্ডে বিশ্ববিখ্যাত বেলুড় মঠ, তারই অন্তত একাংশে একসময় চরণচিহ্ন এঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং।

স্বামী বিবেকানন্দ মঠের জন্য ওই জমি কিনেছিলেন বিহারী ভদ্রলোক বাবু ভাগবৎনারায়ণ সিংয়ের কাছ থেকে। ছোট দুটি বাড়িসমেত ২২ বিঘা। ১৮৯৮ সালের ৪ মার্চ। তবে স্বামীজির জানা ছিল না যে, তারও আগে ওই জমিতেই ছিল ঠাকুরের গৃহী ভক্ত ‘কাপ্তেন’ বিশ্বনাথ উপাধ্যায়ের কাঠগোলা। সেখানেই একদা পদধূলি দিয়েছিলেন ঠাকুর। আমরা জানি, ঠাকুর মর্তলীলা সংরবণ করেন ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট। অর্থাৎ বেলুড়ে ওই জমি কেনার অনেক আগেই ঠাকুর সেখানে গিয়েছিলেন। যেন স্থায়ী মঠ স্থাপনের উদ্দেশ্যেই সেখানে ‘কুটোবাঁধা’ হয়ে গিয়েছিল। স্থায়ী মঠের জন্য অন্যত্র জমি সংগ্রহের সকল চেষ্টাই শেষাবধি ব্যর্থ হয়েছিল। এই ঘটনাকে দৈবনির্ধারিত ছাড়া কীই-বা বলা যায়।

বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ছিলেন নেপালের রাজার ভারতে নিযুক্ত উকিল। রাজপ্রতিনিধিরূপেই তিনি কলকাতায় বাস করতেন। বেলুড়ে নেপালরাজের একটি কাঠগোলা ছিল। প্রথম দিকে বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ওই কাঠগোলাতেই কর্মচারী নিযুক্ত হন। তখন শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যলাভমাত্রই তিনি ঠাকুরের পরম ভক্ত হয়ে ওঠেন। ঠাকুর তাঁকে আদর করে ‘কাপ্তেন’ ডাকতেন। কাপ্তেনের অনুরোধেই ঠাকুর বেলুড়ের ওই কাঠগোলা ঘুরতে যান।

ওই স্থান মাহাত্ম্য সম্পর্কে স্বামী গম্ভীরানন্দ এক স্থানে সারদা দেবীর মুখে বলেছিলেন, ‘‘আমি কিন্তু বরাবরই দেখতুম, ঠাকুর যেন গঙ্গার ওপরে এই জায়গাটিতে—যেখানে এখন (বেলুড়) মঠ, কলাবাগান-টাগান—তার মধ্যে ঘর, সেখানে বাস করছেন।’’ জমিটি সংগ্রহের পর শ্রীমা আরও বলেছিলেন, জমিটা ঠাকুরের ইচ্ছাতেই হল। মঠের জন্য জমিটা তিনিই নির্বাচন করে গিয়েছিলেন !

বেলুড়ে জমি তো কেনা হল। কিন্তু তা অসমতল। অতএব সেখানে মঠ নির্মাণ করতে একটু সময় লাগবে, তার তদারকিও দরকার। অতএব বেলুড়েই কাছাকাছি নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়ি ভাড়া নেওয়া হল। মঠ অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হল সেখানেই। বারাণসীর সমতুল গঙ্গার পশ্চিম তীরের এই বাড়িতেই শ্রীমা বসবাস করার সময় ছোট ছাদে পঞ্চতপা ব্রত করেছিলেন। সদ্য-কেনা কাপ্তেনের কাঠগোলার মঠভূমিতে ঠাকুরকে স্বামীজি প্রতিষ্ঠা করেন এই বাড়ি থেকেই। ১৮৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর স্বামীজি নতুন মঠের জমিতে শ্রীরামকৃষ্ণের ‘আত্মারাম’কে পুজো করে পায়েস নিবেদন করেন। আর সকাতরে প্রার্থনা করেন, ঠাকুর তুমি ‘বহুজনহিতায়’ এখানে স্থির হয়ে থেকো।

