34>ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের:::---
(সংগ্রহীত)
শ্রী ম লিখিত কথামৃতের পাতায় পাতায়
অমৃত অক্ষরে লেখা আছে
ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের নাম।
===============
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার (১৮৩৩-১৯০৪) ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট বাঙালি চিকিৎসক, সমাজ সংস্কারক এবং ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে চিরস্মরণীয়। তিনি ১৮৭৬ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS) নামক প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।
তাঁর স্মরণীয় হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
★1>বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা: ১৮৭৬ সালের ২৯ জুলাই তিনি 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স' (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন নোবেল বিজয়ী গবেষণা করেছিলেন ।
2>চিকিৎসা বিজ্ঞান ও হোমিওপ্যাথি: অলপ্যাথি ডাক্তার হয়েও হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি এর প্রসারে বড় ভূমিকা রাখেন। ১৮৬৮ সালে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার স্বপক্ষে মত দেন এবং 'ক্যালকাটা জার্নাল অফ মেডিসিন' প্রকাশ করেন ।
★3>বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে: তিনি ভারতীয়দের মধ্যে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার মানসিকতা তৈরি করতে চেয়েছিলেন এবং স্বদেশী আন্দোলনের সময় বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর জোর দেন ।
★4>সমাজ সংস্কার: তিনি মেয়েদের বিবাহের বয়স সর্বনিম্ন ১৬ বছর করার সরকারি উদ্যোগকে সমর্থন করেছিলেন ।
★5>কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় এমডি, ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি ভারতে বিজ্ঞান ও গবেষণার অগ্রগতির জন্য স্মরণীয়
।
মহেন্দ্রলাল সরকার; 2 নভেম্বর 1833 - 23 ফেব্রুয়ারি 1904) একজন বাঙালি মেডিকেল ডাক্তার।
■■■■■■■■■■■■■■■■■■
ডাক্তারবাবু যখন বললেন আমার ভিজিট বত্রিশ টাকা। বিস্ময়ে দুই ভাই চোখাচোখি করল। এই টাকা দিতে তারা যে অপারগ এমন নয় কিন্তু ইংরেজ ডাক্তাররা যেখানে ষোলো টাকা পর্যন্ত ফি নেয় সেখানে এই বঙ্গসন্তান চিকিৎসক চাইছেন দ্বিগুণ অর্থ। তাছাড়া অ্যালোপ্যাথদের তুলনায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের ফি অনেক কম!দ্বিধান্বিতভাবে মনিভূষণ পার্স খুলতে ডাঃ মহেন্দ্রলাল বললেন এখন থাক। তিন দিন পরে রুগী নিজে আমার চেম্বারে যাবে ওষুধ নিতে। যদি যেতে না পারে আমার একটা পয়সাও লাগবে না। রোগ না সারিয়ে মহীন সরকার পয়সা নেয় না।
১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর মহেন্দ্রলাল সরকারের জন্ম হয়। জন্মস্থান হাওড়া জেলার পাইকপাড়া গ্রামে। বাবার নাম তারকনাথ, মায়ের নাম অঘোরমণি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার কিংবদন্তি চিকিৎসক, তাঁকে ঘিরে প্রচলিত নানা কাহিনী। মেডিকেল কলেজের নামজাদা ছাত্র এম ডি পাশ করেছিলেন প্রথম হয়ে। অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক হয়ে প্রথম জীবনে টক্কর দিতেন সাহেব ডাক্তারদের । এদেশের বিজ্ঞান প্রসারের জন্য তিনি ' ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স ' প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু নিজের জীবনে আশ্চর্য রকমের একটি পরিবর্তন হল। হোমিওপ্যাথির তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি এখন অ্যালোপ্যাথি ছেড়ে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হয়েছেন।