বেলুড় মঠে দাঁড়িয়ে গুরুভাইদের বিবেকানন্দ সেদিনই বলেছিলেন, কাশীপুরে ঠাকুর আমায় বলেছিলেন, ‘তুই কাঁধে করে আমায় যেখানে নিয়ে যাবি, আমি সেখানেই যাব ও থাকব। তা গাছতলায় কি, আর কুটিরই কি।’ সেজন্যই আমি স্বয়ং তাঁকে কাঁধে করে নতুন মঠভূমিতে নিয়ে যাচ্ছি। নিশ্চয় জানবি, বহুকাল পর্যন্ত ‘বহুজনহিতায়’ ঠাকুর ওই স্থানে স্থির হয়ে থাকবেন।

প্রত্যেক ভক্ত ঠাকুরকে আপন বুদ্ধির রঙে রাঙিয়ে এক-এক জনে এক-এক রকম দেখে ও বোঝে। তিনি যেন মহাসূর্য, আর আমরা যেন প্রত্যেকে এক-এক রকম রঙিন কাচ চোখে দিয়ে সেই একই সূর্যকে নানা রং-বিশিষ্ট বলে দেখছি। এটি ঠিক সেই ভাবের কেন্দ্রস্থান হবে। এখান থেকে যে মহাসমন্বয়ের উদ্ভিন্ন ছটা বেরবে তাতে জগৎ প্লাবিত হয়ে যাবে। ঠাকুরের ইচ্ছেয় আজ তাঁর ধর্মক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা হল। বারো বছরের চিন্তা আমার মাথা থেকে নামল। আমার মনে এখন কী হচ্ছে জানিস ? এই মঠ হবে বিদ্যা ও সাধনার কেন্দ্রস্থান। ... সময়ে সব হবে। আমি তো পত্তন-মাত্র করে দিচ্ছি। এর পর আরও কত কী হবে !

জীবনের উপান্তে এসে স্বামীজি বলেছিলেন, আমি যে নিষ্কর্মা সাধু হয়ে থাকিনি, সে বিষয়ে অন্তর থেকে আমি নিঃসন্দেহ। প্রাণ ঢেলে খেটেছি। আমার কাজের মধ্যে সত্যের বীজ যদি কিছু থাকে, কালে তা অঙ্কুরিত হবেই।

শ্রীশ্রীমাও এই মঠভূমি দেখতে এসেছিলেন। তাই পরে তিনি বলেছিলেন, অত্যন্ত শান্ত জায়গা বেলুড়ে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তাঁর ধ্যান লেগেই থাকত। তাই ওখানে একটি ‘স্থান’ করতে নরেনের ইচ্ছে হয়েছিল।

শ্রীরামকৃষ্ণ নির্দেশিত পথে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ গঠন করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৮৬ সালে। অর্থাৎ ঠাকুর যে-বছর দেহসংবরণ করলেন সে-বছরই। বরাহনগরের এক জীর্ণ বাড়িতে। যা ‘বরাহনগর মঠ’ নামে রামকৃষ্ণ-সাম্রাজ্যে সুপরিচিত। সুদীর্ঘ ৩৪ বছর এই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘকে লালিত ও পালিত করেছেন সঙ্ঘজননী সারদা দেবী। সেই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের বাস্তব রূপ দিলেন স্বামী বিবেকানন্দ বাগবাজারে বলরাম মন্দিরে ১৮৯৭ সালের ১ মে। নাম হল রামকৃষ্ণ মিশন। আর বরাহনগর মঠ রূপান্তরিত হল ‘রামকৃষ্ণ মঠ’-এ। এই বরানগরে থাকতেই বিবেকানন্দের মন ঠিক করে নিয়েছিল স্থায়ী মঠ ঠিক কোথায় হবে। বরাহনগর খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে তিনি একদিন গুরুভাইদের বলেছিলেন, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে গঙ্গার ওপারে কাছেপিঠেই আমাদের স্থায়ী মঠটি হতে চলেছে।

বেলুড় মঠের জমি কেনার পর স্বামীজি সওয়া চার বছর জীবিত ছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তিনি মঠ প্রতিষ্ঠার মূল কাজগুলি সাঙ্গ করে গিয়েছিলেন। মিশন তৈরির পর তার কলকাতা কেন্দ্রের ভার দেওয়া হয়েছিল স্বামী ব্রহ্মানন্দকে। অন্যদিকে, ১৮৯৮ সালে বেলুড়ে নতুন মঠ নির্মাণের কাজ শুরু হলে তার দায়-দায়িত্বও ব্রহ্মানন্দের ওপর ন্যস্ত হল। পরের বছর আলমবাজার থেকে বেলুড়ে নতুন বাটিতে মঠ উঠে আসার পর বেলুড় মঠ পরিচালনার ভারও তাঁকে নিতে হল। অবশেষে ১৯০০ সালের আগস্টে দলিল তৈরি করে মঠের যাবতীয় বিষয়-সম্পত্তি স্বামীজি গুরুভাইদের হাতে তুলে দিলেন। আর ১৯০১ সালের গোড়ার দিকে মঠ ও মিশনের সাধারণ সভাপতির আসন ত্যাগ করলেন স্বামীজি। অতঃপর স্বামী বিবেকানন্দের স্থলাভিষিক্ত হলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। ঠাকুর বলেছিলেন, ‘রাখাল একটা সাম্রাজ্য চালাতে পারে।’ বিবেকানন্দ এবং তাঁর গুরুভাইরা রাখাল মহারাজের উপর ঠাকুরের এই অগাধ আস্থার কথা ভোলেননি। মঠ কী আকার নেবে স্বামীজি তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অপর গুরুভ্রাতা স্বামী বিজ্ঞানানন্দকে, পূর্বাশ্রমে যিনি ছিলেন একজন দক্ষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মন্দিরের প্রতীক স্বামীজি তৈরি করার পর মন্দিরের নকশা স্বামীজির তত্ত্বাবধানে তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানানন্দজি।

স্বামীজি শুধু এক বাগ্মী হিন্দু সন্ন্যাসী ছিলেন না, একই সঙ্গে ছিল তাঁর শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান সমাজ রাজনীতি দর্শন প্রভৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত আধুনিক চিন্তা চেতনা। ভারত এককালে ছিল শিল্পের দেশ। কিন্তু স্বামীজির জীবদ্দশায় ভারতের শিল্পচেতনা লুপ্তপ্রায় হয়ে এসেছিল। দেশের এই হতশ্রীদশা তাঁকে নিরন্তর আহত করত। তাই সঙ্কল্প করেছিলেন, বেলুড় মঠের ভেতর দিয়েই ভারতীয় শিল্পচেতনা বিকাশের পুনর্নবীকরণ করবেন। সাহেবদের শিল্পভাবনার হুবহু নকল করে বেলুড় মঠ নির্মিত হবে না—যা তৎকালীন ভারতের এক ব্যাধি হয়ে উঠেছিল। বেলুড় মঠের প্রতীক ও নকশায় আমরা স্বামীজির ওই দেশজ এবং মিশ্র শিল্পভাবনার সমন্বয়ের প্রতিফলনই প্রত্যক্ষ করি। বেলুড়ে বর্তমান মন্দিরটির উদ্বোধন হয় ১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি পৌষ সংক্রান্তির দিন। মঠের তৎকালীন অধ্যক্ষ স্বামী বিজ্ঞানানন্দ নতুন মন্দিরে ঠাকুরকে স্থাপন করেন। মঠের পুরনো মন্দির থেকে বুকে করে আত্মারামকে নিয়ে এসে নবনির্মিত মন্দিরে ঠাকুরের মূর্তির সামনে রেখে প্রার্থনা করেন। সেইসময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন স্বামীজিসহ তাঁর অন্য গুরুভাইরা সূক্ষ্ম শরীরে উদ্বোধন দেখতে মন্দিরে উপস্থিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, ১৯২৯ সালের ১৩ মার্চ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথিতে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের দ্বিতীয় অধ্যক্ষ স্বামী শিবানন্দ মন্দিরের ভিত্তিপ্রতিষ্ঠা করেন। তবে, পরে মন্দির গড়ে তুলতে গিয়ে তার স্থান সামান্য পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়। তাই ১৯৩৫ অব্দের গুরুপূর্ণিমাতে সেই তাম্রফলকটি সরিয়ে দ্বিতীয়বার স্থাপন করেন স্বামী বিজ্ঞানানন্দ। পরের বছর ১০ মার্চ থেকে মন্দিরের নির্মাণ কাজ আরম্ভ হয়। ঠিক ছিল যে ১৯৩৭ সালে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ হবে। কিন্তু গর্ভমন্দিরের কাজ শেষ করতে কিছুটা দেরি হওয়ায় তিনি দুঃখ পেয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা বাপু বড় দেরি কর ! স্বামীজি মন্দিরের প্ল্যান করেছিলেন, কিন্তু তাঁর সময়ে মন্দির হয়নি। রাজা মহারাজা চেষ্টা করেও পারেননি। মহাপুরুষ মহারাজ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেও পারলেন না। সবাই একে একে চলে গেলেন। তাই বলছি, যত শীঘ্র পার তোমরা কাজ শেষ করে নাও, আর দেরি কোরো না।’