মহেন্দ্রলাল সরকারের কাছে রোগী রোগীই। আপনি,আজ্ঞে না বলে সবার সঙ্গে তুমি তুমি করে কথা বলেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসের গলা পরীক্ষার জন্য ডাক্তারের সামনে বসানো হয়েছে, বললেন কই দেখি হাঁ করো! ডাক্তারের এক সহকারী একটা লণ্ঠন উঁচু করে ধরে তাঁর পাশে বসে আছেন। রামকৃষ্ণ ছোট হাঁ করেছেন, মহেন্দ্রলাল ঠিক মত দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি বললেন আরও বড় হাঁ করো। সেই অবস্থায় রামকৃষ্ণ পরমহংস কিছু কথা বলতে যেতে মহেন্দ্রলাল বললেন জিভ নাড়লে আমি কি ভাবে দেখবো! তিনি রামকৃষ্ণের জিভ চেপে ধরেছিলেন। সেদিন খানিকটা যন্ত্রনা পেয়েছিলেন তিনি । প্রসঙ্গ উঠলে বলতেন না না গরুর জিভ টানার মতন টেনেছিল।
মহেন্দ্রলাল ধুতি, চাদর আর চটি পরতেন। মাংস-পেঁয়াজ খেতেন না। শুধু মাছ খেতেন। বাড়িতে অনেক গরু ছিল। প্রচুর দুধ হত। দামি ঘোড়ার গাড়ি ও ভাল ঘোড়া ছিল তাঁর। কারণ সারা দিন বিভিন্ন জায়গায় রোগী দেখতে ও বক্তৃতা দিতে ছুটতে হত। আর ছিল বিরাট লাইব্রেরি। সময় পেলেই লেখালিখি করতেন। স্কুল জীবনে কখনও দ্বিতীয় হননি। অসম্ভব মেধাবী ছাত্র বললে একটু কমই বলা হয়। কৃতিত্বের সঙ্গে ১৮৬০ সালে মেডিসিন ও সার্জারিতে লাইসেনসিয়েট (এলএমএস) পাশ করেন। তিন বছর পর এমডি হন। ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় এমডি।
আধুনিক ভারত ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার কে চিরদিন মনে রাখবে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রসারে তিনি ১৮৭৬ সালে ভারতবর্ষের প্রথম বিজ্ঞান সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্সে প্রতিষ্ঠা করেন।বৌবাজার স্ট্রিটে, একটা ভাড়াবাড়িতে এই প্রতিষ্ঠানের পথ চলা শুরু । চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন সেই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করেই পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন। মহেন্দ্রলাল সরকারের আপাত-কঠোর স্বভাবের আড়ালে ছিল এক সংবেদনশীল মন। সত্যি কি তাঁকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ? মানসিকতা ও ধ্যানধারণার বিপুল অমিল সত্ত্বেও রামকৃষ্ণ ও মহেন্দ্রলাল অমোঘ মোহময় বাঁধনে আবদ্ধ থেকেছেন শেষ পর্যন্ত। তাঁর সঙ্গে মিশেছিলেন বন্ধুর মত। বুদ্ধিদীপ্ত তর্কবিতর্ক-আলোচনা চলত, পরস্পরের যুক্তি খণ্ডনও করতেন। মানসিকতা ও ধ্যানধারণার বিপুল অমিল কিন্তু অটুট মোহময় বাঁধন।কথামৃতের পাতায় পাতায় ভরা রয়েছে রামকৃষ্ণদেব ও তাঁর চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারের বহু কথোপকথন। নিজের কর্মকৃতিত্বে ও দক্ষতায় সে যুগের প্রথিতযশা এই অ্যালোপ্যাথি তথা হোমিয়োপ্যাথি চিকিৎসককে ইতিহাস মনে রেখেছে আজীবন বিজ্ঞান-অনুসন্ধান, বিজ্ঞানসভার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক হিসেবে। আজ চিকিৎসক তথা ভারতীয় বিজ্ঞানের অন্যতম প্রাণপুরুষ ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
(সংগ্রহীত)
=======================
No comments:
Post a Comment