বিজ্ঞানানন্দজির কথার তাৎপর্য উপলব্ধি করলেন সকলে। তাই নাটমন্দিরের কাজ সমাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা না-করেই ১৯৩৮-এর ১৪ জানুয়ারি গর্ভমন্দিরে ঠাকুরের মর্মরবিগ্রহ স্থাপনসহ মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ সমাপনের সঙ্কল্প নেওয়া হল। সেদিন নতুন মন্দিরে আত্মারামের কৌটা স্থাপনের পর স্বামী বিজ্ঞানানন্দ নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে স্বামীজির উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘স্বামীজি, আপনি ওপর থেকে দেখবেন বলেছিলেন। আজ দেখুন, আপনারই প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর নতুন মন্দিরে বসেছেন।’ বিজ্ঞানানন্দ মহারাজ আরও ‘স্পষ্ট’ দেখতে পেয়েছিলেন যে, স্বামীজি, রাখাল মহারাজ, মহাপুরুষ মহারাজ, শরৎ মহারাজ, হরি মহারাজ, গঙ্গাধর মহারাজ প্রমুখ সকলেই দাঁড়িয়ে আছেন। এর কিছুক্ষণ পরে তিনি স্বস্তির ও তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন এই বলে যে, ‘এবার আমার কাজ শেষ হল। স্বামীজি আমার ওপর যে কাজের ভার দিয়েছিলেন, সে ভার আজ আমার মাথা থেকে নেমে গেল।’

নাটমন্দির সমেত সমগ্র মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ২৩৫ ফুট আর প্রস্থে ১৪০ ফুট। দ্বিতল গর্ভমন্দিরটি ১১২ ফুট উঁচু। ঠাকুরের দেহাবশেষ যে তাম্রপাত্রে রক্ষিত ছিল সেই আত্মারামের কৌটা এবং ঠাকুরের ধ্যানমূর্তি নতুন মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপন করা হয়। উচ্চ যোগাবস্থায় স্থিত ঠাকুরের ধ্যানস্থ মূর্তিটির ভাস্কর ছিলেন গোপেশ্বর পাল। ঠাকুরের মূর্তিটি যাতে দূর থেকেও সকলে ভালোভাবে দেখতে পান, সেইরকমভাবেই সেটি ডম্বরু আকৃতির বেদিতে উঁচু করে বসানো হয়েছে। ঠাকুরের জন্মস্থান কামারপুকুরে যুগীদের শিবমন্দিরের আদলে বেদিটি তৈরি। বেদির সামনে ব্রাহ্মীহংসটি উৎকীর্ণ করা হয়েছিল ভারত বিখ্যার শিল্পী নন্দলাল বসুর নির্দেশমতো। নাটমন্দিরের সামনে প্রধান প্রবেশপথের ওপরের দিকে মঠ ও মিশনের প্রতীক স্থাপন করা হয়েছে।

মন্দিরের পেছন দিকে নীচের তলাটি ব্যবহার করা হয় নিত্যপূজার ভাঁড়ার হিসেবে। পূজার সরঞ্জামগুলি রাখা হয় মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালে কয়েকটি কুলুঙ্গিতে। এর মধ্যে একটিতে রাখা হয় বাণলিঙ্গ শিব এবং একটিতে থাকে শ্রীমায়ের পবিত্র পদধূলি। আর দোতলার ঘরটি ঠাকুরের শয়নকক্ষ নামে চিহ্নিত হয়েছে। এখানেই সারা বছর সযত্নে রক্ষিত থাকেন আত্মারাম, যা বছরে তিনবার মন্দিরে নামিয়ে এনে মহাস্নান করানো হয়—স্নানযাত্রা, ঠাকুরের জন্মতিথি ও দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিন। ঠাকুরের ব্যবহৃত স্মারক দ্রব্যগুলি সযত্নে রক্ষিত একতলার ঘরে।

এখানে গর্ভমন্দির ও নাটমন্দির একসঙ্গে যুক্ত, যা সাধারণভাবে হিন্দুমন্দিরে দেখা যায় না, বরং খ্রিস্টীয় রীতিসম্মত। মন্দিরের গম্বুজগুলিতে মসজিদের ছাপ পাওয়া যায়। ছত্রীগুলির ধারে কামারপুকুরে ঠাকুরের বাসগৃহের আদল স্পষ্ট হয়। গম্বুজের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ওড়িশা মন্দিরস্থাপত্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নাটমন্দিরের বাঁকানো ছাদ ও বারান্দায় বৌদ্ধ গুহাশিল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরে প্রবেশপথের গোপুরমটি তৈরি করা হয়েছে অজন্তা ও ইলোরার রীতির আদলে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন ‘যত মত তত পথ’ নামক সবচেয়ে উদার ধর্মমতটির প্রবক্তা। বেলুড় মঠের শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরটিতে সেটিই বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।

আমরা জানি, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ সমগ্র পাশ্চাত্যে স্বামীজির কী বিরাট প্রভাব ছিল। রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠার সময়েও তাঁদের অনেকে কুণ্ঠাহীনভাবে স্বামীজির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দু’জন হলেন ইংরেজ কন্যা কুমারী হেনরিয়েটা এফ মিলার এবং আমেরিকান শিষ্যা ওল বুল। বেলুড় মঠের জমি কেনার সময় তাঁরা অকৃপণ হাতে অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন। আর ছিল দেশবাসীরও প্রসারিত হাত। এঁদের সকলের সহযোগিতা ছাড়া আজ রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ এই উচ্চতার পৌছঁতে পারত কি না সংশয় রয়ে যায়। অনটনের কারণে স্বয়ং স্বামীজিরও এক সময় অভরসা ধরে গিয়েছিল। কিন্তু শশী মহারাজকে (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) টলানো যেত না। কিছু অর্থের সংস্থান করার জন্য তিনি সাময়িকভাবে স্থানীয় এক স্কুলে মাস্টারিও করেছিলেন। মঠকে নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতেন সুরেশ মিত্র ও বলরাম বসু। তাঁদের মৃত্যুর পরই অনটনটা যেন বেশি টের পাওয়া গিয়েছিল। বিদেশে বক্তৃতা করেও টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করতেন স্বামীজি। গুরুভাইদেরও কেউ কেউ তীর্থে তীর্থে বেরিয়ে পড়েছিলেন। রসিদ কেটে চাঁদা আদায়ও চলত। খেতড়ির রাজাও কিছু টাকা দিয়েছিলেন। অর্থ সাহায্য এসেছিল মিস সাউটার, মিস জোসেফিন, মিস্টার স্টার্ডিসহ কিছু পশ্চিমি বন্ধু বা ভক্তদের কাছ থেকে। তবে যেখান থেকে যত টাকাই আসুক না কেন, স্বামীজির নির্দেশ ছিল, নির্দিষ্ট খাতের টাকা অন্যখাতে ব্যয় করা চলবে না।

এইভাবে স্বামীজির নেতৃত্বে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ যখন এগিয়ে চলেছে, তখনই বিনা মেঘে বজ্রাঘাত! ১৯০২ সালের ৪ জুলাই স্বামীজি দেহত্যাগ করলেন। এই ঘোর দুঃসময়েও টলমল তরী যে যথার্থই কূলে ভিড়তে পেরেছিল তার জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে সঙ্ঘজননী শ্রীমা এবং তাঁর দুই ভক্ত স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী সারদানন্দকে।

আরও একটি কথা উল্লেখ করা দরকার। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন গোড়াতেই ঘোষণা করেছিল যে, তারা রাজনীতির সংস্রব মুক্ত। তা সত্ত্বেও পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ সরকার এই মঠ ও মিশনকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখত। ভাবত, এটা সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া। তাদের সম্পর্কে বিরাট এক বিরূপ রিপোর্টও তৈরি করেছিল পুলিস।

প্রখ্যাত বিবেকানন্দ-গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসু মন্তব্য করেছেন, ‘স্বামীজির কল্পনায় এই মন্দির ভারতবর্ষে শিল্পের নবজাগরণের গর্ভগৃহ।’ কাশীপুরে একটি ভাড়া-করা বাড়িকে লক্ষ্য করে স্বামী বিবেকানন্দ ‘আমাদের প্রথম মঠ’ বলেছিলেন। যে বাড়িতে ঠাকুর তাঁর মর্তলীলা সংবরণ করেছিলেন। রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলন এখানে ঠাকুরকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধেছিল। পরে বরাহনগর, আলমবাজার হয়ে তা বেলুড়ে পৌঁছায়। এই পর্বে আন্দোলনটি আবর্তিত হয়েছে বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুভ্রাতাদের মাধ্যমে। ঠাকুরের গৃহীভক্ত সুরেশচন্দ্র মিত্রের আগ্রহে ও পরামর্শে বরাহনগর মঠ স্থাপিত হয়েছিল। অর্থাৎ দক্ষিণেশ্বর তপোবন যদি হয় রামকৃষ্ণ ভাবধারার গোমুখ, তবে বেলুড় হল তার গঙ্গোত্রী। শতাধিক বর্ষকালব্যাপী প্রবাহিত সেই অমৃতধারা বেলুড় মঠের মধ্য দিয়েই মানবমুক্তির পথে এগিয়ে চলেছে।

অকালমৃত্যু ও অকালবার্ধক্যের এই দেশে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কোন শক্তির বলে এমন কালজয়ী হল, তা একালের ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে রীতিমতো কৌতূহলের বিষয়। অন্যের অর্থ গ্রহণ ও পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে তা সুষ্ঠুভাবে ব্যয়। এমপাওয়ারমেন্ট বা ক্ষমতাপ্রদানের মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত রাখা। সংগঠনটি আরও দেখিয়ে চলেছে প্যাশন বা আবেগ, মোটিভেশন বা উৎসাহ, কঠোর পরিশ্রম, নির্মোহ হয়ে সবার জন্য উন্নয়ন চিন্তা কতখানি ফলপ্রসূ। বিবেকানন্দের হাতে-গড়া এই সংগঠন দেখিয়ে চলেছে—নিজের মোক্ষ, জগতের মঙ্গল এবং একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের শৃঙ্খলা—তিনটি আপাত বিপরীতধর্মী শক্তির সমন্বয় কীভাবে করা সম্ভব। সব মিলিয়ে সাহিত্যিক শংকরের মনে হয়েছে যে, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন হল এক ম্যানেজমেন্ট-বিস্ময়।

ভারত এবং বহির্ভারত মিলিয়ে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মোট শাখা আজ ১৮০টি! বেলুড় যার প্রাণকেন্দ্র। ১৯৯৩ সালের ৮ অক্টোবর ইউনেস্কো বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদ্বজ্জনদের এক সমাবেশ হয়। সেদিন ইউনেস্কোর ডিরেক্টর জেনারেল ডঃ ফ্রেডেরিকো মেয়রের একটি উক্তি এই প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য, ‘১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ যে রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপন করেছিলেন তার সংবিধানের সঙ্গে ১৯৪৫ সালে তৈরি ইউনেস্কোর সাদৃশ্য দেখে আমি খুবই বিস্মিত হই। উন্নতির লক্ষ্যে উভয়েরই যে কর্মপ্রচেষ্টা, তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ।’

.

জয় ঠাকুর
জয় মা
জয়তু স্বামীজী

.

   (সংগৃহীত)

===================

শ্রীরামকৃষ্ণ — দুরকম ভক্ত আছে। একথাকের বিল্লির ছার স্বভাব। সব নির্ভর — মা যা করে। বিল্লির ছা কেবল মিউ মিউ করে। কোথায় যাবে, কি করবে — কিছুই জানে না। মা কখন হেঁশালে রাখছে — কখন বা বিছানার উপরে রাখছে। এরূপ ভক্ত ঈশ্বরকে আমমোক্তারি (বকলমা) দেয়। আমমোক্তারি দিয়ে নিশ্চিন্ত।

“শিখরা বলেছিল — ঈশ্বর দয়ালু। আমি বললাম, তিনি আমাদের মা-বাপ, তিনি আবার দয়ালু কি? ছেলেদের জন্ম দিয়ে বাপ-মা লালন-পালন করবে না, তো কি বামুনপাড়ার লোকেরা এসে করবে? এ-ভক্তদের ঠিক বিশ্বাস — তিনি আপনার মা, আপনার বাপ।"

“আর-এক থাক ভক্ত আছে, তাদের বানরের ছার স্বভাব। বানরের ছা নিজে জো-সো করে মাকে আঁকড়ে ধরে। এদের একটু কর্তৃত্ব বোধ আছে। আমায় তীর্থ করতে হবে, জপতপ করতে হবে, ষোড়শোপচারে পূজা করতে হবে, তবে আমি ঈশ্বরকে ধরতে পারব, — এদের এই ভাব।"

“দুজনেই ভক্ত (ভক্তদের প্রতি) — যত এগোবে, ততই দেখবে তিনিই সব হয়েছেন — তিনিই সব করছেন। তিনিই গুরু, তিনিই ইষ্ট। তিনিই জ্ঞান, ভক্তি সব দিচ্ছেন।”

—ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত থেকে।

================

ঠাকুরের কাছে কেউ এলে তিনি তাকে নানারকম পরীক্ষা করতেন ৷ তাকে প্রশ্ন করে, তার চালচলন, দেহের গঠন দেখে বিচার করতেন ৷ তারপর ঊর্ধ্বভূমিতে উঠে ভাবদৃষ্টিতে তাকে দেখতেন ৷ আর যে যেমন আধার সেইভাবে তাকে এগিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতেন ৷

ঠাকুরের একটি কথা যা স্বামীজীকে বলেছিলেন, 'দেখ্ , কারো ভাব নষ্ট করতে নেই, যে যে-ভাবের তাকে সেই ভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে হয়' ৷ স্বামীজী এই শিক্ষাটিকে সমস্ত জীবনে কখনও ভোলেননি ৷ বারবার স্বামীজী বলেছেন, কারো কল্যাণ করতে হলে তোমার ভাব তার উপরে চাপিয়ে দিও না ৷ তাকে তার ভাবে বাড়তে সাহায্য কর ৷ প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে তিনি দাঁড়াচ্ছেন তার চরম গন্তব্য রূপে, চরম লক্ষ্য রূপে ৷ কিন্তু প্রত্যেকেই তাঁর নিজের নিজের দৃষ্টি দিয়ে তাঁকে দেখছেন ৷

প্রত্যেককে নিয়ে ঠাকুর খেলা করছেন ৷ এতগুলি ঘুঁটি কিন্তু এমন খেলোয়াড় — জানেন কোন ঘুঁটিকে কিভাবে চালাতে হবে ৷ ঠাকুর নিজে বলেছেন এ-কথা ৷

আমরা দেখব — আমরা তাঁকে কিভাবে গ্রহণ করলে আমাদের জীবনে পূর্ণতা আনতে পারব ৷ সকলের জন্য সব সম্ভার নিয়ে যেন তিনি বসে আছেন, যে যা চায় তাকে তাই দেবেন ৷ এই কথারই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ হল 'তোমাদের চৈতন্য হোক' ৷ তিনি সকলকে পুর্ণত্বে নিয়ে যাবার জন্য যা প্রয়োজন তা দিয়ে যাচ্ছেন এবং 'চৈতন্য হোক' এইটি তাঁর সেই আশীর্বাণী ৷

      — স্বামী ভূতেশানন্দজী ৷
রামকৃষ্ণ ওঁ হরি॥ শুভসকাল॥
=================


 || রামকৃষ্ণ-সূত্র ||



মাস্টারমশাই বলতেন —

 "ঠাকুরের প্রত্যেকটি কথাই মন্ত্র ৷"

এখানে ঠাকুরের মন্ত্র সূত্রগুলি 

দেওয়া হল।


১|   কামিনীকাঞ্চনই মায়া ৷

  ২|   সত্যকথা কলির তপস্যা ৷

  ৩|   লজ্জা, ঘৃণা, ভয় — তিন থাকতে নয় ৷

  ৪|   ভাগবৎ-ভক্ত-ভগবান— তিনে এক ৷

  ৫|   মন ধোপাঘরের কাপড় ৷

  ৬|   ঈশ্বর কল্পতরু ৷

  ৭|   আমি ম'লে ঘুচিবে জঞ্জাল ৷

  ৮|   আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী ৷

  ৯|   অনন্ত মত, অনন্ত পথ ৷

১০|   যত মত তত পথ ৷

১১|   অদ্বৈত জ্ঞান আঁচলে বেঁধে যা ইচ্ছা তা-ই কর ৷

১২|   ভক্ত হবি তো বোকা হবি কেন ?

১৩|   শুদ্ধ মন, শুদ্ধ বুদ্ধি, শুদ্ধ আত্মা একই ৷

১৪|   সেখানে সব শেয়ালের এক রা ৷

১৫|   যোগীর পা টলে না ৷

১৬|   যেমন ভাব তেমনি লাভ ৷

১৭|   মানুষের মুখ চেয়ো না — লোক পোক ৷

১৮|   মানুষ আর মানহুঁশ ৷

১৯|   ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ ৷

২০|   ব্রহ্মই বস্তু অার সবই অবস্তু ৷

২১|   ব্যাকুলতা হলেই অরুণোদয় হলো ৷

২২|   বেদান্তের সার — ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা ৷

২৩|   গীতা-র সার — ত্যাগী ত্যাগী ৷

২৪|   বিষয়াসক্ত মন ভিজে দেশলাই ৷

২৫|   বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর ৷

২৬|   বাৎসল্য থেকেই তাচ্ছল্য আসে ৷

২৭|   নেজামুড়া বাদ দিয়ে নাও ৷

২৮|   নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য ৷

২৯|   যাঁরই নিত্য, তাঁরই লীলা ৷

৩০|   ধ্যান করবে মনে, কোণে, বনে ৷

৩১|   নাহং নাহং তুঁহুঁ তুঁহুঁ ৷

৩২|   তিন টান একসঙ্গে হলে ঈশ্বরদর্শন হয় ৷

৩৩|   ডুব দাও ৷

৩৪|   এগিয়ে যাও ৷

৩৫|   মাটি টাকা, টাকা মাটি ৷

৩৬|   সচ্চিদানন্দই গুরু ৷

৩৭|   ঈশ্বর বস্তু অার সব অবস্তু ৷

৩৮|   ঈশ্বরকে তুষ্ট করো সকলেই তুষ্ট হবে ৷

৩৯|   তিনি সব হয়েছেন, তবে মানুষেই তিনি বেশী প্রকাশ ৷

৪০|   শ, ষ, স ৷

৪১|   গ্রন্থ না গ্রন্থি ৷

৪২|   পাপ আর পারা চাপা থাকে না ৷

৪৩|   ভাবের ঘরে চুরি কোরো না ৷

৪৪|   ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হননি ৷

৪৫|   ঈশ্বরের 'ইতি' করাটা হীনবুদ্ধি ৷

৪৬|   মন-মুখ এক করাই ধর্ম ৷


ঠাকুরের এসব কথা মনন করলে মন ঊর্দ্ধমুখী হয়।

#স্বামী_চেতনানন্দ।

        "সংগ্রহীত"

==========================


No comments:

Post a Comment